খৃস্টান লোকটি মেয়ে দুটোকে সঙ্গে নিয়ে সান্নানের শয়নকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। লোকটি খৃস্টানদের গোয়েন্দা ও নাশকতা বিভাগের অফিসার। মুসলিম এলাকায় ডিউটি পালন করে নিজ অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার পথে এখানে এসেছে। আসিয়াত দুর্গে খৃস্টানদের জন্য আলাদা বিশ্রামাগার ছিলো। খৃস্টানদের যখন যার ইচ্ছে সেখানে যেতে পারতো। থ্রেসাও এই সুযোগের সুবাদেই লিজা এবং আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের নিয়ে এখানে এসেছে। এই খৃস্টান লোকটিরও একই লক্ষ্যে এখানে আগমন। দু-একদিন পর তার সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার প্রোগ্রাম আছে। দুর্গে প্রবেশ করামাত্র কেউ একজন তাকে জানায়, দুটি খৃস্টান মেয়ে এসেছে, যারা এই মুহূর্তে শেখ সান্নানের কাছে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে দেখার জন্য সে ভেতরে চলে যায় এবং সান্নানের সঙ্গে উচ্চবাচ্যের পর মেয়ে দুটোকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।
খৃস্টান লোকটি মেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর শেখ সান্নান তার খাস লোকদের ডেকে বললো- এই খৃস্টান লোকটি এবং মেয়ে দুটো আমাদের কয়েদি নয়। তবে তাদেরকে আমার অনুমতি ছাড়া দুর্গ থেকে। বের হতে দেবে না। তাদের উপর নজর রাখবে। আর গোমস্তগীন যখন ইচ্ছা চার কয়েদিকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে।
খৃস্টান লোকটিকে জানানো হলো, হাররানের গভর্নর গোমস্তগীনও এসেছেন এবং তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে ফিরছেন। তাকে আন-নাসের এবং তার সঙ্গীদের বিষয়টিও অবহিত করা হলো।
লোকটি থ্রেসা ও লিজাকে খৃস্টানদের জন্য নির্ধারিত খাস বিশ্রামাগারে নিয়ে যায়।
***
মুজাফফর উদ্দীনকে পরাজিত করে সুলতান আইউবী যাদেরকে পাকড়াও করেছেন, তাদের একজন হলেন সাইফুদ্দীনের উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন, যিনি মসুলে সাইফুদ্দীনের মন্ত্রীও ছিলেন।
সুলতান আইউবী ফখরুদ্দীনকে যুদ্ধবন্দিদের থেকে আলাদা করে নিজের তাবুতে নিয়ে যান এবং যথাযোগ্য সম্মানের সাথে রাখেন। গনীমতের সম্পদ বণ্টন করে সুলতান আইউবী সর্বপ্রথম সিদ্ধান্ত এই গ্রহণ করেন যে, তিনি পলায়নপর শত্রুদের ধাওয়া করবেন না। কোন কোন ঐতিহাসিক আইউবীর এই সিদ্ধান্তকে তার সামরিক পদস্খলন বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসের এই মর্দে মুজাহিদ বহু দূরের চিন্তা করতেন। এটা বাস্তব যে, তিনি যদি শত্রুসেনাদের ধাওয়া করতেন, তাহলে তাঁর বাহিনী চিরতরে নিঃশেষ হয়ে যেতো, যার ফলে দুশমন মোড় ঘুরিয়ে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো।
পরাজিত দুশমনকে ধাওয়া না করার একটি কারণ এই ছিলো যে, মুজাফফর উদ্দীনের সঙ্গে তিনি যে যুদ্ধ লড়েছেন, তাতে বিজয় অর্জন করতে তাঁকে চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। তাঁর ফৌজের ব্যাপক জীবনহানি ঘটেছে। আহতদের সংখ্যাও ছিলো বিপুল। সে কারণে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া তার পক্ষে সম্ভবও ছিলো না। অগ্রযাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তিনি তার রিজার্ভ বাহিনীকে ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ। করেননি। একটি কারণ এও ছিলো যে, মুসলমানের হাতে মুসলমানের আরো অধিক রক্ত ঝরুক, তা তাঁর কাম্য ছিলো না। তিনি আপন জাতিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রক্তপাত থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন।
এই মুহূর্তে সুলতান আইউবী সেই স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে সাইফুদ্দীনের ব্যক্তিগত তবু ছিলো। সাইফুদ্দীনের তাঁবুটা ছিলো খুবই মূল্যবান। রেশমী কাপড়ের মহল। পর্দা ও শামিয়ানা ছিলো রেশমী। ভেতরে দাঁড়িয়ে শীশ মহলের কল্পনা করা যেতো। সাইফুদ্দীনের এক ভাতিজা ইযযুদ্দীন ফররুখ শাহ সুলতান আইউবীর ফৌজে সালার ছিলেন। বিস্ময়কর যুদ্ধের বিস্ময়কর এক দৃশ্য- ভাতিজা চাচার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তিনি ব্যতীত আরো কয়েকজন সৈনিক ছিলো, যারা তাদের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলো। সুলতান আইউবী সাইফুদ্দিনের এই তাঁবু পরিদর্শন করে তার ভাতিজা ইযযুদ্দীনকে কাছে ডেকে মুচকি হেসে বললেন- তোমার চাচার সম্পত্তির ওয়ারিশ তুমি। তার তাঁবুটা আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম। এই সম্পদ তুমি বুঝে নাও।
সুলতান আইউবী তো হাসিমুখে এই নজরানা পেশ করেছিলেন। কিন্তু ইযুদ্দীনের চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে আসে। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার রোজনামায় অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় এই কাহিনী উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্যমতে, সুলতান আইউবী ইযযুদ্দীনের চোখে অশ্রু দেখে বললেন ইযযুদ্দীন! আমি তোমরা জযবা ভালো করেই বুঝি। কিন্তু আমার নীতি হলো, আমার পুত্রও যদি জিহাদের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে, আমার তরবারী তাকেও রেহাই দেবে না। এটা ইসলামেরই শিক্ষা। পরাজিত চাচার তাঁবু দেখে তোমার চোখে অশ্রু নেমে এসেছে। কিন্তু আমি আমার ইসলাম ও জিহাদ বিরোধী পুত্রের কর্তিত মাথা দেখেও অশ্রু ঝরাবো না।
সুলতান আইউবী উক্ত এলাকা থেকে সামান্য সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে ছাউনী ফেলেন। অঞ্চলটা পাহাড়ি। তার নাম সুলতান পর্বত। ইতিহাসে জায়গাটাকে এ নামেই অভিহিত করা হয়েছে। সেখান থেকে হাবের দূরত্ব পনের মাইল। আল-মালিকুস সালিহর রাজধানী ও আবাসভূমি এই শহরটি এখন যৌথ বাহিনীর হেডকোয়ার্টার। পূর্বে উল্লেখ করেছি, এই শহরটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতো শক্ত এবং এখানকার মানুষ (যারা সকলে মুসলমান) এতো সাহসী ও যুদ্ধবাজ ছিলো যে, সুলতান আইউবীর অবরোধ ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিলো। এখন তিনি পুনরায় এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি অবরোধ করে দখল করতে চাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি নিজের অবস্থান মজবুত করে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন।
