খাওয়ার সময় হলে আন-নাসের এবং তার সঙ্গীদেরকেও খাওয়ার কক্ষে ডেকে নেয়া হলো। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ অকৃত্রিম সম্পর্ক গড়ে তোেলা হলো। এখনো খাবার এনে রাখা হয়নি। শেখ সান্নানের এক চাকর এসে খৃস্টান লোকটিকে বললো, শেখ সান্নান আপনাকে যেতে বলেছেন।
খৃস্টান চলে যায়।
ঐ মেয়েটির ব্যাপারে আপনি কী চিন্তা করেছেন? শেখ সান্নান জিজ্ঞাসা করে।
আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবো। খৃস্টান জবাব দেয়।
তোমার যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে আমার কাছে থাকবে। সানান বললো।
আমি আজই চলে যাবো।
যাও- শেখ সান্নান বললো- আর মেয়েটিকে এখানে রেখে যাও। তুমি তাকে দুর্গ থেকে বের করতে পারবে না।
সান্নান! খৃস্টান বললো- এই দুর্গের প্রতিটি ইট বালিকণা হয়ে যাবে। আমাকে হুমকি দেয়ার দুঃসাহস দেখিও না।
মনে হচ্ছে, তোমার মাথাটা এখনো ঠিক হয়নি- সান্নান বললো- আজ রাত তুমি নিজে লিজাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। তারপর তুমি ইচ্ছে হয় থাকো, ইচ্ছে হয় যাও। এর অন্যথা হলে তুমি যাবে আমার পাতাল কক্ষে আর লিজা আসবে আমার শয়নকক্ষে। যাও, ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো।
***
খৃস্টান লোকটি খাওয়ার রুমে প্রবেশ করে। সকলে অস্থিরচিত্তে তার অপেক্ষা করছিলো। কক্ষে প্রবেশ করেই লোকটি ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলতে শুরু করে- বন্ধুগণ! শেখ সান্নান আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, আজ রাত লিজা তার কাছে থাকবে। তিনি এতোটুকুও বলেছেন, মেয়েটাকে আমি নিজে তার কক্ষে দিয়ে আসবে। অন্যথায় আমাকে পাতাল কক্ষে নিক্ষেপ করে লিজাকে ছিনিয়ে নেবেন।
আপনাকে পাতাল কক্ষে নিক্ষেপ করা হবে, আর আমরা বুঝি মরে যাবো?- আন-নাসের বললো- লিজাকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
মেয়েটা তোমার আবার কী লাগে আন-নাসের? আন-নাসেরের এক সঙ্গী জিজ্ঞাসা করে।
তোমরা নিজেদেরকে আমাদের কয়েদি ভেবো না- গোমস্তগীন বললেন- বিপদটা আমাদের প্রত্যেকের জন্য আসছে।
তোমরা আমাদের নয়- শেখ সান্নারের কয়েদি- খৃস্টান বললো তোমরা আমাদের সঙ্গ দাও। বাইরে গিয়ে আমরা তোমাদেরকে ছেড়ে দেবো। এখন এখান থেকে বের হওয়ার পন্থা খুঁজে বের করো।
শেখ সান্নান আমাকে এই চারজনকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে রেখেছেন- গোমস্তগীন বললেন- আমি তাদেরকে আজই নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমাদেরকে সন্ধ্যার অনেক আগেই রওনা হতে হবে।
গোমস্তগীনের মেজাজটা বেশ চড়া। খাওয়ার মাঝে তিনি সবাইকে তার পরিকল্পনার কথা বলে দেন। আহার শেষে তিনি তার খাদেম ও দেহরক্ষীদের ডেকে বললেন, আমি এক্ষুনি দুর্গ থেকে রওনা হচ্ছি। তাড়াতাড়ি জিনিসপত্র বেঁধে নাও।
তৎক্ষণাৎ কাফেলা প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। গোমস্তগীনের নিজের ঘোড়া ছাড়াও দেহক্ষীদের চারটি ঘোড়া। চারটি উটও আছে, যেগুলোতে খাদ্যদ্রব্য ছাড়াও তাঁবু বোঝাই করা। সফর দীর্ঘ। তাই সঙ্গে তাঁবু রাখা আছে।
গোমস্তগীন শেখ সান্নানের নিকট গিয়ে বললেন, আমি যাচ্ছি এবং চার গেরিলাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।
সুলতান আইউবীর চার গেরিলার ব্যাপারে গোমস্তগীনের লেন-দেন চূড়ান্ত হয়ে আছে। মূল্য তিনি পরিশোধ করে দিয়েছেন।
আমার আশা, আমি যে চার ব্যাক্তিতে প্রেরণ করে রেখেছি, তারা সালাহুদ্দীন আইউবীকে শেষ করেই তবে ফিরবে- শেখ সান্নান বললো তুমি এদের দ্বারা সাইফুদ্দীনকে খুন করাও। তোমরা লড়াই করতে জানো না। তাই শত্রুকে গোপনে হত্যা করা ছাড়া তোমাদের উপায় নেই। ও আচ্ছা, তোমার খৃস্টান বন্ধু আর পরী দুটি কোথায়?
