শেখ সান্নান ফটকের প্রহরীদের তলব করে। তাদের জিজ্ঞাসা করে, গোমস্তগীনের কাফেলা ব্যতীত আর কার জন্য ফটক খোলা হয়েছে? তারা জানায়, আপনার আদেশ ব্যতীত কারো জন্য ফটক খোলা হয়নি এবং গোমস্তগীন ও তার কাফেলা ব্যতীত আর কেউ বেরও হয়নি। তারা গোমস্তগীনের কাফেলার হিসাব প্রদান করে। রেকর্ডে খৃস্টান লোকটি ও মেয়ে দুটো নেই।
শেখ সান্নান নিজ কক্ষে ফোঁস ফোঁস করছে।
রাতের প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। গোমস্তগীনের কাফেলা এগিয়ে চলছে। তিনি এক স্থানে ঘোড়া থামিয়ে উষ্ট্ৰচালকদের বললেন উটগুলোকে বসাও। ওদেরকে বের করো, আবার মরে যায় না যেনো।
কাফেলার উটগুলোকে বসিয়ে পিঠ থেকে তাঁবুগুলো নামানো হলো। পুটুলিবাঁধা তাঁবু খোলা হলে সেগুলোর মধ্য থেকে খৃস্টান লোকটি, থ্রেসা ও লিজা বেরিয়ে আসে। ঘামে ভিজে চিপপিপে হয়ে গেছে তারা। গোমস্তগীন তাদেরকে ভাবুর মধ্যে পেচিয়ে পুটুলির মতো বেঁধে আসিয়াত দুর্গ থেকে বের করে এনেছেন।
এখন তারা দুর্গ থেকে বহুদূর চলে এসেছে। ফেদায়ীদের ব্যাপারে কোন আশংকা নেই। তারা মুখোমুখি যুদ্ধ করার ঝুঁকি বরণ করে না। তথাপি গোমস্তগীন কাফেলাকে যাত্রাবিরতি দেয়ার সুযোগ দেননি। মেয়ে দুটোকে উটের পিঠে বসিয়ে দেয়া হলো। খৃস্টান লোকটি গেরিলাদের সঙ্গে পায়ে হাঁটছে। তার ও মেয়েদের ঘোড়া দুর্গে রয়ে গেছে। খৃস্টান এই অঞ্চলের ভাষা অনর্গল বলতে পারে। সে আন-নাসেরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে যাতে বন্ধুত্ব-ভালোবাসার রং-ই প্রবল। আন-নাসেরের মন থেকে ভয় দূর হয়ে যায়। লিজাকে কাছে পাওয়াই এখন তার একমাত্র কাম্য।
মধ্যরাতের পর অবস্থানের জন্য কাফেলা এক স্থানে থেমে গেলে এই সুযোগটা হাতে আসে। গোমস্তগীনের জন্য তাঁবু স্থাপন করা হয়। অন্য সকলের জন্য আলাদা আলাদা তাবু দাঁড় করানো হয়। চার গেরিলা, গোমস্তগীনের দেহরক্ষী ও অন্যান্যরা খোলা আকাশের নীচে শুয়ে পড়ে। তারা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখে ঘুম এসে যায়।
আন-নাসেরের ঘুম আসছে না। সে ভাবছে, লিজাকে তাবু থেকে ডেকে আনতে হবে নাকি সে নিজেই এসে যাবে। আন-নাসের ভুলে গেছে, সে সুলতান আইউবীর গেরিলা সৈনিক এবং তার বাহিনী কোন এক স্থানে যুদ্ধ করছে। তার মাথায় এই ভাবনাটাও জাগেনি যে, তাকে ফৌজে ফিরে যেতে হবে এবং পলায়নের এটাই মোক্ষম সুযোগ। এখন সবাই অচেতনের ন্যায় ঘুমিয়ে আছে। অস্ত্রও আছে। খাদ্য-পানীয় আছে। তার সঙ্গীরা তারই উপর নির্ভর করে ঘুমিয়ে পড়েছে। তারা তো তাদের কমান্ডারের নির্দেশনা মান্য করতে বাধ্য। তাদের জানা নেই, তাদের কমান্ডার নিজের বিবেক, ঈমান ও চেতনা এক যুবতীর হাতে তুলে দিয়েছে। এক নারী চরম এক বিধ্বংসী পরিকল্পনা নিয়ে তার বিবেক কজা করে নিয়েছে।
আন-নাসের একটি ছায়া এগিয়ে আসছে দেখতে পায়। ছায়াটা তারই দিকে আসছে। খানিক পর দুটি ছায়া পরস্পর একাকার হয়ে যায়।
লিজা আন-নাসেরকে ঘুমন্ত কাফেলার মধ্য থেকে তুলে সামান্য দূরে একটি টিলার আড়ালে নিয়ে যায়। মেয়েটিকে আজ পূর্বাপেক্ষা বেশি আবেগময় মনে হলো। আন-নাসের পাগলের মতো হয়ে যায় প্রেমপাগল। লিজা তার আবেগের প্রকাশ উচ্চারণের চেয়ে আচরণ দ্বারা বেশি করছে। হঠাৎ সে সামান্য দূরে গিয়ে বলে ওঠলো- একটা প্রশ্নের উত্তর দাও নাসের! তোমার জীবনে কখনো কোন নারী প্রবেশ করেছে কি?
