পথে দুটি দুর্গ। একটির নাম মাম্বাজ, অপরটি বুযা। কোন কোন ইতিহাস গ্রন্থে মাম্বাজকে মাম্বাস উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুর্গ দুটির অধিপতিদ্বয় ছিলেন স্বাধীন মুসলমান। এরূপ আরো কয়েকটি দুর্গ ও জায়গীর ছিলো, যেগুলোতে মুসলমানদের কর্তৃত্ব ছিলো। এভাবেই সালতানাতে ইসলামিয়া দুর্গ, জায়গীর ও প্রদেশে বিভক্ত হয়েছিলো। সুলতান আইউবী এই বিক্ষিপ্ত পরমাণুগুলোকে একত্রিত করে একটি সাম্রাজ্য গঠন করে তাকে এক খেলাফতের অধীনে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই আমীর ও জায়গীরদারগণ নিজ নিজ স্বতন্ত্র মর্যাদা ও অবস্থান অটুট রাখতে চাইছেন। তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য খৃস্টানদের থেকে পর্যন্ত সাহায্য নিতে কুণ্ঠবোধ করছেন না।
সুলতান আইউবী বুয়ার আমীরের নামে একটি বার্তা লিখেন। আরেকটি লিখেন মাম্বাজের আমীরের নামে। বার্তা দিয়ে বুযায় ইযযুদ্দীনকে এবং মাম্বাজে সাইফুদ্দীনের উপদেষ্টা ফখরুদ্দীনকে প্রেরণ করেন। ফখরুদ্দীন সুলতান আইউবীর যুদ্ধবন্দি। কিন্তু তিনি সম্মান প্রদান করে তার মন জয় করে নিয়েছেন এবং ফখরুদ্দীনও তার আনুগত্য বরণ করে নিয়েছেন। সুলতান আইউবী যখন তাকে তার বিশেষ দূত বানিয়ে মাম্বাজ যেতে বললেন এবং তাকে মাম্বাজ দুর্গ জয় করার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার জন্য প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার প্রদান করলেন, তখন ফখরুদ্দীন হতবাক হয়ে বিস্ফারিত চোখে সুলতানের প্রতি তাকিয়ে থাকেন।
আপনি কি মুসলমান নন?- সুলতান আইউবী ফখরুদ্দীনকে বললেন আপনি আমার প্রতি এমন বিস্মিত চোখে তাকালেন, যেনো আমি একজন কাফেরকে আমার দূত ও প্রতিনিধি নিযুক্ত করে প্রেরণ করছি। আপনার কি আমার উপর ভরসা নেই, নাকি নিজের ঈমানের প্রতি আস্থা নেই? আমি মাম্বাজ দুর্গ দখল করতে চাই। আপনি তার অধিপতিকে আমার বার্তা পৌঁছিয়ে দেবেন এবং তার সম্মতি আদায় করবেন, যেন রক্তপাত ছাড়াই তিনি দুৰ্গটা আমাদের হাতে তুলে দেন এবং তার বাহিনীকে আমাদের বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে দেন।
ইযযুদ্দীন ও ফখরুদ্দীন রওনা হয়ে যান। বু্যর অধিপতি ইযযুদ্দীনকে সাদরে বরণ করে নেন এবং সুলতান আইউবীর বার্তা পাঠ করেন। তাতে লেখা ছিলো
আমার প্রিয় ভাই! আমরা এক আল্লাহ, এক রাসূল ও এক কুরআনের অনুসারী। কিন্তু আমরা এমনভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছি, যেমন একটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গ মরুভূমির বালির উপর বিক্ষিপ্ত পড়ে থাকে। এমন দেহ কি নড়াচড়া করতে পারে? কোনো কাজে আসে? এই সুযোগে খৃস্টানরা স্বার্থ হাসিল করছে। তারা আমাদের কর্তিত অঙ্গগুলোকে শকুনের ন্যায় ভক্ষণ করছে। আমাদেরকে এক জাতির আকারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যথায় আমরা কেউ-ই বেঁচে থাকতে পারবো না। আমি আপনাকে এক জাতির আকারে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনি আপনার বর্তমান পদপর্যাদার কথা ভাবুন। