আপনি কি সুলতানের হাতে মুসলমানের রক্ত ঝরানো পছন্দ করবেন?- আল হিময়ারী বললেন- আপনি কি চান, আমরা পরস্পর যুদ্ধ করি আর খৃস্টানরা আমাদের তামাশা দেখুক?
আপনাদের সুলতানকে খৃস্টানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বলুন। এজাজের আমীর বললেন।
তা আপনি কি খৃস্টানদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন না?- আল-হিময়ারী জিজ্ঞেস করেন- আপনি কি তাদেরকে আপনার শত্রু মনে করেন না? ও ২৩
এই মুহূর্তে আমরা সুলতান আইউবীকে আমাদের শত্রু মনে করি, যিনি আমাদেরকে হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন– এজাজের আমীর বললেন- তিনি আমাদের থেকে এই দুর্গ তরবারীর জোরে ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছেন।
এজাজের আমীর আল-হিময়ারীকে এক তিল মর্যাদা দিলেন না এবং তাকে চলে যেতে বললেন।
***
আসিয়াত দুর্গে আগন্তুক খৃস্টান গোমস্তগীনের নিকট উপবিষ্ট। থ্রেসা লিজাও তার সঙ্গে বসা। গোমস্তগীন ও এই খৃস্টান লোকটি পূর্ব থেকেই পরিচিত। খৃস্টান বললো- শুনলাম, আপনি নাকি সালাহুদ্দীন আইউবীকে খুন করাতে করাতে এবার সাইফুদ্দীনকেও হত্যা করার মনস্থ করেছেন?
আপনি কি শুনেননি, সাইফুদ্দীন কীরূপ কাপুরুষতা ও সামরিক অদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন?- গোমস্তগীন বললেন- এই মেয়েরাই বলেছে, সে আমাদের তিন বাহিনীকে এমন শোচনীয় অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে যে, আমরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত যুদ্ধ করার শক্তি-সামর্থ হারিয়ে ফেলেছি। আমি আমাদের বিক্ষিপ্ত সৈন্যদেরকে একত্রিত করে আইউবীকে হাল্ব থেকে দূরে প্রতিহত করতে চাই। সাইফুদ্দীন যদি জীবিত থাকে, তাহলে আক্রোশ মেটানোর জন্য সে পুনরায় বাহিনীর কমান্ড হাতে নেয়ার জন্য জি ধরে বসবে এবং আমাদেরকে আরেকটি পরাজয়ের মুখে ঠেলে দেবে। আমি তো তাকে হত্যা না করে উপায় দেখছি না।
সাইফুদ্দীন অতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নয়, যতোটা আপনি মনে করছেন- খৃস্টান বললো- আমরা যা জানি আপনি তা জানেন না। আমরা আপনার প্রত্যেক বন্ধু ও প্রত্যেক শত্রুকে আপনার চেয়ে ভালো জানি। সে কারণেই আমরা আপনাকে আমাদের উপদেষ্টা দিয়ে রেখেছি। আমি আইউবীর বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশ ধারন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘুরে ফিরছি, তা আপনার অস্তিত্ব এবং আপনার রাজ্যের বিস্তৃতির জন্যই। আমি যে পরিস্থিতি দেখে এসেছি, তার দাবি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করা। নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর সবাই স্বাধীনতা লাভ করেছে। আপনি কেল্লাদার থেকে স্বাধীন শাসক হয়ে গেছেন। আইউবী মরে গেলে আপনি দশগুণ এলাকার শাসক হলেন। যুদ্ধ-বিগ্রহের আশংকা আজীবনের জন্য দূর হয়ে যাবে। আমি ত্ৰিপোলী যাচ্ছি। আপনার বাহিনীর উট-ঘোড়ার যে ক্ষতি হয়েছে, আমি অতি শীঘ্র তা পূরণ করে দেবো। অস্ত্রও প্রেরণ করবো।
