এদিকে আসো- শেখ সান্নান বড় মেয়েটি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে ছোট মেয়েটিকে কাছে ডেকে বললো- তুমি প্রয়োজন অপেক্ষা বেশি রূপসী। তুমি আমার কাছে এসে বসো। শেখ সান্নান মেয়েটির বাহু ধরে টেনে এনে নিজের গা-ঘেঁষে বসায় এবং তার মাথায় হাত দিয়ে আঙ্গুল দ্বারা চুলে বিলি কাটতে শুরু করে। বললো- তুমি অনেক ক্লান্ত। আজ আমার কাছে বিশ্রাম করবে।
মেয়েটি শেখ সান্নানকে এই প্রথমবারের মতো দেখলো। সে লোকটাকে ঘুরে-ফিরে দেখতে থাকে। একবার তার প্রতি, আবার তার সঙ্গী মেয়েটির প্রতি তাকাতে থাকে। মুখে তার বিরক্তির ছাপ। যেনো বৃদ্ধের এই আচরণ তার ভালো লাগছে না। মেয়েটি লাফ দিয়ে বৃদ্ধের নিকট থেকে সরে যায়। শেখ সান্নান আবারো মেয়েটির বাহু ধরে টেনে কাছে নিয়ে আসে, যেনো সরে গিয়ে সে তাকে অপমান করেছে। সে বড় মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বললো মেয়েটিকে বোধ হয় আমাদের রীতি শিক্ষা দেয়া হয়নি। আমাদের অপমান করা কতো বড় অপরাধ!
আমি আপনার দাসী নই- ছোট মেয়েটি উত্তেজিত কণ্ঠে বললো- এটা আমার কর্তব্য নয় যে, কেউ আমাকে নিয়ে টানা-হেঁছড়া করতে চাইলেই আমি নিজেকে সপে দেবো। মেয়েটির উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো- আমি ক্রুশের গোলাম, আমি হাশিশীদের কেনা দাসী নয়।
বড় মেয়েটি তাকে ধমক দিয়ে চুপ হতে বললো। কিন্তু মেয়েটি চুপ হলো না। বলতে লাগলো- এই লোকটি আমাকে মুসলমানদের হেরেমে দেখেনি। আমি দায়িত্ব পালনে কোন ত্রুটি করিনি। আমি তোমার সঙ্গে থেকে সাইফুদ্দীন ও তার পরামর্শকদের বিবেক-বুদ্ধির উপর পর্দা ঝুলিয়ে রেখেছি। তাই বলে এটা আমার দায়িত্ব নয় যে, আমি এই বুড়োর সাথে রাত কাটাবো।
তুমি যদি এতো রূপসী না হতে, তাহলে আমি তোমার এই গোস্তাখি ক্ষমা করতাম না- শেখ সান্নান বললো এবং বড় মেয়েটিকে উপদেশের ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলো- একে নিয়ে গিয়ে আসিয়াত দুর্গের আদব কায়দা শিখিয়ে দাও।
বড় মেয়েটি ছোট মেয়েটিকে বাইরে বের করে রেখে পুনরায় কক্ষে প্রবেশ করে শেখ সান্নানকে বললো- আপনার অসন্তুষ্টি যথার্থ। কিন্তু আমরা বসদের অনুমতি ব্যতীত যে কারো আদেশ পালন করতে পারি না। আমি যেহেতু আপনাকে জানি এবং এই দুর্গে আগেও এসেছি, সেজন্য আপনার কাজে আসতে পারে এমন চার ব্যক্তিকে নিয়ে এসেছি। আপনাকে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। মেয়েটি শেখ সান্নানকে আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে।
আমি এদের দ্বারা পূর্ণ কাজ আদায় করবো- শেখ সান্নান বললো- কিন্তু ঐ মেয়েটাকে আমি অবশ্যই আমার কক্ষে রাখবো।
এ বিষয়টা আপনি আমার উপর ছেড়ে দিন- বড় মেয়েটি বললো- ওতে আর পালাতে পারবে না। আমি তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আপনার কাছে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করবো।
***
শেখ সান্নানের দুজন সহযোগী আন-নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। লোকগুলো নেশা অবস্থায় ছিলো বটে; কিন্তু সারাটা রাত পায়ে হেঁটে এখানে এসে পৌঁছেছে। তাদেরকে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। টলটলায়মান পরিশ্রান্ত লোকগুলো ধপাস করে খাটের উপর পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে। ওদিকে মেয়ে দুটোও রাতে এক মুহূর্ত ঘুমোতে পারেনি। তারাও একটি কক্ষে শুয়ে পড়ে।
দুপুরের পর আন-নাসেরের চোখ খোলে। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে তার সঙ্গীরা এখানো ঘুমিয়ে আছে। সে আশ-পাশটা চেনার চেষ্টা করে। এটি একটি কক্ষ। কক্ষে পালংক আছে। আন-নাসেরের তিন সঙ্গী পালংকের উপর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সবুজ-শ্যামলিমা, রং-বেরঙের ফুল, পাখ-পাখালি ও মখমলসম সবুজ ঘাসের কথা মনে পড়ে তার। মেয়েদের কথা স্মরণে আসে। বিষয়গুলো তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। মরুভূমির সফরের কথা তার বাস্তবের ন্যায় স্মরণ আছে। কিন্তু দুটো মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলী তার কাছে স্বপ্ন কিংবা কল্পনা বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এখন সে কোথায়? এই প্রশ্ন তাকে বিব্রত ও বিচলিত করতে শুরু করে।
আন-নাসের তার সঙ্গীদের জাগালো না। নিজে বসা থেকে উঠে দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। এটি একটি দুর্গ। সৈনিকরা চলাফেরা করছে দেখতে পায়। এটা কোন্ বাহিনীর দুর্গ? আন-নাসের বিষয়টা কাউকে জিজ্ঞেস করা সমীচীন মনে করলো না। দুৰ্গটা দুশমনেরও হতে পারে। তাহলে কি আমি সঙ্গীদেরসহ বন্দী হয়েছি? কিন্তু এই কক্ষটা তো কয়েদখানার প্রকোষ্ঠ নয়। আন-নাসের গুপ্তচর ও গেরিলা সৈনিক। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই সে বিষয়টার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করলো। ধীরে ধীরে সে আশংকা অনুভব করতে লাগলো। এবার দরজা থেকে সরে পালংকের উপর গিয়ে বসলো। বাইরে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেলো। সাথে সাথে সে ঘুমের ভান করে নাক ডাকতে শুরু করলো।
দুব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করে।
এখনো ঘুমিয়ে আছে। একজন অপরজনকে বললো।
ঘুমিয়েই থাকতে দাও- দ্বিতীয়জন বললো- মনে হচ্ছে, একটু বেশি খাওয়ানো হয়েছে। আচ্ছা, এদের ব্যাপারে কি কিছু বলা হয়েছে?
খৃস্টান মেয়ে দুটি ফাঁদে ফেলে এদেরকে নিয়ে এসেছে- প্রথমজন উত্তর দেয়- এরা সালাহুদ্দীন আইউবীর কমান্ডো গুপ্তচর। অত্যন্ত সাহসী ও বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে। এদেরকে প্রস্তুত করতে হবে।
