লিজা ভালোবাসার পিয়াসী- সেই ভালোবাসা, যা আত্মাকে প্রশান্ত করে দেবে। দৈহিক ভালোবাসা পেয়েছে লিজা এবং পেয়েছে সেই পুরুষরে থেকে, যাদের প্রতি তার ঘৃণা ছিলো। আসিয়াত দুর্গে যাওয়ার সময় এবং দুর্গে পৌঁছেও সে প্রেসার কাছে তার এই মনোভাব ব্যক্ত করেছিলো। তখন কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সে আন-নাসেরের কাছে গিয়ে বসেছিলো এবং বলেছিলো- আমার উপর ভরসা রাখো।
সেসময় তার মনে কোন প্রতারণার পরিকল্পনা ছিলো না। সেটা ছিলো তার হৃদয়ের আওয়াজ। তখন সে তার আত্মার নির্দেশনায় আন-নাসেরের কাছে চলে গিয়েছিলো। থ্রেসা যদি তাকে সেখান থেকে সরিয়ে না নিয়ে যেতো, তাহলে না জানি মেয়েটি আরো কতো কথা বলতো। পরে তাকে আন-মাসেরকে জালে আটকানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। একাজে পরাকাষ্ঠাও প্রদর্শন করেছে সে। কিন্তু মন তার সঙ্গ দিচ্ছিলো না। এখন কর্তব্য আর হৃদয়ের মাঝে ঘুরপাক খেয়ে ফিরছে লিজা।
আন-নাসের জানে না, কাফেলা অবতরণ করে এখানে তাঁবু স্থাপনের সময় গোমস্তগীন লিজাকে কানে কানে বলেছিলেন- সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তুমি আমার তাঁবুতে চলে এসো। আমি তোমাকে তোমার জাতির প্রেরিত উন্নত মদ পান করাবো। আমি বড় কৌশলে তোমাকে শেখ সান্নানের কবল থেকে রক্ষা করে নিয়ে এসেছি।
লিজা গোমস্তগীনকে কোন উত্তর দেয়নি। তার নিকট থেকে সরে এলে, খৃস্টান তাকে বললো- খোদা তোমাকে এই বৃদ্ধ হায়েনাটার পাঞ্জা থেকে বাঁচিয়ে এনেছন। থ্রেসা ঘুমিয়ে পড়লে তুমি আমার তাঁবুতে চলে আসবে; ফুর্তি করবো।
লিজার নিজের রূপ-যৌবন আর দেহটার প্রতি ঘৃণা জন্মাতে শুরু করে। সে নিজের তাঁবুতে চলে যায় থ্রেসা ঘুমিয়ে পড়ে। লিজার দুচোখের পাতা এক হয় না। সে শয্যা থেকে উঠে পা টিপে টিপে আন-নাসেরের দিকে হাঁটা দেয়। আন-নাসেরও তারই অপেক্ষায় জেগে আছে।
লিজা আন-নাসেরের পার্শ্বে উপবিষ্ট। হঠাৎ আন-নাসের চমকে ওঠে বললো- দেখো তো কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছো মাকি? ঘোড়া আসছে!
হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি- লিজা বললো- সকলকে জাগিয়ে দাও। শেখ সান্নান আমাদের ধরার জন্য সৈন্য পাঠাতে পারে!
