না থ্রেসা!- লিজা আপুত কণ্ঠে বললো- তার প্রতি আমার সেই আকর্ষণ নেই, যা তুমি মনে করছো।
তাহলে তার পাশে গিয়ে বসেছিলে কেন?
বলতে পারবো না- লিজা বলুলো- জানি না কী ভেবে তার পাশে গিয়ে বসেছিলাম।
তার সঙ্গে তোমার কী কী কথা হয়েছে? থ্রেসা জিজ্ঞেস করে।
বিশেষ কোন কথা হয়নি। লিজা বললো।
তুমি দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করছো- গ্লেসা বললো- এটি বিশ্বাসঘাতকতা, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
কিন্তু শুনে রাখো থেসা!– লিজা বললো- আমি ঐ বুড়োটার কাছে একা যাবে না। তিনি যদি জবরদস্তি করেন, তাহলে হয় তাকে নয়তো নিজেকে শেষ করে ফেলবো।
রূপসী কন্যা থেসা তো নিজেকে পাথর বানিয়ে নিয়েছে, যার রং ও চাকচিক্য যে কারো হৃদয়কে আকর্ষণ করে থাকে এবং যে কেউ তার মালিক হতে চায়। পাথরের নিজস্ব কোন পছন্দ-অপছন্দ থাকে না। লিজাও সেই অবস্থান থেকে বহু দূরে সরে এসেছে। সেখানে একজন নারীর আত্মচেতনা, ভালোবাসা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ বলতে কিছুই থাকে না।
থ্রেসা তাকে বললো- আমার বিলকুল ধারণা ছিলো না, তুমি এতো বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে। অন্যথায় আমরা এখানে আসতাম না। কিন্তু এটি ছাড়া কাছাকাছি আর কোনো কেল্লা ছিলো না। ত্রিপোলী পর্যন্ত পৌঁছা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আমি তোমাকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, শেখ সান্নান থেকে তোমাকে রক্ষা করার পুরোপুরি চেষ্টা করবো এবং এখান থেকে তাড়াতাড়ি বিদায় নেয়ার পন্থা বের করে নেবো। তুমি আবেগ ত্যাগ করো। আমি আমার ওয়াদা রক্ষা করবো।
আমি এই মুসলিম কমান্ডোদেরকে এখান থেকে আমাদের পলায়নের কাজে ব্যবহার করতে চাই- লিজা বললো- তুমি না নিজে এখান থেকে বের হতে পারবে, আমাকে বের করতে পারবে। এরা গেরিলা সৈনিক। আমি এদের বীরত্বের কাহিনী শুনেছি। সামান্য সুযোগ বের করে দিলেই তারা পালিয়ে যাবে এবং আমাকে ও তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। এছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই।
আমি তাদের পারঙ্গমতা ও বীরত্ব স্বীকার করি- থ্রেসা বললো- কিন্তু আমরা যদি তাদের সহযোগিতায় পলায়ন করি, তাহলে তারা আমাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে আমাদেরকে গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেবে না। তুমি শক্রর সহায়তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকো। গোসল করে পোশাক বদল করে আসো। শেখ সান্নান আজ রাতের আহারে আমাদেরকে নিমন্ত্রণ করেছেন। তার সঙ্গে কীরূপ আচরণ করবে, আমি তোমাকে বলে দেবো। প্রকাশ করতে হবে, তুমি তাকে অপছন্দ করো না এবং তার থেকে পলায়নেরও কোন চেষ্টা করছে না। আমি এইমাত্র জানতে পেরেছি, হাররানের স্বাধীন শাসক গোমস্তগীনও এসেছেন। তুমি হয়তো জানো না, গোমস্তাগীন সালাহুদ্দীন আইউবীর সবচেয়ে বড় শত্রু। তুমি তাকে বন্ধুরূপে বরণ করে নেবে। আমি বহু কষ্টে এই মুসলিম শাসকদের হাতে এনেছি এবং তাদেরকে সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাচ্ছি।
