একাধিকবার দুশমনের তীর আন-নাসেরের দেহ স্পর্শ করে অতিক্রম করেছে। বহুবার শত্রুর বর্শার আগা তার গায়ের চামড়া ছিলে দিয়েছে। কিন্তু তবু সে ভয় পায়নি। দেহ স্পর্শ করে চলে যাওয়া তীর-বর্শা তার দেহের উপর এক সেকেন্ডের জন্যও কম্পন সৃষ্টি করেনি। মৃত্যু কয়েকবার তার দেহ ছুঁয়ে অতিক্রম করেছিলো। কিন্তু তার দেহে সামান্যতম আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। নিজ হাতে লাগানো আগুনের মধ্য দিয়েও অতিক্রম করেছে। কিন্তু এখন একটি মেয়ের চুলের পরশে তার অস্তিত্ত্বে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। এই পরশ থেকে বাঁচবার জন্য সেরূপ চেষ্টা করছে না, যেমন চেষ্টা করতো তীর-বর্শা থেকে আত্মরক্ষার জন্য। ভাব জমাতে জমাতে লিজা যখন তাঁর আরো ঘনিষ্ট হয়, তখন তার মনে হলো, মেয়েটি এখনো তার থেকে দূরে অবস্থান করছে।
শিকারকে কীভাবে হেপটানাইজ করতে হয়, লিজাকে তার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আন-নাসেরের ক্ষেত্রে সেই বিদ্যা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে লিজা। আন-নাসেরের এমন এক ধরনের পিপাসা অনুভূত হতে শুরু করে, যা মরুভূমির পিপাসা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পানি এই পিপাসা নিবারণ করতে পারে না। রাত যতোই গম্ভীর হচ্ছে, আন-নাসের তার আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলছে। প্রথম আন-নাসেরের দেহ কেঁপে ওঠেছিলো। তারপর প্রকম্পিত হয়েছিলো ঈমান। চেতনার ভিত নড়ে ওঠেছিলো।
হ্যাঁ- আন-নাসের টলায়মান কণ্ঠে বললো- আমি তোমার ভালোবাসা কবুল করে নিয়েছি। কিন্তু এর পরিণতি কী হবে? তুমি আমাকে তোমার সঙ্গে যেতে বলবে? এ কথা কি বলবে, তুমি তোমার ধর্ম ত্যাগ করো? বিয়ে করে তোমাকে বউ বানাতে বলবে কি?
আমি এসব কিছুই ভাবিনি- লিজা বললো- তুমি যদি আমার সঙ্গ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো এবং আজীবনের জন্য আমাকে তোমার জীবনসঙ্গীনি বানিয়ে নিতে চাও, তাহলে আমিই বরং আমার ধর্ম পরিত্যাগ করবো। তুমি আমার থেকে কুরবানী কামনা করো। বিনিময়ে আমাকে তুমি সেই ভালোবাসা দাও, যা অপবিত্র নয়। সাময়িক ভালোবাস তো চাইলেই পাওয়া যায়। আমার আত্মা তোমার স্থায়ী ভালোবাসার প্রত্যাশী।
প্রেমের নেশা পেয়ে বসেছে আন-নাসেরকে। রাত অর্ধেকেরও বেশি কেটে গেছে। আন-নাসের জায়গা থেকে উঠতে চাচ্ছে না। লিজা বললো, তুমি তোমার কক্ষে চলে যাও।.ধরা পড়লে পরিণতি ভালো হবে না।
***
আন-নাসের কক্ষে ফিরে আসে। তার সঙ্গীরা গভীর ঘুমে বিভোর। সে শুয়ে পড়ে। কিন্তু তার ঘুম আসছে না। লিজা আপন কক্ষে প্রবেশ করলে প্রেসার চোখ খুলে যায়।
এতো দেরি? থ্রেসা জিজ্ঞাসা করে।
পাথর এক ফুৎকারে মোম হয়ে যায় নাকি? লিজা উত্তর দেয়।
পাথর বেশি শক্ত নয় তো?
