জনাব আকবর খান লিখেছেন, কিছুদিন আগে এই ফেদায়ীরা প্রতারণার মাধ্যমে সুলতান আইউবীর রক্ষী বাহিনীতে ঢুকে গিয়েছিলো।
ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, আক্রমণকারীরা সুলতান আইউবীরই দেহরক্ষী ছিলো। এই ঐতিহাসিকগণ সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন যে, নিজ বাহিনীতে তিনি মোটেও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। এমনকি তাঁর দেহরক্ষীরা পর্যন্ত তাঁর অনুগত ছিলো না। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ঘাতকরা না তার নিজস্ব লোক ছিলো, না তারা কারো প্রতারণার শিকার হয়ে আক্রমণ করেছিলো। তারা ছিলো কাপুরুষ ক্রুসেডারদের মদদপুষ্ট ভাড়াটে খুনী চক্র।
ধৃত ফেদায়ী স্বীকারোক্তি প্রদান করে যে, তারা চারজন আসিয়াত দুর্গ থেকে এসেছে। তাকে হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর হাতে তুলে দেয়া হয়। হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ জিজ্ঞাবাদ করে তার থেকে আসিয়াত দুর্গের সকল তথ্য জেনে নেন। ভেতরে কলোজন সৈন্য আছে, তাদের লড়াই করার যোগ্যতা ও শক্তি কতখানি, তাও তিনি সংগ্রহ করেন। প্রাপ্ত তথ্যাদি সুলতান আইউবীকে অবহিত করা হয়।
আগামীকাল রাতের শেষ প্রহরে আমরা আসিয়াতের উদ্দেশ্যে রওনা হবো- সুলতান আইউবী বললেন। তিনি তাঁর হাই কমান্ডের সালারদের তলব করে বললেন- ফেদায়ীদের এই আস্তানাটি গুঁড়িয়ে দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছে। দুর্গটি এক্ষুনি দখল করতে হবে। ফৌজের এক তৃতীয় অংশই যথেষ্ট। সৈন্য কতজন যাবে এবং তাদের বিন্যাস কীরূপ হবে সুলতান তা-ও বলে দেন।
সেদিন সন্ধ্যা বেলা। সুলতান আইউবী সংবাদ পান, আন-নাসের নামক এক গেরিলা কমান্ডার ফিরে এসেছে। ইতিমধ্যে হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ তার থেকে পূর্ণ রিপোর্ট নিয়ে ফেলেছেন। তাকে সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করা জরুরি।
আন-নাসেরকে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করা হয়। বিরামহীন সফর ও পিপাসা তাকে আধমরা করে তুলেছে। লিজা তার সঙ্গে। তার গায়ের রং বিবর্ণ হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।
আন-নাসের সুলতান আইউবীকে বিস্তারিত কাহিনী শোনায়। কোন কথাই সে গোপন রাখলো না। লিজা সম্পর্কেও খোলামেলা তথ্য প্রদান করে। সুলতান লিজাকে বললেন, নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তুমি সম্পূর্ণ স্বাধীন। মেয়েটি সম্ভবত নিজেকে বন্দি মনে করছিলো এবং অসদাচরণের আশঙ্কায় শঙ্কিত ছিলো। কিন্তু এখন দেখছে তার উল্টোটা। সে আন-নাসেরের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। তাকে বলা হলো, তোমাকে দামেক পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেখানে তুমি নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রীর হেফাযতে থাকবে এবং কিছুদিন পর আন-নাসের তোমার সঙ্গে গিয়ে দেখা করবে।
আবেগময় বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে সুলতান আইউবী এরূপ মেয়েদের বিশ্বাস করতেন না। তাদেরকে সম্মান ও শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করতেন এবং গোপনে তাদের উপর নজর রাখতেন।
জখমের চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য আন-নাসেরকে পেছনের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হলো।
***
শেখ সান্নানের মেজাজ এখনো ঠান্ডা হয়নি। গোমস্তগীন তাকে ধোকা দিয়ে চলে গেছেন। গোমস্তগীনের কাফেলাকে ধাওয়া করতে যাদের প্রেরণ করেছিলেন, তাদের মাত্র দুজন ফেরত এসেছে। তারা থ্রেসাকে তুলে নিয়ে এসেছে। লিজাকে আন-নাসের রক্ষা করে নিয়ে গেছে। প্রেসা শেখ সান্নানের কোপানলে পড়ে যায়। মেয়েটিকে তিনি কয়েদখানায় নিক্ষেপ করেন। থ্রেসাও রূপসী। কিন্তু শেখ সান্নানের কামনার দৃষ্টি লিজার উপর নিবদ্ধ।
দিবসের শেষ প্রহর। আসিয়াত দুর্গের পাঁচিলের উপর দাঁড়িয়ে সান্ত্রীরা দূর দিগন্তে ধূলি-মেঘ দেখতে পায়। মেঘমালা এদিকেই এগিয়ে আসছে। সান্ত্রীরা তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণে মেঘের অভ্যন্তরে হাজার হাজার ঘোড়া চোখে পড়তে শুরু করে। সান্ত্রীরা ডংকা বাজায়। কমান্ডারগণ উপরে গিয়ে দেখে। শেখ সান্নানকে সংবাদ জানায়। এসে সে-ও সম্মুখের দেয়ালের উপর উঠে যায়।
এতোক্ষণে ফৌজ দুর্গের কাছাকাছি এসে অবরোধের বিন্যাসে বিন্যস্ত হতে শুরু করেছে। শেখ সান্নান মোকাবেলার নির্দেশ দেয়। দুর্গের পাঁচিলের উপর তীরন্দাজ বাহিনী পৌঁছে যায়। কিন্তু তারা তীর ছুঁড়ছে না। তারা বাইরের বাহিনীর গতিবিধি অনুধাবন করতে চাচ্ছে। সুলতান আইউবী দুর্গের ভেতরকার সব তথ্য আগেই সংগ্রহ করেছেন। আন-নাসের তার সঙ্গে আছে। দুটি মিনজানিক স্থাপন করা হয়েছে। শেখ সান্নানের মহল কোথায় এবং কতো দূর আন-নাসের তা জানিয়ে দেয়। তার নির্দেশনা মোতাবেক প্রথমে বড় পাথর ছোঁড়া হয়, যা লক্ষে গিয়ে আঘাত হানে। শেখ সান্নানের শক্ত দেয়াল ফেটে যায়।
দুর্গ থেকে তীর বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। সুলতান আইউবীর নির্দেশে মিনজানিকের সাহায্যে দাহ্য পদার্থ ভর্তি পাতিল ভেতরে নিক্ষেপ করা হয়। পাতিলগুলো শেখ সান্নানের মহলের সন্নিকটে গিয়ে ভেঙে যায়। তরল দাহ্য পদার্থগুলো দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তাতে আগুন ধরানোর জন্য সলিতাওয়ালা তীর ছোঁড়া হয়। কিন্তু তীর তরল দাহ্য পদার্থের উপর গিয়ে পড়ছে না। এখান থেকে তীর ছুঁড়ে লক্ষে আঘাত হানা সহজ নয়। দুর্গের দেয়াল টপকে ভেতরে না ঢুকে সুবিধা করা যাবে না। ঘটনাক্রমে এক স্থানে আগুন জ্বলছিলো। একটি পাতিল তার এতো কাছে গিয়ে ফেটে যায় যে, দাহ্য পদার্থগুলো ছড়িয়ে পড়ামাত্র দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। দেখতে না দেখতে শেখ সান্নানের মহলে আগুন ধরে যায়।
