অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। জীবিত পদাতিক সৈন্যরা ভেতরে ঢুকে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাণপণ লড়াই করে। তারপর অশ্বারোহী বাহিনী ভিতরে ঢোকার নির্দেশ লাভ করে। সুলতান আইউবী দুর্গের ভেতরে অগ্নি সংযোগের নির্দেশ দেন। এক একটি ইউনিট এক এক স্থানে আগুন লাগাতে শুরু করে। এজাজের সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণ করার কোন লক্ষণ চোখে পড়ছে না।
দুর্গটি হাল্ব থেকে দেখা যায়। রাতের বেলা হাবের মানুষ দেখতে পায়, দুর্গের স্থানে আকাশটা জ্বলছে। আগুনের শিখা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠছে। তারা সুলতান আইউবীর এজাজ দুর্গ অবরোধের সংবাদ পেয়ে গেছে। হাবের হাই কমান্ড পেছন থেকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা আঁটে। কিন্তু সালারগণ জানায়, ফৌজ যুদ্ধের সমর্থ নয়।
এ সময়ে সাইফুদ্দীন হাবেই অবস্থান করছিলেন। গোমস্তগীনও সেখানে চলে গেছেন। দুজনের মাঝে এজাজ ও হাবের প্রতিরক্ষার বিষয়ে উত্তপ্ত বিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে গোমস্তগীন সাইফুদ্দীনকে হত্যা করার হুমকি প্রদান করেন। সাইফুদ্দীন ঐক্য ভেঙে দেন এবং নিজের অবশিষ্ট যৎসামান্য সৈন্যকে হাব থেকে বের করে নিয়ে যান। তারা মূলত একে অপরের শত্রু ছিলো। আল-মালিকুস সালিহর বয়স এখন তের বছর অতিক্রম করেছে। কিছু বুঝ-বুদ্ধি হয়েছে তার। গোমস্তগীনের বক্তব্য ও আচরণে তিনি বুঝে ফেললেন, তার এই বন্ধুটা কুচক্রী। তিনি গোমস্তগীনকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করেন।
ইতিহাসে লিখিত আছে, হাব-এজাজের অবরোধ অবস্থায় গোমস্তগীন আল-মালিকুস সালিহর বিরুদ্ধে নতুন এক ষড়যন্ত্র এঁটেছিলো, যা ফাঁস হয়ে যায়। আল-মালিকুস সালিহ তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে দু তিনদিন পর হত্যা করে ফেলেন।
শেষ পর্যন্ত এজাজের রক্ষীরা অস্ত্র ত্যাগ করে। এর জন্য সুলতান আইউবীকে বহু মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছিলো। তার সৈন্যসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এজাজবাসীরা প্রমাণ করেছে, তারা কাপুরুষ নয়। সুলতান আইউবী তৎক্ষণাৎ হাল্ব অবরোধ করে ফেলেন। হাবের অবস্থান এজাজের নিকটেই। এজাজের অগ্নিশিখা হাবাসীদের রাতেই আতঙ্কিত করে ফেলেছিলো। তাদের জানা ছিলো, নগরী রক্ষা করার মতো শক্তি তাদের সৈন্যদের নেই। এই নগরবাসীরাই তাঁকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিলো, যার ফলে তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু এখন এই নগরীটা যেনো এক মৃত্যুপুরী।
অবরোধের দ্বিতীয় দিন আল-মালিকুস সালিহর এক দূত সুলতান আইউবীর নিকট আসে। সে যে বার্তা নিয়ে আসে, সেটি সন্ধির প্রস্তাব নয়। সেটি ছিলো একটি আবেগময় পয়গাম, যা সুলতান আইউবীকে নাড়িয়ে তোলে। বার্তাটা হলো, নুরুদ্দীন জঙ্গীর কিশোরী কন্যা সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছে। মেয়েটির নাম শামসুন্নিসা।. শামসুন্নিসা আল মালিকুস সালিহর ছোট বোন। বয়স দশ-এগারো বছর। আল-মালিকুস সালিহ যখন হাল্ব চলে গিয়েছিলেন, তখন এই বোনটিকেও সঙ্গে নিয়েছিলেন। তাদের মা রোজী খাতুন বিনতে মঈনুদ্দীন দামেশকেই থেকে গিয়েছিলেন। তিনি সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর সমর্থক ছিলেন।
সুলতান আইউবী দূতকে জবাব দেন, মেয়েটাকে নিয়ে আসো।
শামসুন্নিসা সুলতান আইউবীর দরবারে এসে উপস্থিত হয়। তার সঙ্গে আল-মালিকুস সালিহর দুজন সালার। সুলতান আইউবী জঙ্গীর এতীম মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত অঝোরে ক্রন্দন করেন। মেয়েটির হাতে আল-মালিকুস সালিহর লিখিত বার্তা।
সুলতান আইউবী পত্রখানা হাতে নিয়ে খুলে পড়েন। আল-মালিকুস সালিহ পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি সুলতান আইউবীকে সুলতান মেনে নিয়েছেন। তাঁর আনুগত্যও বরণ করে নিয়েছেন। পত্রে তিনি এ-ও লিখেছেন, আমি গোমস্তগীনকে হত্যা করে ফেলেছি। তাই আপনি হাররানকেও নিজের রাজ্য ভাবতে পারেন।
তোমরা মেয়েটাকে কেনো সঙ্গে এনেছো?- সুলতান আইউবী সালারদের জিজ্ঞাসা করেন। এই বার্তা তো তোমরা নিজেরাই নিয়ে আসতে পারতে?
উত্তর সালারদেরই দেয়া উচিত ছিলো। কিন্তু তারা নিজেরা কিছু না বলে মেয়েটির দিকে তাকায়। জঙ্গীকন্যা সুলতান আইউবীকে বললেন মামাজান! আমাদেরকে এজাজ দুৰ্গটা দিয়ে দিন এবং আমাদেরকে হাবে থাকতে দিন। আগামীতে আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো না।
সুলতান আইউবী ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সালারদের প্রতি তাকান। তারা দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে জঙ্গীর মেয়েকে সঙ্গে এনেছে।
আমি এজাজ দুর্গ ও হাব তোমাদেরকে দিয়ে দিলাম শামসুন্নিসা!–সুলতান আইউবী মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ জারি করেন, এজাজ দুর্গ থেকে আমাদের সৈন্যদের বের করে হালবের অবরোধ তুলে নেয়া হোক। তিনি হাবের সালারদের বললেন- আমি এজাজ ও হাব এই মেয়েটাকে দান করেছি। তোমরা কাপুরুষ, আত্মমর্যাদাহীন ও বিশ্বাসঘাতক। তোমরা আমার বাহিনীতে থাকার উপযুক্ত নও।
১১৭৬ সালের ২৪ জুন মোতাবেক ৫৭১ হিজরীর ১৪ যিলহজ চুক্তিতে স্বাক্ষর হয়। সুলতান আইউবী এজাজ ও হাবকে সালতানাতে ইসলামিয়ার অন্তভুক্ত করে নেন এবং আল-মালিকুস সালিহকে স্বায়ত্বশাসন দান করেন।
তার অব্যবহিত পর সাইফুদ্দীনও সুলতান আইউবীর আনুগত্য মেনে নেন এবং মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।
কিন্তু জাতির অভ্যন্তরে বিশ্বাসঘাতক ও ঈমান বিক্রয়কারীদের তৎপরতা যথারীতি অব্যাহত থাকে।
৬.২ আলোর ঝিলিক
আলোর ঝিলিক
