ক্লান্তির ছাপ উবে যায় সকলের চেহারা থেকে। মুহূর্ত মধ্যে ঝরঝরে হয়ে উঠে অবসন্ন দেহগুলো। আনন্দের দ্যুতি খেলে উঠে সকলের চোখে-মুখে। কিন্তু সশস্ত্র সৈনিকদের মোকাবেলা করে এতগুলো উট-ঘোড়ার মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় বাহন ছিনিয়ে আনার প্রক্রিয়া কী হবে, তারা এখনো ভেবে দেখেনি।
প্রায় একশত উটের বিশাল এক বহর। যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ নিয়ে যাচ্ছে বহরটি। দেশের অভ্যন্তরে বর্তমানে শত্রুর আশঙ্কা নেই ভেবে কাফেলার নিরাপত্তার তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সঙ্গে দেয়া হয়েছে মাত্র দশজন সশস্ত্র অশ্বারোহী । উষ্ট্ৰচালকরা সকলে নিরস্ত্র । রাত যাপনের জন্য এখানে অবতরণ করে ছাউনি ফেলেছে তারা।
খৃষ্টান বাহিনীর কমাণ্ডার তার কমাণ্ডোদেরকে একটি নিম্ন এলাকায় বসিয়ে রাখে। কমাণ্ডার কাফেলায় কটি উট, কটি ঘোড়া, কজন সশস্ত্র মানুষ এবং আক্রমণ করলে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার তথ্য নেয়ার জন্য দু ব্যক্তিকে প্রেরণ করে। তারপর তারা রাতে আক্রমণ পরিচালনার স্কীম প্রস্তুত করতে বসে যায়। তাদের না আছে অস্ত্রের অভাব, না আছে আগ্রহ-শৃহার কমতি। যে কেউ নিজের জীবন নিয়ে খেলতে প্রস্তুত।
তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া লোক দুটো ফিরে আসে মধ্য রাতের অনেক আগেই। এসে তারা জানায়, কাফেলায় সশস্ত্র আরোহী আছে দশজন। তারা এক স্থানে একত্রে ঘুমিয়ে আছে। ঘোড়াগুলো বাধা আছে অন্যত্র। উষ্ট্ৰচালকরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে শুয়ে আছে নানা জায়গায়। মাল-পত্র বেশীর ভাগ বস্তায় ভরা। উষ্ট্ৰচালকদের নিকট কোন অস্ত্র নেই। আক্রমণ করে সফল হওয়া তেমন কঠিন হবে না।
কাফেলার লোকেরা গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসে খৃষ্টান কমাণ্ডো। চলে আসে একেবারে নিকটে। আগে আক্রমণ হয় ঘুমন্ত সৈনিকদের উপর। টের পেয়ে চোখ খুলতে না খুলতে পলকের মধ্যে অনেকগুলো তরবারী ও খঞ্জরের উপর্যুপরী আঘাতে লাশ হয়ে যায় সব কজন।
খৃষ্টান গেরিলারা তাদের এ অভিযান এত নীরবে সম্পন্ন করে ফেলে যে, অন্যত্র ঘুমিয়ে থাকা উষ্ট্ৰচালকরা টেরই পেলো না। চোখও খুললো না একজনেরও। যাদের চোখ খুললল, কী হচ্ছে বুঝে উঠতে পারলো না তারা। যার মুখে শব্দ বের হলো, তার সে শব্দ-ই জীবনের শেষ উচ্চারণ বলে প্রমাণিত হলো।
