আমার কিছুই বুঝে আসছে না, এসব কী ঘটছে- আন-নাসের ঝাঝালো কণ্ঠে বললো- আমি একজন বন্দি। অথচ আমার সঙ্গে এমন সব আচরণ করা হচ্ছে, যেনো আমি রাজপুত্র!
তোমার বিস্ময় যথার্থ- লিজা বললো- একটু বুঝবার চেষ্টা করো। গোমস্তগীন তোমাকে বলে দিয়েছেন, তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রুতা পরিত্যাগ করেছেন। এখন তিনি আইউবীর কোন সৈনিককে বন্দি মনে করেন না। তোমার এবং তোমার সঙ্গীদের সৌভাগ্য যে, তোমরা যখন এখানে এসেছে, গোমস্তগীন এখানে ছিলেন। দ্বিতীয় কারণ আমার ব্যক্তিসত্ত্বা। তুমি আমার পদমর্যাদা জানো না। আমি তোমার দৃষ্টিতে একটি দুশ্চরিত্র মেয়ে, যে কিনা রাজা-বাদশাহ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিনোদন কর্মী। আমার ব্যাপারে এসব তোমার ভুল ধারণা এবং কল্পনা মাত্র। লিজা আন-নাসেরের বাহুটা আরো শক্ত করে ধরে বললো- আসো, আমরা এখান থেকে দূরে কোথাও গিয়ে বসি। আসো, আমি তোমার ভুল শুধরে দিই। তারপরই তুমি মুক্ত হয়ে যাবে। তারপর তুমি আমার ব্যাপারে যা খুশি সিদ্ধান্ত নিয়ো।
দুর্গের এই অংশটা অতিশয় মনোরম ও আকর্ষণীয়। উন্মুক্ত ময়দান। মধ্যখানে বড় বড় টিলা। আশপাশ সবুজ-শ্যামল। স্থানে স্থানে কুল গাছ ও অন্যান্য বৃক্ষ। দুৰ্গটা বেশ প্রশস্ত ও চওড়া। লিজা আন-নাসেরকে কথায় কথায় কক্ষ থেকে দূরে টিলার আড়ালে নিয়ে যায়, যেখানে ফুলের সৌরভ মৌ মৌ করছে। লিজা যখন সেদিকে যাচ্ছিলো, তখন খৃস্টান লোকটি ও থ্রেসা একটি দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি দেখছিলো।
লিজা লোকটাকে কাবু করে ফেলবে। খৃস্টান বললো।
মেয়েটি আবেগপ্রবণ- থ্রেসা বললো- কর্তব্য পালনে ভীত হয়ে তারই কাছে গিয়ে বসেছিলো। তবে অতোটা কাঁচা এবং আনাড়ীও নয়।
তুমি জানতে চেয়েছিলে আমি তোমার প্রতি এত দয়াপরবশ কেননা হয়েছি। লিজা বললো- আমাকে শত্রু মনে করে তুমি এই প্রশ্ন করেছিলে। তখন আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারিনি যে, শত্রুতা মূলত তোমার ও আমার রাজাদের মাঝে। আমার-তোমার মাঝে শক্রতার কী কারণ থাকতে পারে?
