আপনি তাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত করছেন না কেন?- খৃস্টান বললো- তবে আপনি তাদেরকে হাশীশ কিংবা অন্য কোন নেশা দেবেন না। তাদের উপর আবেগের নেশা সৃষ্টি করে দিন।
এমন নেশা আপনিই সৃষ্টি করতে পারেন। গোমস্তগীন বললেন।
খৃস্টান লোকটি থ্রেসা ও লিজার প্রতি তাকিয়ে মুচকি হাসে। লিজা বললো- আমি গেরিলাদের কমান্ডারকে প্রস্তুত করতে পারি। তার নাম আন-নাসের। অপর তিনজনের দায়িত্ব আপনি নিন।
তুমি আন-নাসেরকে প্রস্তুত করো- খৃস্টান বললো- অন্যদেরকে আপাতত এমনিতেই রেখে দাও। আমি মানবীয় স্বভাব যতটুকু জানি, আন-নাসের নিজেই তার সঙ্গীদেরকে তৈরি করে নেবে। তাদেরকে এখানে নিয়ে আসো। আন-নাসেরকে এক কক্ষে এবং অন্যদেরকে আরেক কক্ষে থাকতে দাও। আর তোমরা সতর্ক থাকবে। এই মেয়েটির প্রতি সান্নানের কুদৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে। এর প্রতি তার আসক্তি প্রবল। একে তার হাতে ফিরিয়ে না দিলে তিনি আমাকে মেহমানখানা থেকে কয়েদখানায় স্থানান্তরিত করবেন। তিনি আমাকে ভাববার সুযোগ দিয়েছেন।
আপনি তার ব্যাপারে অস্থির হবেন না- গোমস্তগীন বললেন- আমি এই চার গেরিলাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি এবং এই মেয়েরাও আমার সঙ্গে যাবেন।
***
আন-নাসের ও তার তিন সঙ্গীকে খৃস্টান সেনা অফিসারদের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। আন-নাসেরকে আলাদা কক্ষে রাখা হলো। কিন্তু সে আপত্তি জানায়, আমি আমার সঙ্গীদের ছাড়া আলাদা থাকবো না। থ্রেসা ও লিজা তাকে তাদের জালে আটকানোর জন্য আলাদা রাখতে চাইছে।
তুমি তাদের কমান্ডার- খৃস্টান লোকটি আন-নাসেরকে বললো মাকে তোমার অধীনদের থেকে আলাদা-ই থাকা উচিত। আমাদের কাছে উচ্চ-নীচুর ভেদাভেদ নেই- আন-নাসের বললো–স্বয়ং আমাদের সুলতান সাধারণ সৈন্যদের সঙ্গে থাকেন। আমি একজন সামান্য কমান্ডার মাত্র। সঙ্গীদের থেকে আলাদা অবস্থান করে অহংকার দেখালে আমার পাপ হবে।
আমরা তোমাকে সম্মান করতে চাই- খৃস্টান বললো- নিজ এলাকায় গিয়ে সৈন্যদের সঙ্গে থেকো। আমরা অধীনদের সঙ্গে রেখে তোমাকে অপমান করতে চাই না।
না, আমাদের গেরিলা কমান্ডানগণ অধীনদের সঙ্গে একত্র থেকেই বাঁচে এবং তাদেরই সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে- আন-নাসের বললো- আমরা মৃত্যুপথের সহযাত্রী। আমরা একে অপর থেকে আলাদা হই না। আমরা যদি আপনার মেহমান হতাম, তাহলে আমি আপনার কথা মানতে পারতাম। কিন্তু আমরা আপনার কয়েদি। আমরা একজন আপনাদের থেকে যে কষ্ট-নির্যাতনের শিকার হবো, সকলে তার অংশীদার হতে চাই। এক সঙ্গীর জীবন রক্ষার জন্য আমরা অপর তিন সঙ্গী জীবন কুরবান করে দেবো।
তোমরা আমাদের বন্দিদশা থেকে পালাবার চেষ্টা করবে নাকি? গোমস্তগীন মুচকি হেসে বললেন।