আপনি সাহস হারাবেন না। আইউবী মারা গেলে আমরা আপনাকে এতো অধিক সাহায্য দেবো যে, সাইফুদ্দীন, আল-মালিকুস সালিহ ও সকল স্বাধীন মুসলমান শাসকের উপর আপনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে এবং এখন সালাহুদ্দীন আইউবীর যে মর্যাদা, আপনি সেই মর্যাদায় অধিষ্টিত হবেন।
ক্ষমতার মোহ এবং বিলাসপূজা গোমস্তগীনের বিবেকের উপর আবরণ ফেলে দিয়েছে। এতোটুকু বুঝ তার মাথায় ঢুকেনি যে, এই খৃস্টান লোক আপন জাতির প্রতিনিধি এবং সে যা কিছু বলছে ও করছে, তারই জাতির স্বার্থে করছে। লোকটি খৃস্টানদের একজন পদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও নাশকতার হোেতা। সুলতান আইউবীর অগ্রযাত্রা কীভাবে প্রতিহত করা যাবে, ঘুরে-ফিরে তারই একটা ধারণা নেয়ার চেষ্টা করছে সে। প্রতিটি রণাঙ্গনে পরাজিত হয়ে খৃস্টানরা সমস্যার সমাধানে একটা পথ খুঁজে পেয়েছে। তাহলো, সুলতান আইউবীকে হত্যা করে মুসলিম শাসক গোষ্ঠীকে পরস্পর বিরাগভাজন করে তোলা, যাতে আইউবীর মৃত্যুর পর তারা আপসে লড়াই করতে করতে নিঃশেষ হয়ে যায় এবং আরব জগতের রাজত্ব খৃস্টানদের হাতে চলে যায়। এই লক্ষ্য অর্জনের নিমিত্তেই তারা মুসলিম আমীরদের মন মস্তিষ্কে অর্থপূজা এবং রাজত্বের মোহ ঢুকিয়ে দিয়েছে।
সালাহুদ্দীন আইউবীকে খুন করা থেকে তো শেখ সান্নানও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন- গোমস্তগীন বললেন- তিনি নাকি চারজন ফেদায়ী প্রেরণ করে রেখেছেন। কিন্তু তিনি আশাবাদী নন।
এতোগুলো সংহারী আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর সান্নানকে আইউবী হত্যা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়াই উচিত- খৃস্টান বললো- সেই আক্রমণগুলো ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ, ফেদায়ীরা হাশীশের নেশায় অভিযানে গিয়ে থাকে। আইউবীকে কেবল সেই ব্যক্তিই হত্যা করতে পারে, যার হুশ-জ্ঞান ঠিক আছে এবং হৃদয়ের গভীর থেকে অনুভব করে, জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনা থেকেই কাজটা করা উচিত। আপনি বোধ হয় মানবীয় স্বভাব বুঝেন না। আইউবীর উপর যে-ই সংহারী আক্রমণ করতে চায়, সে-ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। যখনই বিপরীত দিক থেকে মোকাবেলা শুরু হয়, তার নেশা দূর হয়ে যায় এবং সে নিজের জীবন রক্ষা করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করে। আপনি বরং সান্নানকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে চেতনায় অন্ধ বানিয়ে এবং অন্তরে আইউবীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে প্রেরণ করুন। তাহলে সে আইউবীকে হত্যা করেই ঘরে ফিরবে।
শেখ সান্নান আমাকে সালাহুদ্দীন আইউবীর চারজন গেরিলা দান করেছেন- গোমস্তগীন বললেন- এবং বলেছেন, এদেরকে প্রস্তুত করে আপনি তাদের দ্বারা সাফুদ্দীনকে হত্যা করান। এই গেরিলারা সাইফুদ্দীনকে তাদের শত্রু মনে করে। আমি এদের দ্বারা সাইফুদ্দীনকে হত্যা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