মা এবং বোন ব্যতীত আমি কখনো কোন নারীর ছোঁয়া পাইনি- আন নাসের উত্তর দেয়- যৌবনের শুরুতেই আমি নুরুদ্দীন জঙ্গীর ফৌজে ঢুকে গিয়েছিলাম। অতীতের উপর চোখ বুলালে আমি নিজেকে যুদ্ধের ময়দানে, বালুকাময় প্রান্তরে এবং সঙ্গীদের থেকে দূরে শত্রুর এলাকায় রক্ত ঝরাতে এবং ব্যাঘ্রর ন্যায় শিকারের সন্ধানে ঘুরে ফিরছি দেখতে পাই। আমি যখন যেখানে ছিলাম, কর্তব্য পালনে ত্রুটি করিনি। কর্তবোধ আমার ঈমানের অংশ।
হঠাৎ আন-নাসেরের দেহটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো- লিজা! তুমি বোধ হয় আমার ঈমানের ভিত টলিয়ে দিয়েছো। বলল, তোমরা আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?
তার আগে বলো, তোমার হৃদয়ে আমার ভালোবাসা আছে, নাকি আমাকে দেখে তুমি পশু হয়ে যাও? লিজা এমন এক ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করে, যাতে ভালোবাসা এবং রসিকতার বাম্পও নেই। তার বলার ধরনটা গত রাতের তুলনায় এখন ভিন্ন।
তুমি বলেছিলে, আমি ভালোবাসাকে যেনো অপবিত্র না করি- আন নাসের বললো- আমি প্রমাণ দেবো, আমি পশু নই। তুমি আমাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। তোমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন অপেক্ষা অপরজন অধিক সুশ্রী, বীর যোদ্ধা, সুঠামদেহী ও মর্যাদাসম্পন্ন পুরুষ আছে। তুমি কোনো রাজার দরবারে ঢুকে পড়লে তিনি সিংহাসন থেকে নেমে এসে তোমাকে স্বাগত জানাবেন। তারপরও তুমি আমার মধ্যে কী দেখেছো?
লিজার মুখে কোন উত্তর নেই। আন-নাসের মেয়েটার কাঁধে হাতে রেখে বললো- উত্তর দাও লিজা! লিজা মাথাটা হাঁটুর উপর রেখে দেয়। আন নাসের তার হেঁচকি শুনতে পায়। সে অস্থির হয়ে ওঠে, বার বার জিজ্ঞেস করে, কাঁদছো কেনো লিজা! কিন্তু লিজা কাঁদতেই থাকে। আন-নাসের স্বস্নেহে তাকে বাহুতে জড়িয়ে ধরে। লিজা তার মাথাটা আন-নাসেরের বুকের উপর রেখে দেয়। আন-নাসের বুঝতে পারেনি, যেভাবে তার ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে মানবীয় দুর্বলতা জেগে ওঠে তার বিবেকের উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে, তেমিন লিজাও একটি দুর্বলতার কবলে পড়ে গেছে। এ সেই দুর্বলতা, একজন রাণীকে তার ক্রীতদাসের সম্মুখে অবনত করে তোলে এবং যার কারণে সম্পদের প্রাচুর্যকে পাথরের স্তূপ জ্ঞান করে হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য মানুষ কুঁড়ে ঘরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
