ঘোড়ার পানাহার শেষ হলে আন-নাসের তার লাগাম ধরে হাঁটতে শুরু করে। ছুটে চলার মতো অবস্থা নেই ঘোড়াটার। আন-নাসেরও পরিশ্রান্ত দেহে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। লিজার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তার মুখ থেকে, এখন কথা সরছে না। আন-নাসের জানে না, সুলতান আইউবী কোথায় আছেন। তিনি তুর্কমানের দিকে এগিয়ে চলছেন। সুলতান আইউবী আরো সম্মুখে চলে গিয়েছিলেন। পরে সে স্থানটির কোহে সুলতান তথা সুলতান পর্বত নামকরণ হয়েছিলো। কিন্তু এখন তিনি সেখানেও নেই। তারও আগে চলে গেছেন তিনি। আন-নাসেরের তুকমান ও কোহে সুলতানের টিলা চোখে পড়তে শুরু করে। সূর্য অনেক উপরে উঠে এসেছে।
এই মুহূর্তে সুলতান আইউবী টিলাময় একটি বিজন অঞ্চলে কর্মকর্তাদের নিয়ে এলাকাটার পরিসংখ্যান ঠিক করছেন। তিনি আমলাদেরকে এক স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে একাকি একদিকে চলে যান। তাঁর মাথায় সম্ভবত বাহিনীর অগ্রযাত্রার কোনো পরিকল্পনা ছিলো। তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে একটি টিলার উপর আরোহণ করেন। চার ফেদায়ী সেখান থেকে সামান্য দূরে এক স্থানে চুপিচুপি তাঁকে দেখছে। তিনি অনেক সময় পর্যন্ত টিলার উপর দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখতে থাকেন।
নীচে আসতে দাও। এক ফেদায়ী তার সঙ্গীদের বললো।
দেহরক্ষীরা কাছেই কোথাও লুকিয়ে আছে হয়তো। আরেকজন বললো।
বেটা আজ রক্ষা পাবে না। অপর একজন বললো।
শুধু একজন এগিয়ে যাবে- চতুর্থজন বললো- আক্রমণ পেছন থেকে করতে হবে। প্রয়োজন হলে পরে অন্যরা এগিয়ে যাবো।
সুলতান আইউবী টিলার উপর থেকে নেমে আসেন এবং ঘোড়ায় চড়ে অন্য একদিকে চলে যান। ঘাতকদল তার পেছনে পেছনে এগিয়ে যায়। আক্রমণের জন্য এই জায়গাটা উপযোগী নয়।
আন-নাসের এখনো অনেক দূরে। সুলতান আইউবী পুনরায় ঘোড়া থেকে অবতরণ করেন। অন্য একটি টিলায় আরোহণ করেন। খানিক পর সেখান থেকে নেমে ঘোড়ার লাগাম ধরে পায়ে হেঁটে রওনা দেন। ফেদায়ীরা তার থেকে সামান্য দূরে লুকিয়ে আছে। এক স্থানে এসে সুলতান ডান দিকে মোড় নেন। সম্মুখে খোলা মাঠ। তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করতে উদ্যত হন। এমন সময় তিনি ধাবমান পায়ের শব্দ শুনতে পান। এক ফেদায়ী এক ফুট লম্বা একটা খঞ্জর হাতে তার থেকে দু-তিন পা দূরে এসে উপনীত হয়ে। সুলতান তাকে দেখে ফেলেন।
সুলতান আইউবী নিজের খঞ্জরটা বের করে হাতে নেন। দেখতে না দেখতে ফেদায়ী তার উপর আক্রমণ করে বসে। সুলতান নিজের খঞ্জর দ্বারা আঘাত করে আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। আক্রমণকারী ফেদায়ী স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ। আঘাতটা সে শক্তির সাথেই করেছে। সুলতানের আক্রমণ ব্যর্থ যায়। টিলার আড়াল থেকে আরেক ফেদায়ী বেরিয়ে আসে। সেও আক্রমণ চালায়। সুলতান তার আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করেন বটে; কিন্তু আঘাতে তার গায়ের চামড়া কেটে যায়। তিনি টিলার আড়ালে চলে যান। এক ফেদায়ী তার দিকে এগিয়ে এলে তিনি বাঁ হাতে তার মুখে ঘুষি মারেন। লোকটা ধাক্কা খেয়ে পেছনে গিয়ে পড়ে যেতে উদ্যত হয়। সুলতান তার বুকে খঞ্জরের আঘাত হেনে ঠেলা দিয়ে তাকে একদিকে ফেলে দেন। এই ফেদায়ী খতম হয়ে যায়।
অপরজন পেছন দিক থেকে সুলতানের উপর হামলা করে। কিন্তু তিনি যথাসময়ে নিজেকে সামলে নেন। সুলতান আইউবীর এক বাহুতে ফেদায়ীর খঞ্জরের আগার খোঁচা লাগে।
অপর দুই ফেদায়ীও বেরিয়ে এগিয়ে আসে। অপর দিকে ধাবমান। কতগুলো ঘাড়ার পদশব্দ কানে আসে, যা মুহূর্তের মধ্যে সুলতান আইউবীর নিকটে এসে পৌঁছে যায়। ফেদায়ীরা পালিয়ে যায়। একজন ধাবমান ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। একজনকে অশ্বারোহীরা ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলে। সর্বশেষ ফেদায়ীকে জীবিত ধরে ফেলা হয়।
আল্লাহ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে এই আক্রমণ থেকে রক্ষা করেন। ফেদায়ীরা যে সময় তার উপর আক্রমণ চালায়, তখন তার আমলারা তার থেকে সাত-আটশত গজ দূরে এক উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো। সুলতান তাদেরকে সেই স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছিলেন। ঘটনাক্রমে তাদের একজন, আক্রমণটা দেখে ফেলে। অন্যথায় এই আক্রমণ ব্যর্থ যাওয়ার মতো ছিলো না।
এটি ১১৭৬ সালের মে মোতাবেক ৫৭১ হিজরীর যিলকদ মাসের ঘটনা। ইতিহাসে এই ঘটনার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের ভিন্ন ভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর ডাইরীতে শুধু লিখেছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এজাজ দুর্গ অবরোধ করতে যাওয়ার পথে চার ফেদায়ী তার উপর সংহারী আক্রমণ চালিয়েছিলো। মহান আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছেন।
মেজর জেনারেল আকবর খান বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ্য করে লিখেছেন এজাজ দুর্গ অবরোধ করার সময় সুলতান আইউবী দিনের বেলা তার এক সালার জাদুল আসাদীর তাঁবুতে ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন এক ফেদায়ী তাঁবুতে প্রবেশ করে তার উপর খঞ্জর দ্বারা আক্রমণ চালায়। ঘটনাক্রমে সে সময়ে তাঁর মাথায় সেই বিশেষ পাগড়িটা ছিলো, যেটা তিনি রণাঙ্গনে ব্যবহার করতেন। পাগড়িটার নাম ছিলো তারবুশ। আক্রমণকারীর খঞ্জর তারবুশে আঘাত হানে এবং সুলতান আইউবী সজাগ হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে চার পাঁচজন ফেদায়ী ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং তৎক্ষণাৎ সুলতানের দেহরক্ষীরাও এসে পড়ে। তারা আক্রমণ করে ঘাতকদের মেরে ফেলে।
