গোমস্তগীন হাররান নামক একটি দুর্গের অধিপতি। নুরুদ্দীন জঙ্গীর ওফাতের পর স্বাধীনতা ঘোষণা করে তিনি হাররান দুর্গ ও তৎপার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ছিলেন সুলতান আইউবীর মুসলমান শত্রুদের সমন্বয়কারী ব্যক্তি। তিনিও নিজের বাহিনীকে সেই সম্মিলিত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যাকে সুলতান আইউবী পরাজিত করেছেন। গোমস্তগীন নিজে বাহিনীর সঙ্গে যাননি। তিন বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন সাইফুদ্দীন। জোটের শরীক বাহিনীগুলোর ন্যায় গোমস্তগীনও খৃস্টানদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। খৃস্টানরা তাদেরকে সৈন্য দিয়ে এখনো সাহায্য করেনি। তবে উপদেষ্টা, গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসী দিয়ে রেখেছে এবং তাদেরকে নিজেদের কজায় রাখার জন্য উন্নত মদ, সুন্দরী নারী ও অর্থ সরবরাহ করছে।
গোমস্তগীনের পেটভরা কুটিল বুদ্ধি। ষড়যন্ত্র পাকানোর ওস্তাদ লোকটি। দুশমনের উপর মাটির নীচ থেকে আক্রমণ করা এবং আপনদের বিরুদ্ধে মনে মনে শত্রুতা পোষণ করা ছিলো তার নীতি। ভালবাসা-বন্ধুত্ব ছিলো তার শুধুই ক্ষমতার জন্য। রাজ্যের স্বাধীন সম্রাট হয়ে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। যারা সরল বন্ধুত্বে তাকে অকাতর সাহায্য করতো, তাদের প্রতিও তিনি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতেন।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যা মিশনে বেশ আগ্রহ-আন্তরিকতা ছিলো তার। তার ভালোভাবেই জানা ছিলো, ক্ষমতালোভী শাসকের সিংহাসন কেবল সামরিক শক্তিই উল্টাতে পারে। সুলতান আইউবীই একমাত্র সালার, যার হৃদয়সমুদ্রে জাতীয় চেতনা তরঙ্গায়িত ছিলো। সমর যোগ্যতার পাশাপাশি ঈমান ছিলো তাঁর বিশেষ এক শক্তি। গোমস্তগীন তার এই শক্তিটাকেই বেশি ভয় করতেন। এবার নিজের বাহিনীকে সাইফুদ্দীনের কমান্ডে দিয়ে তুকমান রওনা করিয়ে কাউকে না জানিয়ে তিনি শেখ সান্নানের নিকট আসিয়াত দুর্গে এসে পৌঁছেন। উদ্দেশ্য, সুলতান আইউবীকে হত্যা করার এমন একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, যা পূর্বেকার পরিকল্পনাগুলোর ন্যায় ব্যর্থ হবে না।
আসিয়াত দুর্গে তিনি আন-নাসের ও থ্রেসা-লিজার আগমণের একদিন আগে পৌঁছে যান। সাইফুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তার বাহিনীর সুলতান আইউবীর হতে কী পরিণতি ঘটেছে, এখনো তিনি জানেন না। বাহিনীকে রওনা করিয়েই তিনি আইউবী হত্যার ষড়যন্ত্র মিশন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং আসিয়াত এসে পৌঁছান।
***
গোমস্তগীন ভাই!- শেখ সান্নান বললো- তোমার বন্ধু তো তুর্কমান থেকে পালিয়ে গেছে। তারপর থ্রেসার প্রতি তাকিয়ে বললো- তুমি একে যুদ্ধের বিস্তারিত শোনাও।
পরাজয়ের সংবাদে গোমস্তগীন অকস্মাৎ এতোই ব্যথিত হয়ে পড়েন যে, বেশ সময় পর্যন্ত তার মুখ থেকে কথা বের হলো না। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তিনি ব্যথিত ও বিস্মিত চোখে থ্রেসার প্রতি তাকিয়ে থাকেন। সুলতান আইউবী স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা সম্মিলিত বাহিনীর উপর কীভাবে আক্রমণ করেছেন এবং কীভাবে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছেন, থ্রেসা গোমস্তগীনকে তার বিবরণ প্রদান করে। থ্রেসা সাইফুদ্দীন সম্পর্কে জানায়। আমি তার ওখান থেকে রওনা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি রণাঙ্গন থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
গোমস্তগীন চুপচাপ থ্রেসার বক্তব্য শুনতে থাকেন। আমাকে আমার বন্ধুরা অপদস্ত করেছে- গোমস্তগীন ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন- আমি সাইফুদ্দীনকে তিন বাহিনীর কমান্ড প্রদানের পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু কেউই আমার কথা শুনলো না। জানি না, আমার বাহিনী কী অবস্থায় আছে!
খুবই খারাপ অবস্থায়- থ্রেসা বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর গেরিলারা আপনার বাহিনীকে শান্তিতে ও নিরাপদে পিছপাও হতে দেয়নি।
সান্নান ভাই! তুমি জানো, আমি এখানে কেন এসেছি। গোমস্তগীন বললেন।
জানি তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যার মিশন নিয়ে এসেছে। সান্নান বললো।
হ্যাঁ- গোমস্তগীন বললেন- যা চাইবে, দেবো। আইউবীকে খুন করাও।
আমি আমাদের খৃস্টান মিত্র এবং সাইফুদ্দীনের পরিকল্পনা মোতাবেক আইউবীকে খুন করার লক্ষ্যে চারজন ঘাতক প্রেরণ করে রেখেছি- সান্নান বললো- কিন্তু তারা আইউবীকে খুন করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।
আমার থেকে আলাদা পুরস্কার নিও- গোমস্তগীন বললেন- আমাকে নতুন লোক দাও। এদেরকে আমাকে দিয়ে দাও। কাজটা আমি নিজে করবো।
ওরা সর্বশেষ চার ফেদায়ী, যাদেরকে আমি প্রেরণ করেছি- শেখ সান্নান বললো- আমার কাছে ঘাতকের অভাব নেই। কিন্তু আমি সালাহুদ্দীন হত্যার মিশন থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছি।
কেনো? গোমস্তগীন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন- আইউবী আপনাকে কোন দুর্গ-টুর্গ দিয়ে দিয়েছে নাকি?
না- সান্নান বললো- লোকটাকে খুন করাতে আমি আমার বহু মূল্যবান ফেদায়ী নষ্ট করে ফেলেছি। আমার লোকেরা তার উপর ঘুমন্ত অবস্থায় খঞ্জর দ্বারা আক্রমণ করেছে। একবার তার গায়ে তীরও ছেঁড়া হয়েছিলো। তাও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। আমি যা বুঝেছি, তাহলো, আইউবীর উপর খোদার হাত আছে। তার মধ্যে এমন কোন শক্তি আছে, যার ফলে তার উপর না খঞ্জর ক্রিয়া করে, না তীর-বর্শা। আমার গুপ্তচররা আমাকে বলেছে, আইউবীর উপর যখন সংহারী আক্রমণ হয়, তখন তিনি ভীত কিংবা ক্ষুব্ধ হওয়ার পরিবর্তে মুচকি হাসেন এবং মুহূর্ত মধ্যে ভুলে যান একটু আগে কী ঘটেছিলো।