আন-নাসের দৌড়ে টিলার উপর উঠে যায়। সে অনেকগুলো প্রদীপ দেখতে পায়। সেগুলো ধাবমান অশ্বের চলনের সাথে সাথে উপর-নীচ হচ্ছে। ঘোড়ার পদশব্দ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। আন-নাসের দৌড়ে নীচে নেমে আসে। লিজাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমন্ত কাফেলার দিকে ছুটে যায়। সকলকে জাগিয়ে তোলে। সে তার সঙ্গীদের নিয়ে টিলার নিকটে চলে যায়। লিজাকে সঙ্গে রাখে। সকলের হাতে বর্শা ও তরবারী আছে। গোমস্তগীনের দেহরক্ষী এবং উষ্ট্ৰচালকরাও বর্শা-তরবারী হাতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
***
তারা পনের-ষোলজন। অশ্বারোহী। ছয়-সাতজনের হাতে প্রদীপ। এসেই তারা গোমস্তগীনের কাফেলাটি ঘিরে ফেলে। একজন হুংকার দিয়ে বললো- মেয়ে দুটোকে আমাদের হাতে তুলে দাও। শেখ সান্নান বলেছেন, মেয়েদেরকে দিয়ে দিলে তোমরা নিরাপদে চলে যেতে পারবে।
আন-নাসের অভিজ্ঞ গেরিলা যোদ্ধা। সে তার সঙ্গীদের আগেই সরিয়ে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে। তিন সঙ্গীকে নিয়ে সে হামলাকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা পেছন দিক থেকে সম্মুখের আরোহীদের উপর বর্শার আঘাত হানে। আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আরোহীরা মাটিতে পড়ে যায়। আন নাসের চীৎকার করে তার সঙ্গীদের বললো- এদের ঘোড়াগুলের পিঠে চড়ে বসো। নিজে একটি ঘোড়া ধরে তাতে চড়ে বসে এবং লিজাকে পিছনে বসিয়ে নেয়। লিজা আন-নাসেরের কোমর শক্ত করে ধরে বসে থাকে।
সান্নানের ফেদায়ীরা এলোপাতাড়ি আক্রমণ শুরু করে। তারা হাতের প্রদীপগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয়। প্রদীপগুলো জ্বলতে থাকে। আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা যথাসাধ্য মোকাবেলা করে। একটি ঘোড়ার ছুটে চলার শব্দ কানে আসে, যা দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। ঘোড়ার আরোহী গোমস্তগীন, যিনি নিজের জীবন রক্ষা করে পালিয়ে যাচ্ছেন। ফেদায়ীরা আন-নাসেরের ঘোড়ার পিঠে লিজাকে দেখে ফেলে। তারা মেয়েটাকে জীবিত ধরে ফেলার চেষ্টা করছে। তিন-চারটি ঘোড়া তাকে ঘিরে ফেলেছে এবং ঘোড়াটাকে আহত করার জন্য বর্শা দ্বারা আঘাত করছে। আন-নাসের অভিজ্ঞ যোদ্ধা। সে ঘোড়াটাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং দুজন ফেদায়ীকে ফেলে দেয়।
ঘোরতর যুদ্ধ চলছে। দ্রুততার সাথে ঘোড়ার মোড় ঘোরানোর কারণে লিজা পা রেকাবে রাখতে পারছে না। হঠাৎ করে আন-নাসের ঘোড়ার মোড় ঘোরালে লিজা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যায়।
ফেদায়ীরা ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে। লিজা উঠে আন-নাসেরের দিকে দৌড় দেয়। কিন্তু দুজন ফেদায়ী তাকে ধরে ফেলে। আন-নাসের ঘোড়া হাঁকায় এবং বর্শা দ্বারা আঘাত হানতে উদ্যত হয়। ফেদায়ীরা ঢালস্বরূপ লিজাকে সম্মুখে এনে ধরে।
আন-নাসের তাঁর সঙ্গীদের কোন খোঁজ জানে না। ধাবমান ও পলায়নপর ঘোড়া এবং তরবারী ও বর্শার সংঘর্ষের শব্দ কানে আসছে তার। তিন-চারজন ফেদায়ীর মোকাবেলায় আন-নাসের একা। প্রতিটি আঘাতই ব্যর্থ যাচ্ছে তার। কারণ, সে আঘাত হানলেই ফেদায়ীরা লিজাকে ঢাল হিসেবে সম্মুখে এগিয়ে ধরে। অবশেষে সেও ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। প্রাণপণ লড়াই করে। নিজে আহত হয় এবং দুই ফেদায়ীকে আহত করে ফেলে দেয়। এমনি অবস্থায় লিজা চীৎকার দিয়ে বলতে থাকে নাসের! তুমি বেরিয়ে যাও। তুমি একা। কিন্তু আন-নাসের দিক-দিশা হারিয়ে ফেলেছে যেনো। সেও চীৎকার করে বলে ওঠে- চুপ থাকো লিজা! এরা তোমাকে নিতে পারবে না।