এবার, উষ্ট্ৰচালকদের সন্ত্রস্ত করার জন্য চীঙ্কার জুড়ে দেয় কমান্ডোরা। তারা জেগে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ধড়মড় করে উঠে বসে বিহ্বল নেত্রে এদিক-ওদিকে তাকাতে শুরু করে। চেঁচামেচি করে ওঠে উটগুলো। এবার উষ্ট্ৰচালকদের কচুকাটা করতে শুরু করে খৃষ্টান কমান্তোরা। পালিয়ে যায় অল্প কজন। বাকীরা নির্মম গণহত্যার শিকার হয় খৃষ্টান কমাণ্ডোদের হাতে। খৃষ্টান কমাণ্ডার চীৎকার করে বলে–এগুলো মুসলমানদের রসদ, ধ্বংস করে দাও সব। উটগুলোকেও মেরে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে তরবারীর আঘাত শুরু হয়ে যায় উটগুলোর পিঠে। পশুগুলোর করুণ চীৎকারে ভারী হয়ে উঠে নিঝুম রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশ। ঘোড়াগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ায় কমাণ্ডার। গুণে দেখে বারটি। দশটি আরোহণের যোগ্য হলেও অবশিষ্ট দুটি কাজের নয়। নয়টি উট আগেই সরিয়ে রেখেছিলো সে।
রাত শেষে ভোর হলো। পূর্ব আকাশে সূর্য উদিত হলো। এক বীভৎস ভয়ানক রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলো ছাউনি। অসংখ্য লাশ ছড়িয়ে আছে এদিক-সেদিক। মারা গেছে অনেক উট। কোনটি এখনো ছটফট করছে। এদিক-সেদিক পালিয়ে গেছে কিছু। সবদিকে রক্ত আর রক্ত, যেন রাতে রক্তের বৃষ্টি হয়েছিলো এ স্থানটিতে। খুলে ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়েছে রসদের বস্তাগুলো। তছনছ হয়ে গেছে সব খাদ্যদ্রব্য। রক্তের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে সব। একজন জীবিত মানুষও নেই এখানে। বারটি ঘোড়াও উধাও। যে উদ্দেশ্যে খৃষ্টানদের এ অভিযান, এক প্রলয়কাণ্ড ঘটিয়ে সে উদ্দেশ্য সাধন করে কেটে পড়েছে তারা। এবার তীব্রগতিতে শিকারের সন্ধানে এগিয়ে যেতে পারবে খৃষ্টান কমান্তোরা।
***
মুবীর রূপ-যৌবন আর মদ-মাদকতায় বালিয়ানের মন-মেজাজ এমনিতেই বিগড়ে আছে। মুবী আর মদ, মদ আর মুবী এ-ই তার একমাত্র ভাবনা। তদুপরি এখন তার হাতে এসেছে আরো সাতটি পরমাসুন্দরী যুবতী। মুবীর চেয়ে এরাও কোন অংশে কম নয়। বিপদাপদের কথা ভুলেই গেছে সে। মুবী তাকে বারবার বলছে, এতো বেশী থেমে থাকা ঠিক হচ্ছে না। যতো দ্রুত সম্ভব আমাদের সমুদ্রের নিকট পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করা প্রয়োজন। শত্রুরা আমাদের ধাওয়া। করবে না, তার নিশ্চয়তা কী?
কিন্তু বালিয়ান রাজার ন্যায় অট্টহাসির তোড়ে ভাসিয়ে দেয় মুবীর সতর্কবাণী। মুবী যে রাতে বালিয়ানকে দিয়ে মেয়েদের উদ্ধার করিয়েছিলো, তার পরের রাতে এক স্থানে ছাউনি ফেলেছিলো বালিয়ান। সে রাতে সে মুবীকে বলেছিলো, আমরা সাতজন পুরুষ আর তোমরা সাতটি মেয়ে। আমার এ ছয়টি বন্ধু বড় বিশ্বস্ততার সাথে আমার সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে। তাদের উপস্থিতিতে তাদের চোখের সামনে আমি তোমার সঙ্গে রং-তামাশা করছি। তারপরও তারা কিছু বলছে না। এবার আমি তাদেরকে পুরস্কৃত করতে চাই । অপর ছয়টি মেয়ের এক একজনকে আমার এক এক বন্ধুর হাতে তুলে দাও আর তাদের বলো, এ তোমাদের ত্যাগের উপহার।
