লিজা এমন ভঙ্গিতে বলছিলো, যেনো তার উপর প্রেতাত্মা ভর করেছে। তার সব চতুরতা ও প্রতারণা-ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে গেছে। এখন একজন দুনিয়াত্যাগী সূফী-দরবেশের ন্যায় কথা বলছে লিজা।
আমি কি তোমাকে আমার আসল পরিচয় বলে দেবো- লিজা আন নাসেরকে জিজ্ঞাসা করে- আমি কি তোমাকে দেখিয়ে দেবো, আমার পাজরের খাঁচায় কী আছে? মেয়েটি তার বুখে হাত মারে এবং চুপ হয়ে যায়। হাতটা তার সোনার হারের উপর গিয়ে পড়ে, যাতে হীরার মিশ্রণও আছে। সে হারটা মুঠি করে ধরে সজোরে টান দেয়। ছিঁড়ে হারটা হাতে চলে আসে। লিজা হারটা কূপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। হাতের আঙুল থেকে হীরার আংটিগুলো খুলে ফেলে। এগুলোও কূপে ছুঁড়ে ফেলে লিজা। তারপর বলতে শুরু করে- আমি একটি প্রতারক ছিলাম আন-নাসের। আমার হৃদয়ে তোমার ভালোবাসাও জন্ম নিয়েছিলো। কিন্তু তার উপর আমার কর্তব্যের প্রেতাত্মারও প্রভাব ছিলো। ফেদায়ীরা আমাদের উপর হামলা করে খুবই ভালো করেছে। তার চেয়েও ভালো হয়েছে, আমি জীবদ্দশায়ই নিজের মাথার খুলি দেখে নিয়েছি। অন্যথায় আমি বলতে পারতাম না, আমরা তোমাদেরকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে– তোমাদের পরিণতি কী ঘটতো! আমার ভালোবাসার শেষ ফল কী দাঁড়াতে! তুমি ভয়াবহ একটি প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছিলে। আজ আমি মিথ্যা বলবো না। তোমাদের নিয়ে পরিকল্পনা ছিলো, আমি আমার রূপ ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে তোমার বিবেক কজা করে নেবো এবং তোমাদের হাতে। তোমাদেরই রাজা সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করাবো। গোমস্তগীন আসিয়াত দুর্গে এই উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, যেনো শেখ সান্নান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য তাকে কয়েকজন ঘাতক প্রদান করেন। সান্নান বলেছেন, তিনি চারজন ফেদায়ী প্রেরণ করে রেখেছেন। তারাও যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ কাজের জন্য আর তিনি লোক প্রেরণ করবেন না। কেননা, এই মিশনে তিনি তার অনেক দক্ষ ও মূল্যবান ফেদায়ী খুইয়ে ফেলেছেন। শেষে লেনদেনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় যে, গোমস্তগীন তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে নিয়ে যাবেন এবং সাইফুদ্দীনকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত করবেন। ইতিমধ্যে আমাদের অফিসার এসে পড়েন। তিনি সিদ্ধান্ত প্রদান করেন, সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করাই বেশি জরুরি।
আমার পক্ষে এটুকুও সম্ভব হবে না যে, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর ছায়াকে বক্ত চোখে দেখবো- আন-নাসের বললো- পৃথিবীর কোন শক্তি আমাকে এমন নির্বোধ বানাতে পারবে না।
লিজা হেসে ওঠে। বলতে শুরু করে- আমি যে দায়িত্ব পালন করছিলাম, তার প্রতি আমার মন ছিলো না। অন্যথায় আমি সীসাকেও পানিতে পরিণত করতে জানি।
লিজা আন-নাসেরকে অবহিত করে তার কর্তব্য আর চেতনার মাঝে কতোখানি পার্থক্য। সে জানায়, আমি সাইফুদ্দীনের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। জিজ্ঞাসা করে, তুমি আমার ন্যায় একটি অপবিত্র মেয়েকে বরণ করে নেবে কি? আমি সত্যমনে ইসলাম গ্রহণ করবো।
তুমি যদি সত্যমনে ইসলাম গ্রহণ করে নাও, তাহলে তোমাকে বরণ না করা আমার জন্য পাপ হবে- আন-নাসের বললো- কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অনুমতি ব্যতীত আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।
তুমি শান্ত হও। মন থেকে দুশ্চিন্তার বোঝা ফেলে দাও। তুমি যদি পবিত্র জীবন লাভ করতে চাও, তাহলে এমন জীবন একমাত্র আমাদের ধর্মেই পাবে। আন-নাসের জিজ্ঞাসা করে- তোমার কি জানা আছে, যে, চারজন ফেদায়ী সুলতান আইউবীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গেছে, তারা কোন্ বেশে গেছে এবং সংহারী আক্রমণ কোন্ পন্থায় করবে?