আমরা মুক্ত হওয়ার চেষ্টা অবশ্যই করবো- আন-নাসের বললো- এটা আমাদের কর্তব্য। আমরা নিজেরা মৃত্যুবরণ করে মুক্ত হবো কিংবা আপনাদের সকলকে মেরে। আমাদেরকে যদি কয়েদখানায়ই রাখতে হয়, তো শিকল পরিয়ে দিন। আমাদেরকে ধোকা দেবেন না। আমরা ময়দানের পুরুষ। আমরা সাইফুদ্দীন-গোমস্তগীনের ন্যায় ঈমান-বিক্রেতা নই।
আমি গোমস্তগীন- গোমস্তগীন বললেন- হাররানের স্বাধীন শাসনকর্তা। তুমি আমাকে ঈমান বিক্রেতা বলেছো।
তাই নাকি! তাহলে আমি আপনাকে পুনরায় ঈমান-বিক্রেতা বলছি? আন-নাসের বললো- আমি আপনাকে গাদ্দারও বলছি।
কিন্তু এখন আমি না ঈমান-বিক্রেতা, না গাদ্দার।- গোমস্তগীন বললেন। আন-নাসেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য গোমস্তগীন মিথ্যা বললেন- দেখো না যুদ্ধ হচ্ছে তুর্কৰ্মনে আর আমি এখানে! আমি যদি তোমাদের শত্রু হতাম, তাহলে তোমরা এখন যেরূপ মুক্ত আছে, সেরূপ মুক্ত থাকতে পারতে না। আমি সাইফুদ্দীন ও আস-সালিহ থেকে আলাদা হয়ে গেছি। আমি তোমাদেরকে সম্মানের সাথে এই দুর্গ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি একজন সাধারণ কমান্ডার। কিন্তু তোমার বুকে সালাহুদ্দীন আইউবীর মর্যাদা ও চেতনা বিরাজমান।
কিন্তু আমি আমার সঙ্গীদের থেকে আলাদা থাকবো না- আন-নাসের বললো- আমার দ্বারা আপনারা এই পাপ করাবেন না।
আচ্ছা, ঠিক আছে- খৃস্টান বললো- তুমি তোমার সঙ্গীদের সাথেই থাকো।
আন-নাসেরের তিন সঙ্গী একটি প্রশস্ত ও মনোরম কক্ষে অবস্থান করছে, যেখানে পালঙ্কের উপর নরম গালিচা পাতা আছে। তাদের সেবার জন্য একজন খাদেম দেয়া হয়েছে। তারা খাদেমকে জিজ্ঞাসা করে, এটা দুর্গের কোন্ অংশ এবং এখানে কী হয়? খাদেম বললো, এটা মেহমানদের কক্ষ। এখানে শুধু উচ্চপদস্থ ও মর্যাদাসম্পন্ন মেহমানদেরই রাখা হয়।
আন-নাসেরের তিন সঙ্গী গভীরভাবে লক্ষ করলো, তাদের সঙ্গে বন্দির আচরণ করা হচ্ছে না। তারা ছিলো অতিশয় ক্লান্ত। নরম বিছানায় গা এলিয়ে দেয়ামাত্র তাদের ঘুম এসে যায়। তারা গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়।
***
খৃস্টান ও গোমস্তগীন আন-নাসেরকে দীর্ঘ সময় নিজেদের সঙ্গে রাখে। তার সঙ্গে এমন সম্মানজনক কথাবার্তা বলে যে, আন-নাসেরের চেতনার প্রখরতা কিছুটা কমে আসে। এটা তাদের সাফল্যের প্রথম ধাপ। লিজা, উক্ত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আন-নাসের যখন সেই কক্ষ থেকে বের হয়, ততোক্ষণে তার সঙ্গীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। আন নাসের একটা কক্ষের বারান্দায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে, এমন সময় একটি নারীকণ্ঠ ফিস্ ফিস্ শব্দে তাকে ডাক দেয়। জায়গাটা অন্ধকার। আন নাসের দাঁড়িয়ে যায়। একটি কালোপনা ছায়া এগিয়ে আসে। মেয়েটি লিজা। লিজা আন-নাসেরের বাহু ধরে ফেলে বললো- এবার নিশ্চিত হয়েছে তো আমি পরী নই- মানুষ?