আমার ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা ছিলো না- লিজা উত্তর দেয়- তবে নীরের শেষ তীরটিও আমাকে ছুঁড়তে হয়েছে। সে আমার পুরোপুরি গোলাম হয়ে গেছে।
নাকি নিজেই মোম হয়ে এসেছো? থ্রেসা সংশয় ব্যক্ত করে।
তাও হতে পারে- লিজা হেসে বললো- সুদর্শন সুপুরুষ কিনা। আমাকে অতো সরল মনে করো না। তবে এ ধরনের সহজ-সরল পুরুষ আমার ভালো লাগে, যাদের চরিত্রে কোন ফাঁকিবাজি নেই। হতে পারে লোকটাকে আমার ভালো লাগার কারণ, আমি সাইফুদ্দীনের ন্যায় বৃদ্ধ ও বিলাসী পুরুষদের থেকে অনীহ হয়ে পড়েছি।
আন-নাসের থেকেও অনীহ থাকতে হবে- থ্রেসা বললো- প্রেমের ফাঁদকে আরো বেশি যাদুকরী বানাতে হবে। মনে রাখবে, এর দ্বারা ক্রুশের সবচে বড় শত্রু সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করাতে হবে।
থ্রেসা লিজাকে আরো কতিপয় নির্দেশনা প্রদান করে। নতুন দু-একটি পন্থা শিখিয়ে দুজনে শুয়ে পড়ে। আন-নাসের এখনো সজাগ। নির্জনে লিজার কথা বার্তা এবং প্রেম নিবেদনের ঘটনা নিয়ে চিন্তা করে। তার প্রশিক্ষণের কথা মনে পড়ে যায়, যাতে তাকে খৃস্টান মেয়েদের জাদুময় ফাঁদ সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিলো। লিজা তার কাছে একটি সুদর্শন প্রতারণা বলে মনে হলো। আবার ভাবনা জাগে, না, এটা প্রতারণা নয়- বাস্তব সত্য।
আন-নাসের একজন সুদর্শন সুপুরুষ। নিজের এই গুণ সম্পর্কে সে নিজেও অবহিত। মানবীয় চরিত্রের দুর্বলতাগুলো আন-নাসেরকে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত করতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত সে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলো না। তার দুচোখের পাতা বুজে আসে। আন-নাসের ঘুমিয়ে পড়ে।
এক ব্যক্তি আন-নাসেরকে জাগিয়ে বললো, থ্রেসা আপনাকে তার কক্ষে যেতে বলেছেন।
নাসের চলে যায়। কক্ষে প্রেসা একা।
বসো নাসের!- প্রেসা বললো- তোমার সঙ্গে আমার অনেক জরুরি কথা আছে।
আন-নাসের লিজার সম্মুখে বসে পড়ে। থ্রেসা বললো- আমি তোমাকে একথা জিজ্ঞেস করবো না, রাতে লিজা তোমাকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলো, নাকি তুমি তাকে নিয়ে গিয়েছিলে। আমি বলতে চাচ্ছি, এই মেয়েটা অত্যন্ত সরল ও নিষ্পাপ। আমি জানি, সে তোমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আমি তোমাকে ও তাকে এভাবে রাতভর বাইরে বাইরে থাকার অনুমতি দিতে পারি না। তুমি লিজাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করো না।
আমি এমন কোনো চেষ্টা করিনি- আন-নাসের বললো- আমরা কথা বলতে বলতে সামান্য দূরে চলে গিয়েছিলাম।
আমি লিজাকে থামাতে পারবো না~ থ্রেসা বললো- তোমার থেকে আমি এই আশা রাখি, তুমি তার বয়স, রূপ-যৌবন ও আবেগ থেকে সুযোগ নিতে যেও না।
