লিজা তোমারই ন্যায় রাজকন্যা- আন-নাসের বললো- আর আমি কয়েদি। আমি একজন তুচ্ছ মানুষ। লিজার ধর্ম এক, আমার আরেক। রাজকন্যা আর কয়েদির মাঝে প্রেম হতে পারে না।
তুমি বোধ হয় নারীর সহজাত সম্পর্কে অবহিত নও- প্ৰেসা বললো রাজকন্যা যখন স্বীয় কয়েদিকে মন দিয়ে বসে, তখন তাকে রাজপুত্র মনে করে নিজেকেই তার কয়েদি বানিয়ে নেয়। ভালোবাসা ধর্মের শিকল ছিঁড়ে ফেলে। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। তার একই কথা, আমার জীবন মরণ দু-ই আন-নাসেরের জন্য। সে হয়তো বলবে, তুমি তোমার ধর্ম ত্যাগ করে, তাহলে আমি আমার গলা থেকে ক্রুশ খুলে ফেলে দেবো। তুমি জানো না আন-নাসের! লিজা শুধু তোমার খাতিরে শেখ সান্নানকে রুষ্ট করেছে। তিনি তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লিজা তার শত্রুতা ক্রয় করে তোমাদেরকে রক্ষা করেছে। সান্নান লিজাকে যে শর্ত দিয়েছেন, তা মেনে নেয়া সেই মেয়ের পক্ষেই সম্ভব, যাকে কারো ভালোবাসা অন্ধ করে তুলেছে। আমরা যদি এই দুর্গ থেকে দ্রুত বের হতে না পারি, তাহলে লিজা সেই শর্ত পালন করতে বাধ্য হবে।
আমি তা হতে দেবো না- আন-নাসের বললো- লিজার সম্ভ্রমের জন্য আমি মৃত্যুকেও বরণ করে নিতে প্রস্তুত।
তোমার অন্তরে কি লিজার প্রতি ততোটুকু ভালোবাসা আছে, যতটুকু আছে তোমার প্রতি তার?
লিজা মেয়ে হয়ে যদি আমার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে, তাহলে আমি পুরুষ হয়ে পারবো না কেন? আমি লিজাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসি।
তোমার প্রতি আমার একটি মাত্র নিবেদন, তুমি তাকে ধোকা দিও না থ্রেসা বললো- তুমি আমাদের কয়েদি নও। গোমস্তগীন তোমাকে তার মেহমান মনে করেন।
লিজার ব্যাপারে আন-নাসেরের মস্তিষ্ক স্বচ্ছ হয়ে যায়। তার হৃদয় লিজার প্রেমে ভরে ওঠে। এই মুহূর্তে লিজাকে এক নজর দেখার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে আন-নাসের। সে থ্রেসাকে জিজ্ঞাসা করে, লিজা কোথায়? থ্রেসা বললো, সারারাত ঘুমায়নি। অন্য কক্ষে শুয়ে আছে।
থ্রেসার তীর লক্ষ্যে আঘাত হানে। সে লিজার যাদুময়তা আন-নাসেরের বিবেকের উপর পুরোপুরি প্রয়োগ করে দেয়। এটাই তার লক্ষ্য। এই মেয়েগুলো সীমাহীন চতুর। এটাই তাদের দীক্ষা। মানবীয় দুর্বলতা নিয়ে খেলতে পারঙ্গম তারা।
আন-নাসের প্রেসার সম্মুখ থেকে উঠে যায়। এখন সে বাতাসে উড়ছে যেন। কক্ষে ফিরে গেলে সঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করে, কোথায় গিয়েছিলেন? আন-নাসের মিথ্যা জবাব দেয় এবং তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদান করে, সব ঠিক হয়ে যাবে।
আন-নাসের আপন কর্তব্য থেকে সরে যেতে শুরু করেছে।
***
খৃস্টান লোকটি গোমস্তগীনের নিকট উপবিষ্ট। গোমস্তগীন তাকে বলেছিলেন, আমি আন-নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে এক-দুদিনের মধ্যে হাররান নিয়ে যেতে চাই। ইত্যবসরে থ্রেসাও এসে পড়ে। সে বললো গেরিলাদের কমান্ডার আমাদের জালে এসে পড়েছে।
লিজা কীভাবে আন-নাসেরের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং নিজে কীভাবে তাতে পূর্ণতা দান করেছে, তার বিবরণ দেয়। থ্রেসা বললো- এই লোকটাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এখন দেখার বিষয় হলো, নিজের আসল পরিচয় ভুলে গিয়ে এ কাজের জন্য প্রস্তুত হতে তার কতো সময়ের প্রয়োজন হবে।
আমি এই চারজনকে এক-দুদিনের মধ্যে হাররান নিয়ে যেতে চাই গোমস্তগীন বললেন- তোমরা উভয়ে কিংবা শুধু লিজা আমার সঙ্গে যাবে কি? খুনের জন্য আন-নাসেরকে লিজাই প্রস্তুত করতে পারে।
মেয়েদেরকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি- খৃস্টান বললো- আমি বেশিদিন থাকতে পারবো না। সম্রাটদেরকে আমার তাড়াতাড়ি সংবাদ পৌঁছাতে হবে, হাল্ব, হাররান ও মসুলের ফৌজ সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছে এবং সেসব বাহিনীর সালারগণ পলায়ন ছাড়া আর কিছুই জানে না। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে আমি তাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করার জন্য অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করার পরামর্শ দেবো। হতে পারে, আমাদের পক্ষ থেকে আপনারা যে সহায়তা পাচ্ছেন, তা বন্ধ করে দেয়া হবে।
এ কথা বলবেন না- গোমস্তগীন অনুনয়ের সুরে বললেন- আমাকে একটি মাত্র সুযোগ দিন। আমি আইউবীকে হত্যা করিয়ে দেবো। তারপর দেখবেন, কীভাবে আমি বিজয়ী বেশে দামেশক প্রবেশ করি। এই মেয়ে দুটোকে কিংবা শুধু লিজাকে আমাকে দিয়ে দিন। মেয়েটা গেরিলাদের কমান্ডারকে মুঠোয় নিয়ে ফেলেছে। সে-ই তাকে প্রস্তুত করবে। আন-নাসের সালাহুদ্দীন আইউবীর কাছে বিনা বাধায় যেতে পারবে। আইউবীকে অনায়াসে হত্যা করা তার পক্ষে সম্ভব। তাছাড়া চিন্তা করে দেখুন, আপনি যদি লিজাকে নিয়ে যান, তাহলে আন-নাসের আমার কোন কাজের থাকবে না।
খানিক তর্ক-বিতর্কের পর খৃস্টান বললো- হাররান যাওয়ার পরিবর্তে আমরা এখানেই থাকি। মেয়ে দুটো আন-নাসেরকে প্রস্তুত করুক। হতে পারে তার সঙ্গী তিনজনকেও প্রস্তুত করে নেয়া যাবে। তাদের অন্তরে সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে।
আন-নাসের সম্পর্কে আমার অভিমত হলো, লোকটা অপরিপক্ক মানুষ। লিজা তার বিবেক কজা করে নিয়েছে। দু-তিনটি সাক্ষাতের পরই সে লিজার আঙুলের ইশারায় নাচতে শুরু করবে।
আজ তাদের চারজনকেই সঙ্গে বসিয়ে আহার করাও। খৃস্টান বললো।