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য আপনি শত্রুর প্রতিও হাত প্রসারিত করে থাকেন। আমি আপনাকে কুরআন ও ইসলামের পয়গাম পৌঁছালাম। এই পয়গাম বুঝবার ও তদনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করুন। প্রথম আবশ্যক হলো, আপনার দুর্গটা সালতানাতে ইসলামিয়ার কর্তৃত্বে অর্পণ করুন এবং আপনি আমার আনুগত্য মেনে নিন। এই প্রস্তাব। মেনে নিলে আপনার বাহিনী আমার বাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে। আপনি দুর্গের অধিপতি থাকবেন এবং দুর্গের উপর সালতানাতে ইসলামিয়ার পতাকা উড্ডীন থাকবে। তবে যদি আমার এই প্রস্তাব গ্রহণ না করেন, তাহলে আমার ফৌজ আপনার দুর্গ অবরোধ করবে। আপনি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হোন। আমি আপনাকে হাল্ব, মসুল ও হাররানের সম্মিলিত বাহিনীর পরাজয় ও পিছপা হওয়ার ইতিহাস স্মরণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। তাতে আপনার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সহজ হবে। আপনি আমার সদাচরণের আশা রাখুন। আপনার সঙ্গে আমার কোন শত্রুতা নেই। আমি যা কিছু করছি, ইসলামের বিধান ও আল্লাহর আইন অনুসারেই করছি।
বুযার আমীর বার্তাটা পাঠ করে ইযযুদ্দীনের প্রতি তাকান। ইযযুদ্দীন বললেন- আপনার দুর্গ মজবুত নয়, আপনার সৈন্যও কম। এই ক্ষুদ্র বাহিনীকে আমাদের হাতে শেষ করে ফেলবেন না।
বুযার আমীর প্রস্তাব মেনে নেন এবং সুলতান আইউবী বরাবর পত্র লিখেন যে, আপনি আসুন এবং দুর্গ নিয়ে নিন।
মাম্বাজের আমীরও সুলতান আইউবীর আনুগত্য গ্রহণ করে নেন। ফখরুদ্দীন তার লিখিত বার্তা নিয়ে ফিরে যান।
সুলতান আইউবী স্বয়ং উভয় দুর্গে যান। সেখানে যেসব সৈন্য ছিলো, তাদেরকে দুর্গ থেকে বের করে নিজের বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে নেন এবং নিজ বাহিনীকে দুর্গে পাঠিয়ে দেন। তিনি উভয় দুর্গে রসদ ও অন্যান্য সরঞ্জাম জমা করেন। কিন্তু বাহিনীকে দুর্গে আবদ্ধ করে রাখেননি। হাবের সন্নিকটে এজাজ নামক একটি মজবুত দুর্গ ছিলো। এই দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হাবের হাতে ছিলো। তার অধিপতি ছিলেন হাবের আমীর আল মালিকুস সালিহর অফাদার। সুলতান আইউবী হাব অবরোধ করার আগে এই দুর্গটিও বিনা যুদ্ধে দখল করতে চাচ্ছিলেন। তিনি তার এক সালার আল-হিময়ারীকে লিখিত বার্তাসহ এজাজ রওনা করিয়ে দেন।
এজাজের আমীর সুলতান আইউবীর বার্তাটি পাঠ করে পত্রখানা আল হিময়ারীর দিকে নিক্ষেপ করে বললেন- তোমার সুলতান আল্লাহ ও রাসূলের নামে সারা পৃথিবীর রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তাকে বলবে, তুমি হাল্ব অবরোধ করে দেখেছো, এবার এজাজ অবরোধ করে দেখো।