বন্ধুত্বেরই বা কী সূত্র থাকতে পারে? আন-নাসের বললো। লিজা গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আন-নাসেরের উভয় কাঁধে হাত রেখে বললো- তুমি একটা পাথর। আমি শুনেছি, মুসলমানের হৃদয় রেশমের ন্যায় কোমল হয়ে থাকে। কিছুক্ষণের জন্য ধর্মকে দূরে সরিয়ে রাখো। নিজেকে মুসলমান কিংবা খৃস্টান না ভাবো। আমরা উভয়ে মানুষ। আমাদের বক্ষে হৃদয় আছে। তোমার অন্তরে কি কোনো কামনা, কোনো পছন্দ এবং কোন বস্তুর প্রতি ভালোবাসা নেই? আছে- অবশ্যই আছে। তুমি পুরুষ। তুমি তোমার হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো। আমি নারী। আমি পারি না। আমার অন্তর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। তুমি আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। আমরা যখন তোমাদেরকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দুর্গে নিয়ে এসেছি, তখন শেখ সান্নান তোমাদেরকে পাতাল কক্ষে আবদ্ধ করে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদি তার সেই নির্দেশ পালিত হতো, তাহলে তোমরা সেখান থেকে লাশ হয়ে বের হতে। তোমার ন্যায় সুদর্শন একটি যুবকের এই পরিণতি আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি শেখ সান্নানকে বললাম, এরা তোমার নয়। আমাদের কয়েদি। এরা আমাদেরই হেফাজতে থাকবে। এ প্রসঙ্গে তার সঙ্গে আমার ও প্রেসার মাঝে কথা কাটাকাটিও হয়। তিনি এক শর্তে আমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তিনি বললেন- ঠিক আছে, যদি তাদেরকে পাতাল কক্ষ থেকে রক্ষা করতেই চাও, তাহলে তোমরা আমার শয়নকক্ষে এসে পড়ো। আমার অন্তরে বুড়োটার প্রতি ঘৃণা জন্মে যায়। আমি ইতস্তত করলে তিনি বললেন- ভিন্ন কোন কথা নেই- হয় তারা পাতাল কক্ষে যাবে, নয়তো তোমরা আমার শয়নকক্ষে আসবে। আমার গভীরভাবে অনুভূত হলো, যেনো আমি তোমাকে আজ থেকে নয়- শৈশব থেকেই কামনা করছি এবং তোমার খাতিরে আমি নিজের দেহ, জীবন ও ইজ্জত সবকিছু বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি।
তুমি কি তোমার সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছো? আন-নাসের হঠাৎ চমকে ওঠে জিজ্ঞাসা করে।
না- লিজা বললো- আমি তাকে লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে কালক্ষেপণ করেছি। তিনি আমাকে এই বলে ছেড়ে দিয়েছেন যে, আমরা দুর্গে মুক্ত থাকবো; কিন্তু তার কয়েদি হয়ে থাকবো।
আমি তোমার ইজ্জতের হেফাজত করবো- আন-নাসের বললো।
তুমি কি আমার ভালোবাসা বরণ করে নিয়েছো? লিজা সহজ-সরল কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে।
আন-নাসের কোন জবাব দেয়নি। খৃস্টান মেয়েরা রূপ-যৌবন ও সুদর্শন প্রতারণার জাল কীভাবে বিছিয়ে থাকে, প্রশিক্ষণে তাকে সে বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু সেসব মৌখিক নির্দেশনা আর বাস্তবতা এক নয়। তাকে তো সেই জাল থেকে আত্মরক্ষার বাস্তব প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি এবং তা সম্ভবও নয়। এখন একটি খৃস্টান মেয়ে তেমনি জাল বিছালে আন-নাসেরের ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে মানবীয় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে বসে এবং সেই দুর্বলতা তার বিবেক-বুদ্ধির উপর জয়ী হতে শুরু করে। আন-নাসের পাহাড়-পর্বত ও মরু-বিয়াবানে মৃত্যুর সঙ্গে খেলা করার মতো মানুষ ছিলো। লিজার ন্যায় মনকাড়া মেয়ে কখনো দেখেনি। কোন নারীর রূপ-যৌবন কোনোদিন তাকে আকর্ষণও করেনি। কিন্তু এখন যখন লিজার বিক্ষিপ্ত রেশমকোমল চুলগুলো তার গন্ডদেশ ছুঁয়ে যাচ্ছে, তখন তার অস্তিত্ত্বে কেমন যেনো একটা ঢেউ খেলে যাচ্ছে এবং দেহে কেমন একটা কম্পন অনুভূত হচ্ছে।
