আন-নাসের তার ঘোষণা সত্যে প্রমাণিত করে দেখায় যে, ফেদায়ীরা লিজাকে নিতে পারেনি। সে ফেদায়ীদেরকে গুরুতর জখম করে অবস্থা শোচনীয় করে তোলে।
এই যুদ্ধ লড়তে গিয়ে আন-নাসের কাফেলার অবস্থান থেকে দূরে সরে গিয়েছিলো। সে একটি ঘোড়া ধরে লিজাকে তার উপর বসিয়ে ঘোড়া হাঁকায়। কিন্তু পলায়ন করেনি। রণাঙ্গন এখন নীরব। আন-নাসের নিকটে গিয়ে দেখে। ওখানে কয়েকটি লাশ পড়ে আছে এবং দু-তিনজন ফেদায়ী আহত হয়ে ছটফট করছে। তার সঙ্গী তিনজন মারা গেছে। খৃস্টান লোকটিরও লাশ পড়ে আছে। থ্রেসা নিখোঁজ। আন-নাসের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেনি। সে আকাশের পানে তাকায়। ধ্রুবতারা দেখে দিক নির্ণয় করে ঘোড়া হাঁকায়। অনেকখানি পথ অতিক্রম করে সে ঘোড়ার গতি থামায়।
এবার বলো তুমি কোথায় যেতে চাও?- আন-নাসের লিজাকে জিজ্ঞাসা করে- একটি অসহায় মেয়ে বিবেচনা করে আমি তোমাকে সঙ্গে নিতে চাই না। যদি বলল, তাহলে আমি তোমাকে তোমার এলাকায় পৌঁছিয়ে দেবো। তাতে যদি আমি বন্দিও হই, পরোয়া করবো না। তুমি আমার আমানত।
আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও- লিজা বললো আমাকে তোমার আশ্রয়ে নিয়ে যাও আন-নাসের!
ঘোড়া রাতভর চলতে থাকে। রাত পোহাবার পর আন-নাসের এলাকা। চিনতে পারে। এ অঞ্চলেরই কোন এক স্থানে সে নিজ বাহিনীর সঙ্গে গেরিলা হামলা করেছিলো। এখানে মাটির টিলা ও বড় বড় পাথর আছে। চলতে চলতে সে একটি কূপের নিকট গিয়ে উপনীত হয়। কূপটি একটি টিলার পাদদেশে অবস্থিত। আন-নাসের নিজের জখম দেখে। কোনো জখমই গুরুতর নয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেছে। পুনরায় রক্ষক্ষরণ শুরু হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে জখম ধৌত করলো না। এই ফাঁকে লিজা হাঁটতে হাঁটতে এক দিকে চলে যায়। আন-নাসের তাকে টিলার অপর প্রান্ত থেকে খুঁজে বের করে। সেখানে গিয়ে লিজা বসে পড়ে। তার পিঠটা আন নাসেরের দিকে। সেখানে অনেক হাড়-গোড় ছড়িয়ে আছে, যেগুলো মানুষের হাড় বলে মনে হলো। আছে অনেক খুলিও। আছে কংকাল। হাত পা ও বাহুর হাড়। সেগুলোর মাঝে পড়ে আছে তরবারী ও বর্শা।
লিজা একটি খুলিকে সামনে নিয়ে বসে আছে। কোন এক নারীর খুলি বলে মনে হচ্ছে। মুখমন্ডলে কোথাও কোথাও চামড়া আছে। মাথার দীঘল চুলগুলোর কিছু এখনো মাথার সঙ্গে আঁটা আছে। অবশিষ্টগুলো এদিকে ওদিকে বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে। বুকের খাঁচায় চামড়া নেই। পাজরে একটি খঞ্জর বিদ্ধ হয়ে আছে। গলার হাড়ে একটি সোনার হার লেপ্টে আছে। লিজা একদৃষ্টে খুলিটার দিকে তাকিয়ে আছে।
আন-নাসের ধীরপায়ে লিজার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ লিজা তার উভয় হাত কানের উপর রেখে সজোরে একটা চীৎকার দেয়। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতবেগে উঠে মোড় ঘুরিয়ে দাঁড়ায়। আন-নাসের তাকে বাহুতে জড়িয়ে ধরে বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নেয়। লিজা তার মুখটা আন-নাসেরের বুকে লুকিয়ে ফেলে। শরীরটা তার থর থর করে কাঁপছে। আন-নাসের তাকে কূপের নিকট নিয়ে যায়।
***
লিজার চৈতন্য ফিরে আসার পর আন-নাসের জিজ্ঞাসা করে, তুমি চীৎকার দিলে কেন?
