দেহরক্ষী ছাড়া এভাবে দূরে যেতে তাকে বারণ করা হতো। কিন্তু তার নিজের নিরাপত্তার কোনোই পরোয়া ছিলো না। এখনো তিনি পুরোপরি ক্ষিপ্ত। তিনি তার মুসলমান দুশমনকে নাকানি-চুবানি খাইয়েছেন। তাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকার কাজটা বাকি আছে শুধু। এলাকাটি এমন যে, কোথাও টিলা-পর্বত কোথাও ঝোপালো গাছ-গাছালি। কোথাওবা গভীর খানা-খন্দক। এমন একটি অঞ্চলে রক্ষী বাহিনীর পাহারা ব্যতীত ঘোরা-ফেরা করা সুলতান আইউবীর পক্ষে খুবই বিপজ্জনক।
সুলতানে মুহতারাম!- আইউবীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ একদিন তাকে বললেন- আল্লাহ না করুন আপনার উপর পরিচালিত কোন সংহারী আক্রমণ যদি সফলই হয়ে যায়, তাহলে সালতানাতে ইসলামিয়া আপনার ন্যায় আর কোনো মর্দে মুমিন জন্ম দিতে পারবে না। আমরা জাতিকে মুখ দেখাতে পারবো না। অনাগত প্রজন্ম আমাদের কবরের উপর অভিশাপ বর্ষণ করবে যে, আমরা আপনাকে রক্ষা করতে পারিনি।
আল্লাহর এটাই যদি সিদ্ধান্ত হয় যে, কোনো ফেদায়ী কিংবা ক্রুসেডারের হাতে আমার মৃত্যু হবে, তা হলে এমন মৃত্যুকে আমি কীভাবে প্রতিহত করতে পারি- সুলতান আইউবী বললেন- রাজা যখন আপন জীবনের হেফাজত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন আর তিনি দেশ ও জাতির মর্যাদা হেফাজতের যোগ্য থাকেন না। আমি যদি খুনই হতে হয়, তাহলে আমাকে তাড়াতাড়ি দায়িত্ব পালন করে ফেলতে দাও। তোমরা আমাকে রক্ষীদের কয়েদিতে পরিণত করো না। আমার উপর রাজত্বের নেশা সৃষ্টি করো না। তুমি তো জানো, আমার উপর কতোবার সংহারী আক্রমণ হয়েছে। প্রতিবারই আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। এখনো রক্ষা করবেন।
সুলতান আইউবীর ব্যক্তিগত আমলারা সর্বদা তার নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন থাকতো। তার উপর পরিচালিত প্রতিটি হামলার সময়ই তিনি একাকি ছিলেন। কিন্তু তাঁর রক্ষীসেনারা নিকটেই ছিলো। প্রতিবারই তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলো।
এখন তিনি পন্থা অবলম্বন করেছেন যে, ব্যক্তিগত আমলা ও রক্ষীদের কোনো এক স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে টিলা ও পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারপরও হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ এই ব্যবস্থা করে রেখেছেন যে, রক্ষী বাহিনীর কতক সদস্য দূরে দূরে থেকে সুলতানের উপর দৃষ্টি রাখছে। কিন্তু কেউ জানে না, দীর্ঘদিন যাবত চারজন লোক এই বিজন ভূমিতে ঘোরাফেরা করছে এবং সুলতান আইউবীর উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।
এরাই সেই চার ফেদায়ী, যাদের সম্পর্কে আসিয়াত দুর্গে শেখ সান্নান গোমস্তগীনকে বলেছিলো, সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য আমি চারজন ফেদায়ীকে প্রেরণ করেছি।
শেখ সান্নানের এই চার ঘাতক সদস্য জেনে ফেলেছে, সুলতান আইউবী রক্ষী বাহিনী ছাড়া ঘোরাফেরা করে থাকেন। তাদের পরিকল্পনা ছিলো, তারা যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের উদ্বাস্তুর বেশে সুলতান আইউবীর নিকট যাবে এবং তাঁকে হত্যা করবে। কিন্তু আইউবীর নিরাপত্তাবিহীন চলাফেলার তথ্য জেনে তারা পূর্বেকার এই পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে।
সুলতান আইউবী ঘাতকদের বড় মোক্ষম সুযোগ দিয়ে চলছেন। চার ঘাতকের পরিকল্পনা যথাযথ। কিন্তু তারা তীর-ধনুক সঙ্গে নিয়ে আসেনি। থাকলে তাদের ধরা পড়ার আশংকা ছিলো। যদি একটি তীর আর ধনুক থাকতো, তাহলে কোনো এক স্থানে বসেই তারা সুলতান আইউবীকে নিশানা বানাতে পারতো। এলাকাটায় লুকিয়ে থাকার জায়গা অনেক। কাজ সমাপ্ত করে অনায়াসে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও আছে। তাদের সঙ্গে আছে লম্বা খঞ্জ।
ওদিক থেকে আন-নাসের লিজাকে নিয়ে দ্রুত বেগে এগিয়ে আসছে। লিজা আন-নাসেরকে বলে দিয়েছিলো, চারজন ফেদায়ী সুলতান আইউবীকে হত্যা করতে গেছে। আন-নাসের অতি দ্রুত সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছাতে এবং তাঁকে সতর্ক করতে চাচ্ছে। কিন্তু সফর ছিলো দীর্ঘ! ঘোড়ার পিঠে দুজন আরোহীর বোঝা। এতো দ্রুত পথ অতিক্রম করা ঘোড়ার পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথে তিনি ঘোড়াকে বিশ্রাম দেন এবং পানি পান করিয়ে আবার ছুটতে শুরু করেন।
সুলতান আইউবী নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। চার ঘাতক লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখছে। এই অঞ্চলে কোন বাহিনী নেই। নেই কোন বসতিও। ফেদায়ীরা বনের হিংস্র পশুর ন্যায় দিনভর শিকারের সন্ধান করে ফিরছে আর রাতে সেখানেই কোথাও লুকিয়ে থাকছে।
সূর্য অস্ত গেছে। আন-নাসের ও লিজার ঘোড়া এগিয়ে চলছে। কিন্তু গতি তার কমে গেছে এবং ক্রমান্বয়ে কমছে। আন-নাসের ওজন কমানোর জন্য ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে। রাত কেটে যাচ্ছে। লিজা কয়েকবার বলেছে, আমি আর আরোহণ করতে পারছি না। মেয়েটা এখন হাড়েও ব্যাথা পাচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতে চাচ্ছে সে। কিন্তু আন-নাসের নিজে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে বেহাল হয়ে পড়লেও থামলো না। লিজাকে বললো- তোমার-আমার জীবন থেকে সালাহুদ্দীন আইউবী অনেক বেশি মূল্যবান। আমি যদি বিশ্রামের জন্য এখানে থেমে যাই আর সুলতান আইউবী শত্রুর ঘাতকদের দ্বারা খুন হয়ে যান, তাহলে আমি মনে করবো, আমিই সুলতান আইউবীর খুনী।
***
পরদিন ভোর বেলা। আন-নাসের এখন পা টেনে টেনে হাঁটছে। লিজা ঘোড়ার পিঠে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। ঘোড়া ধীর গতিতে হাঁটছে। এক স্থানে ঘাস-পানি দেখে ঘোড়া দাঁড়িয়ে যায়। লিজা সজাগ হয়ে হঠাৎ চকিত হয়ে বললো- আল্লাহর দোহাই, তুমি পশুটাকে টেনে নিও না। একে একটু পানাহার করতে দাও।
