এ হতে পারে না। আমরা বেশ্যা মেয়ে নই। আমি বাধ্য ছিলাম বলেই তোমার খেলনা হয়ে আছি। কিন্তু এ মেয়েগুলো তোমার কেনা দাসী নয় যে, ইচ্ছে হলো আর তাদেরকে বন্ধুদের মাঝে বণ্টন করে দেবে। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো মুবী।
আমি তোমাদেরকে কখনো সম্ভ্রান্ত মনে করি না। তোমরা প্রত্যেকে আমাদের জন্য নিজ দেহের উপহার নিয়েই এসেছে। এই মেয়েরা না জানি কত পুরুষকে সঙ্গ দিয়ে এসেছে। তাদের একজনও মরিয়ম নয়। আবেশমাখা রাজকীয় ভঙ্গিতে বললো বালিয়ান।
আমরা কর্তব্য পালনের স্বার্থেই আমাদের দেহকে পুরুষের সামনে উপহার হিসেবে পেশ করে থাকি। আমোদ করার জন্য পুরুষের নিকট যাই না। আমাদের দেশ ও ধর্ম আমাদের উপর একটি দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সে কর্তব্য পালনের নিমিত্ত আমরা আপন দেহ, রূপ ও সম্ভ্রমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। এ যাত্রা আমাদের অর্পিত কর্তব্য পূরণ হয়ে গেছে। এখন তুমি যা করছে ও বলছে, সব-ই নিছক বিলাসিতা, ধর্মহীন কাজ, যা আমাদের কাম্য নয়, কর্তব্যও নয়। আমরা বিশ্বাস করি, যেদিন আমরা বিলাসিতায় মেতে উঠবো, সেদিন থেকেই ক্রুশের পতন শুরু হবে। প্রশিক্ষণে আমাদের বলা হয়েছে, একজন মুসলিম কর্ণধারকে ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনে দশজন মুসলমানের সঙ্গে রাত-যাপন করাও বৈধ এবং পুণ্যের কাজ। মুসলমানদের একজন ধর্মগুরুকে নিজের দেহের পরশে অপবিত্র করাকে আমরা মহা পুণ্যকর্ম মনে করি। বললো মুবী।
তার মানে তুমি আমাকে ক্রুশের অস্তিত্বের স্বার্থে ব্যবহার করছো! তুমি কি আমাকে ক্রুশের মুহাফিজ বানাবার চেষ্টা করছো? বললো বালিয়ান। ধীরে ধীরে জাগ্রত হতে শুরু করে বালিয়ানের অনুভূতি।
কেন, এখনো কি তোমার সন্দেহ আছে? একজন ক্রুসেডারের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালে কী উদ্দেশ্যে? বললো মুবী।
সালাহুদ্দীন আইউবীর শাসন থেকে মুক্তি অর্জন করার জন্য–ক্রুশের হেফাজতের জন্য নয়। আমি মুসলমান; কিন্তু তার আগে আমি সুদানী। বললো বালিয়ান।
আমি সর্বাগ্রে ক্রুশের অনুসারী–খৃষ্টান। তারপর আমি আমার দেশের একটি সন্তান। এই বলে মুবী বালিয়ানের ডান হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে আবার বলে, ইসলাম কোন ধর্ম-ই নয়। সে কারণে তুমি দেশকে ধর্মের উপর প্রাধান্য দিচ্ছো। এটা তোমার নয়–তোমার ধর্মের দুর্বলতা। আমার সঙ্গে তুমি সমুদ্রের ওপারে চলো; আমার ধর্ম কী জিনিস, তোমাকে দেখাবো। তখন নিজ ধর্মের কথা তুমি ভুলে-ই যাবে।