স্বচক্ষে নিজরে পরিণতি দেখে- লিজা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো- তুমি নিশ্চয় সেই শুষ্ক লাশটা দেখে থাকবে- কোনো এক নারীর লাশ। আমার মতো কেউ হবে। সেও আমার ন্যায় রূপের যাদু প্রয়োগ করেছিলো। যে কোন পুরুষের প্রতারণার একটি ফাঁদ ছিলো। বিশ্বাস ছিলো, তার এই রূপ কখনো নিঃশেষ হবে না। এই তরতাজা যৌবন আজীবন টাটকাই থাকবে। তার পাজরের খাঁচায় খঞ্জর বিদ্ধ দেখেছো? গলায় হার দেখেছো? এই হার ও খঞ্জর যে কাহিনী শোনাচ্ছে, তা আমারই কাহিনী। অন্য যেসব খুলি আর তাদের সঙ্গে পড়ে থাকা তরবারী-বর্শা পড়ে আছে, সেসব আমাকে শতবার শোনা কাহিনী ব্যক্ত করছে। সেসব কাহিনী আমি কখনো মনোযোগ সহকারে শুনিনি। আজ এই নারীর মাথার খুলি দেখে আমার মনে হলো, যেনো এটি আমার খুলি। শুষ্ক এই খুলিটায় গোশত চড়ানো হলে তা আমার চেহারা হয়ে যাবে। আমি একটি শকুনকে দেখেছি আমার চোখ দুটো খুলে ফেলছে। একটি সিংহকে দেখেছি, যে আমার গোলাপী গন্ডদেশ খাবলে খাবলে খাচ্ছে। ঐ হায়েনাগুলো আমার মুখমন্ডলটা খেয়ে ফেলেছে। এখন, শুধু খুলিটা পড়ে আছে। আমি দেখতে পেলাম, আমার চোয়াল আর ভয়ানক দাঁতগুলো নড়ছে। আমার কানে শব্দ ভেসে আসে- এই হলো তোমার পরিণতি। তারপর আমার হৃদয়টাকে একটি ভয়ংকর হিংস্র প্রাণী দাঁত দ্বারা কামড়ে ধরেছে।
ফেদায়ীরা যেখানে আমাদের উপর আক্রমণ করেছিলো, কয়েকদিন পর সেখানে গিয়ে দেখো- আন-নাসের বললেন- সেখানেও তুমি এ দৃশ্যই দেখতে পাবে। লাশের কংকাল, মাথার খুলি, তরবারী ও বর্শা এবং সম্ভবত তাদের থেকে খানিক দূরে প্রেসার খুলিও পড়ে আছে দেখবে। তার বুকেও খঞ্জর বিদ্ধ থাকবে। তারা সকলে নারীর জন্য মরেছে। এরাও নারীর জন্যই মরেছে।
আমি যদি আমার নীতি পরিবর্তন না করি, তাহলে নিজের যে দেহটা নিয়ে আমি আজ গৌরব করছি, যার প্রাপ্তির জন্য কেউ জীবনের নজরানা পেশ করছে, কেউ সম্পদ পেশ করছে, শৃগাল-শকুনরা একদিন মরুভূমিতে এমনি সেই দেহের গোশতও খাবলে খাবে- লিজা বললো- কিন্তু মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে না, নিজেদের ধ্বংস চোখে দেখে না। আমি নিজেকে চিনে ফেলেছি। লিজার আসল পরিচয় পেয়ে গেছি। তুমিও শুনে নাও আন নাসের! খোদা তোমাকে পুরুষের শক্তি ও পুরোষিত সৌন্দর্য দান করেছেন। যে নারীই দেখবে, সে-ই তোমার নিকটে আসবার আকাংখা ব্যাক্ত করবে। যাও, দেখে আসো, তুমিও তোমার পরিণতি দেখো আসো।