না, জানি না- লিজা উত্তর দেয়- আমার উপস্থিতিতে শুধু এটুকু কথা হয়েছে যে, চারজন ফেদায়ী পাঠানো হয়েছে।
আমাদেরকে উড়ে তুকমান পৌঁছতে হবে- আন-নাসের বললো সুলতান এবং তাঁর দেহরক্ষীদেরকে সতর্ক করতে হবে।
আন-নাসের লিজাকে পেছনে বসিয়ে ঘোড়া হাঁকায়। একটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে তার বুকের সঙ্গে লেগে আছে। মেয়েটির রেশমকোমল চুলগুলো তার গন্ডদেশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ছে। কিন্তু মস্তিষ্কে তার সুলতান আইউবী। কর্তব্যবোধ লোকটার আবেগ- স্পৃহাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। পবিত্র একটি লক্ষ তাকে রণাঙ্গনের পুরুষ এবং পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করেছে। একটি সুন্দরী অসহায় যুবতী হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও তার এই অনুভূতিটুকু যেনো নেই যে, সে পুরুষ এবং তার মধ্যে যৌনতা আছে। একজন খ্যাতিমান বক্তা যদি কয়েক বছরও ওয়াজ করে শোনাতেন, তা লিজার উপর ক্রিয়া করতে না। কিন্তু আন-নাসের ছোট্ট একটি বাক্যে তার হৃদয়ে এই বাস্তবতাকে প্রোথিত করে দিয়েছেন যে, পবিত্র জীবন যাপন করতে চাইলে তাকে ইসলামের ছায়াতলেই আশ্রয় নিতে হবে।
***
এজাজ দুর্গের অধিপতির জবাব সুলতান আইউবীকে অগ্নিশর্মা করে তোলে। এই দুৰ্গটা তাঁকে জয় করতেই হবে এবং এক্ষুনি হাব অবরোধ করে নগরীটা দখল করে নিতে হবে। তিনি মাম্বাজ ও বুযুর দুর্গ দুটি যুদ্ধ ছাড়াই পেয়ে গেছেন। সে গুলোতে যেসব সৈন্য ছিলো তাদেরকে নিজ বাহিনীতে যুক্ত করে তাদের স্থলে আপন বাহিনী মোতায়েন করেছেন। এখন তিনি এজাজ ও হাবের উদ্দেশ্যে অগ্রযাত্রার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন। যে স্থান দুটো অবরোধ করবেন, খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য সেখানে সৈন্য প্রেরণ করে রেখেছেন। গোয়েন্দারা তাকে হালব ও এজাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেছে। সুলতান আইউবী নিজেও ঘুরে ফিরে এবং সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে স্বচক্ষে পরিস্থিতি অবলোকন করতেন। এ জাতীয় ভ্রমণের সময় তিনি সঙ্গে পতাক রাখতেন না এবং দেহরক্ষীদেরও সঙ্গে নিতেন না, যাতে দুশমন চিনতে না পারে ইনি সালাহুদ্দীন আইউবী। এ সময় তিনি অন্যের ঘোড়া ব্যবহার করতেন। দুশমনের প্রধান সেনাপতি তার ঘোড়াটা চিনে।
