পারিশ্রমিক কতো লাগবে বলো- গোমস্তগীন গর্জে ওঠে বললেন- আমি আইউবীকে জীবিত দেখতে চাই না। তুমি আনাড়ি ঘাতক প্রেরণ করেছে।
তারা সবাই ঘাঘু ছিলো- শেখ সান্নান বললো- তাদের হাত থেকে কখনো কেউ বাঁচতে পারেনি। তারা মৃত্যুকে ভয় করার মতো মানুষ ছিলো না। আমার কাছে তাদের চেয়েও দক্ষ ওস্তাদ আছে। তারা এমনভাবে খুন করে, পরে হত্যাকাণ্ডের কোন ক্রু খুঁজে বের করা যায় না। কিন্তু গোমস্তগীন! আমি আমার এই মূল্যবান লোকগুলোকে এভাবে নষ্ট করবো না। তোমরা তিনটি বাহিনী একত্রিত হয়ে আইউবীকে পরাজিত করতে পারলো না। আমার তিন-চারজন লোক কীভাবে তাকে খুন করবে?
তুমি আইউবীকে হত্যা করতে ভয় পেয়ে গেছো- গোমস্তগীন বললেন- এর কারণ অন্যকিছু হবে।
আরো একটি কারণ হলো- সান্নান বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। হাসান ইবনে সাব্বাই পয়গম্বর হতে চেয়েছিলো। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমার বাহিনীটি পেশাদার ঘাতক হয়ে গেছে। আমিও পেশাদার ঘাতক গোমস্তগীন আইউবী যদি তোমাকেও খুন করার জন্য আমাকে পারিশ্রমিক দেয়, তোমাকে হত্যা করাতেও আমি দ্বিধা করবো না।
সালাহুদ্দীন আইউবী কাপুরুষের ন্যায় কাউকে হত্যা করান না- লিজা বললো- এ কারণেই বোধ হয় তিনি কাপুরুষদের হাতে খুন হন না।
উহ!- সান্নান লিজাকে বাহুতে চেপে ধরে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললো তুমি এ বয়সেই জেনে ফেলেছে, যারা কাপুরুষ নয়, কাপুরুষরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না! সে গোমস্তগীনকে উদ্দেশ করে বললো সাইফুদ্দীন, আল-মালিকুস সালিহ এবং খৃস্টানরা শুধু এই জন্য একে অপরের বন্ধু হয়েছে যে, তারা সকলে সালাহুদ্দীন আইউবীর শত্রু। অন্যথায় তোমাদের মাঝে কোন বন্ধুত্ব নেই। তুমি বলো, আইউবীকে হত্যা করে তোমরা কী অর্জন করতে পারবে? তিনি মৃত্যুবরণ করলে তোমরা আপসে লড়াই করবে। মন দিয়ে শোন গোমস্তগীন! আইউবীর নিহত হওয়ার পর সাম্রাজ্যের এক বিঘত ভূমিও তোমার কপালে জুটবে না। তার ভাই ও সালারগণ ঐক্যবদ্ধ। তোমার যদি কাউকে খুন করাতেই হয়, সাইফুদ্দীনকে করাও এবং তাকে তুমি নিজেই হত্যা করতে পারবে। সে তোমাকে নিজের বন্ধু ও সহযোগী মনে করে। তুমি তাকে বিষ খাওয়াতে পারো, তার উপর হামলা করাতে পারো।
গোমস্তগীন গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান। ক্ষণকাল নীরব থেকে পরে বললেন হ্যাঁ, সাইফুদ্দীনকে খুন করিয়ে দাও। বলো, তোমাকে কী দিতে হবে?
হাররানের দুর্গ। শেখ সান্নান বললো।
তোমার মাথা ঠিক আছে সান্নান?- গোমস্তগীন বললেন- সোনাদানা অর্থকড়ির কথা বলো।
সোনাদানা নয়। আমি বরং তোমাকে চারজন লোক দেবো- শেখ সান্নান বললো- তারা আমার ফেদায়ী নয়, আইউবীর কমান্ডো। এই মেয়ে দুটো তাদেরকে হাশীশের নেশায় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আমি তাদেরকে কারো কাছে হস্তান্তর করতে চাই না। এমন অভিজ্ঞ লোক পাওয়া যায় না। ভাগ্যক্রমে আমি পেয়ে গেছি। হাশীশ আর আমার পরীরা তাদেরকে আপন রঙে রঙিন করে এমন ঘাতকে পরিণত করবে যে, তারা তাদের পিতা-মাতাকেও খুন করতে দ্বিধা করবে না। আমি তোমাকে নিরাশ করতে চাই না। তুমি এদেরকে নিয়ে যাও। এদেরকে তোমার জান্নাত দেখিয়ে দাও। তোমার হেরেমের রাজপুত্র বানাও। অজান্তে হাশীশ পান করাও। মদপানের অভ্যাস গড়ে তোেল। তারপর তারা তোমার ইশারায় নাচবে, উঠ-বস করবে।
সালাহুদ্দীন আইউবীর গেরিলারা অতো কঁচা নয়, যতটা তুমি মনে করছো। গোমস্তগীন বললেন।
তুমি তো জানো গোমস্তগীন!- সান্নান বললো- আমরা ফেদায়ী। আমরা মানুষের মন-মস্তিষ্ক ও চিন্তা-চেতনা নিয়ে খেলা করে থাকি। আমরা আমাদের শিকারের মস্তিষ্কে চিত্তাকর্ষক কল্পনা ঢুকিয়ে দিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করি যে, তারা কল্পনাকে বাস্তব ভাবতে শুরু করে। কোন মানুষের মাথায় নারীর সুদর্শন কল্পনা সৃষ্টি করে দাও, সেই সঙ্গে নেশাও পান করাও, দেখবে সে কল্পনার গোলাম হয়ে যাবে। মানুষকে নারীর কল্পনায় হারিয়ে থাকায় অভ্যস্ত করে তোল, তুমি তার ঈমান ও চরিত্র সামান্য মূল্যে ক্রয় করতে পারবে। তুমি এই চার ব্যক্তিকে নিয়ে যাও। এ কথা ভেবো না, তুমি এদেরকে নিজ কাজে ব্যবহার করতে পারবে না।
সান্নান মুচকি হেসে বললো- তুমি নিজের প্রতিই তাকিয়ে দেখো, নারী, মদ আর বিলাসপ্রিয়তা তোমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছে। মুসলমান হয়ে তুমি মুসলমানের শত্রু হয়ে গেছে।
শেখ সান্নান গোমস্তগীনকে তার মূল্য জানায়। চুক্তি সম্পাদিত হয়, গোমস্তগীন আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের হাররান নিয়ে যাবেন। সান্নান গোমস্তগীনকে পরামর্শ দেয়, এদেরকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ না করে রাজপুত্র বানিয়ে রাখবে। গোমস্তগীন দুদিনের মধ্যে সুলতান আইউবীর কমান্ডোদের নিয়ে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে উঠে যান।
***
গোমস্তগীন কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলে শেখ সান্নানের এক লোক কক্ষে প্রবেশ করে। সে জিজ্ঞাসা করে, আজ যে চার ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে নিদের্শ কী?
হাররানের গভর্নর গোমস্তগীন এসেছেন- সান্নান বললো- তিনি তাদেরকে নিয়ে যাবেন। তাদের খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করো। আমি তাদেরকে রাখতে চাই না। তবে বিষয়টা তাদের বলবে না।