***
লিজার চলে যাওয়ার পর আন-নাসের গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। এখন সে নিশ্চিত, মেয়ে দুটো পরী নয়। কিন্তু তার প্রতি লিজার দয়াপরবশ হওয়া তাকে অস্থির করে তুলেছে। মেয়েটি বলেছিলো, তাকে এবং তার সঙ্গীদেরকে হাশিশের নেশায় আচ্ছন্ন করে এ পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছে। তাতেই সে বুঝে ফেলেছে, এই মেয়েগুলো ফেদায়ী চক্রের সদস্য। তার মনে আরো সংশয় জাগে, হাশিশ ছাড়াও রূপসী যুবতীর দ্বারা তাকে হাত করা এবং আপন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা চলছে। আন-নাসের গেরিলা সৈনিক। কর্তব্য পালনে দুশমনের এলাকায় যেতে হবে বিধায় তাকে ফেদায়ী চক্র এবং তাদের রীতি-নীতি এবং হাশিশের ক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত করা হয়েছিলো।
আন-নাসের তার সঙ্গীদের জাগিয়ে তোলে। জাগ্রত হয়ে তারাও তাদের কমান্ডারের ন্যায় অস্থির হয়ে ওঠে। তারা আন-নাসেরের মুখপানে তাকিয়ে থাকে।
বন্ধুগণ!- আন-নাসের বললো- আমরা ফেদায়ীদের ফাঁদে এসে পড়েছি। এই দুর্গের নাম আসিয়াত। এটি ফেদায়ী ও তাদের ফৌজের আস্তানা। এই মেয়েগুলো জিন-পরী নয়। তারা আমাদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করবে, আমি এখনই বলতে পারবো না। আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। ফেদায়ীরা কী কী পন্থা অবলম্বন করে থাকে, তোমাদের জানা আছে। আমি যদি এই কক্ষ থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাই, তাহলে দুর্গ থেকে পালাবার কৌশল ভেবে দেখবো। তোমরা চুপচাপ থাকবে। এরা কিছু জিজ্ঞেস করলে সংক্ষেপে উত্তর দেবে। এই শয়তানদের থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হবে না।
এরা কি আমাদেরকে কয়েদখানায় আটকে রাখবে? আন-নাসেরের এক সঙ্গী জিজ্ঞেস করে।
কারাগারে নিক্ষেপ করলে তো ভালোই হতো- আন-নাসের জবাব দেয়- কিন্তু এরা হাশিশ আর নারী দ্বারা আমাদের মন-মস্তিষ্ক এমনভাবে বদলে দেবে, আমাদের স্মরণই থাকবে না, আমরা কারা ছিলাম এবং আমাদের ধর্ম কী ছিলো।
পলায়ন ছাড়া মুক্তির আর কোনো উপায় আমার চোখে পড়ছে না। আন-নাসেরের এক সঙ্গী বললো।
আমরা মৃত্যুকে বরণ করে নেবো; তবু ঈমান বিনষ্ট হতে দেবো না। অপর একজন বললো।
তোমরা সাবধান থাকবে- আন-নাসের বললো- আমরা অতো তাড়াতাড়ি তাদের কজায় যাবো না।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এক ব্যক্তি এসে কক্ষে দুটি প্রদীপ রেখে যায়। লোকটি কোনো কথা বললো না। আসলে আর বাতিগুলো রেখে চলে গেলো। ক্ষুধার জ্বালায় তাদের পেট চোঁ চোঁ করছে। তাদের কক্ষ থেকে বেশ দূরে কেল্লার এক কোণে সান্নানের মহল। সেখানে নারী আর মদের জমজমাট আসর চলছে। সান্নানের খাস কামরায় রকমারী সুস্বাদু খাবার সাজিয়ে রাখা আছে। আছে মদের পিপা-পেয়ালাও। খাবারের গন্ধে মৌ মৌ করছে চারদিক। শেখ সান্নান দস্তরখানে উপবিষ্ট। তার এক পাশে প্রেসা, অপর পাশে লিজা বসে আছে। সম্মুখে গোমস্তগীন বসে আহার করছেন।