তাদের কক্ষে। গোমস্তগীন উত্তর দেন।
খৃস্টান মেহমান কি ছোট মেয়েটি সম্পর্কে কিছু বলেনি?
হ্যাঁ, শুনলাম তাকে বলছে, আজ রাত তুমি শেখ সান্নানের কাছে থাকো গোমস্তগীন বললেন- লোকটাকে আপনার ভয়ে বেশ ভীত মনে হয়েছে।
এখানে বড় বড় প্রতাপশালী লোকও ভয় পেয়ে থাকে- শেখ সান্নান বললো- লোকটা মেয়েটাকে আমার থেকে এমনভাবে লুকাচ্ছিলো, যেনো ও তার কন্যা।
গোমস্তগীন শেখ সান্নান থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। কাফেলা প্রস্তুত দন্ডায়মান। তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করেন। তার দেহরক্ষীরাও ঘোড়ায় চড়ে বসে। দুজন গোমস্তগীনের সম্মুখে চলে যায়। দুজন পেছনে। তাদের হাতে বর্শা। ঘোড়ার পেছনে আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা এবং তাদেরপেছনে মাল বোঝাই উটের পাল। দুর্গের ফটক খুলে যায়। কাফেলা দুর্গ থেকে বেরিয়ে যায় এবং ফটক বন্ধ হয়ে যায়।
***
শেখ সান্নানের আসিয়াত দুর্গ আর গোমস্তগীনের কাফেলার মাঝে দূরত্ব বাড়ছে। আকাশের সূর্যটা দিগন্তের পেছনে চলে যাচ্ছে। এক সময়ে সূর্য অস্তমিত হয়ে কাফেলা ও দুর্গকে লুকিয়ে ফেলে। দুর্গে প্রদীপ জ্বলে ওঠে। পুরোপুরি রাত নেমে এলে শেখ সান্নান দারোয়ানকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে খৃস্টান লোকটি মেয়েটিকে নিয়ে আসেনি? সে না সূচক জবাব পায়। পরপর তিন-চারবার জিজ্ঞাসা করার পরও একই উত্তর মিলে। খাস খাদেমকে ডেকে বললো- তুমি গিয়ে খৃষ্টান মেহমানকে বলল, যেনো সে ছোট মেয়েটিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আসে।
খাদেম খৃস্টানদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোতে প্রবেশ করে। সেখানে কেউ নেই। মেয়ে দুটোও নেই। সবগুলো কক্ষ শূন্য। সে ওদিক-ওদিক তাকায়। দুর্গের বাগিচায় ঘুরে-ফিরে দেখে। টিলার আশপাশে ঘুরে দেখে। কোথাও কেউ নেই। ফিরে এসে শেখ সান্নানকে জানায়, কাউকে পাওয়া যায়নি- খৃস্টান মেহমান এবং দুই মেয়ে কাউকেই নয়। সান্নান আকাশটা মাথায় তুলে নেয়। বাহিনীর কমান্ডারকে নির্দেশ দেয়, দুর্গের কোণায় কোণায় তল্লাশী চালাও। খৃস্টান লোকটাকে খুঁজে বের করো। বাহিনীতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। দুর্গের প্রতি ইঞ্চি জায়গায় অনুসন্ধান শুরু হয়ে যায়। সর্বত্র প্রদীপের ও মশালের আলো ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোন স্থান থেকে খৃস্টান লোকটাকে বের করা গেলো না।