যে ধর্ম তাঁর অনুসারী মেয়েদের পর-পুরুষের সঙ্গে রাতযাপন, নিজে মদপান করা এবং অন্যকে মদপান করানোকে পুণ্যের কাজ মনে করে, সে ধর্মকে আমি মনে-প্রাণে ঘৃণা করি, হাজারবার অভিসম্পাত করি আমি সেই ধর্মকে। অকস্মাৎ জেগে উঠে বালিয়ান। তারপর বলে আমার কাছে তুমি তোমার সম্ভ্রম বিলীন করোনি, বরং তুমি-ই আমার ইজ্জত লুট করে নিয়ে গেছে। আমি তোমাকে নই, বরং তুমি-ই আমাকে খেলনা বানিয়ে রেখেছে।
একজন মুসলমানের ঈমান ক্রয় করার জন্য সম্ভ্রম তেমন বেশী মূল্য নয়। আমি তোমার সম্ভ্রম লুটিনি, লুট করেছি তোমার ঈমান। তবে এখন আমি তোমাকে ভবঘুরে অবস্থায় পথে ফেলে যাবো না। আমি তোমাকে নতুন এক আলোর জগতে নিয়ে যাচ্ছি, তোমাকে হীরা-মাণিক্যের ন্যায় চকমকে উজ্জ্বল এক জীবন দান করবো আমি। বললো মুবী।
আমি তোমার সেই আলোর জগতে যেতে চাই না। বললো বালিয়ান। “দেখ বালিয়ান! একজন লড়াকু পুরুষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ না করে পারে । তুমি আমার সওদা বরণ করে নিয়েছে। তোমার ঈমানটা ক্রয় করে সেটি আমি মদের সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছি; তোমার চাহিদা অনুপাতে আমি তোমাকে মূল্য দিয়েছি। এতটা দিন তোমার দাসী, তোমার স্ত্রী হয়ে রইলাম। তুমি এ সওদা থেকে ফিরে যেও না; একটি অবলা নারীকে ধোকা দিওনা। বললো মুবী।
সমুদ্রের ওপারে নিয়ে তুমি আমাকে যে আলো দেখাবার কথা বলছো, সে আলো আমাকে এখানেই তুমি দেখিয়ে দিয়েছে। আমার ভবিষ্যত, আমার শেষ পরিণতি এখন-ই তোমার হীরে-মাণিক্যের মতো চমকাতে শুরু করেছে। বললো বালিয়ান।
কিছু বলার জন্য মুখ খুলছিলো মুবী। কিন্তু বালিয়ান গর্জে উঠে বললো, খামুশ মেয়ে! একটি কথাও আর তোমার শুনতে চাই না আমি। আমি মিসরের গভর্নর সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমন হতে পারি; কিন্তু আমি সেই মহান রাসূলের শত্রু নই, যার আদর্শ রক্ষার জন্য সালাহুদ্দীন আইউবী তোমাদের সঙ্গে মরণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন। সেই রাসূলের নামে আমি মিসর-সুদানকে উৎসর্গ করতে পারি। আমি সেই মহান ও পবিত্র আদর্শের বদৌলতে সালাহুদ্দীন আইউবীর সামনে অস্ত্রসমর্পণও করতে পারি।
তোমাকে আমি কতোবার বলেছি, মদ কম পান করো। একদিকে অপরিমিত মদ, অপরদিকে সারাটা রাত জেগে আমার দেহটা নিয়ে খেলা করা; তোমার মাথাটা-ই খারাপ হয়ে গেছে দেখছি। তুমি একথাটাও ভুলে গেছো যে, আমি তোমার স্ত্রী। বললো মুবী।
আমি কোন বেশ্যা খৃষ্টানের স্বামী হতে চাই না। বললো বালিয়ান। বালিয়ানের নজর পড়ে মদের বোতলের উপর। অনি বোতলটি হাতে নিয়ে ছুঁড়ে মারে দূরে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। বন্ধুদের ডাক দেয়। ডাক শুনে দৌড়ে আসে সকলে। সে বলে, এই মেয়েগুলো, বিশেষ করে এ মেয়েটি এখন থেকে । তোমাদের কয়েদী। এদের নিয়ে কায়রো ফিরে চলো। প্রস্তুত হও, জদি করো।
