তারা চলে যায়।
আন-নাসের বুঝে ফেলে, তারা প্রতারণার শিকার এবং শত্রুর হাতে বন্দী। এবার তাকে জানতে হবে, এটি কোন্ দুর্গ, কোন অঞ্চলে অবস্থিত এবং কী উদ্দেশ্যে তাদেরকে এখানে আনা হয়েছে। তার জানা আছে, কোনো দুর্গ থেকে পলায়ন করা শুধু কঠিনই নয়- অসম্ভব।
ছোট মেয়েটি কিছুক্ষণ ঘুমিয়েই জেগে ওঠে। কক্ষের জানালাটা খুলে জানালার কাছে বসে বাইরের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটি সফরের সময় বড় মেয়েটির কাছে তার আবেগের কথা প্রকাশ করেছিলো। সবে তরুণী। এখনো পরিপক্ক হয়নি। সমবয়সী অন্য পাঁচটি মেয়ের ন্যায় এখনো সে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই প্রথমবারের মতো সে ময়দানে এসেছে। সঙ্গের বড় মেয়েটি অভিজ্ঞ। সে অনুভব করছে, ছোট মেয়েটি সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে পারছে না। পুরুষদেরকে আঙ্গুলের ইশারায় নাচানোর যোগ্যতা-মানসিকতা কোনটিই এখনো তার আয়ত্ত্ব হয়নি। বাঘা বাঘা সালার ও সাইফুদ্দীন তাকে খেলনা বানিয়ে রেখেছিলো। এখন সে রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে কঠিন ও কষ্টদায়ক সফর করে এসে এখানে পৌঁছেছে। সারা রাত সফর করেছে; অথচ এসে পৌঁছামাত্র শেখ সান্নানের মতো বৃদ্ধের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে এবং তিনি যা বলবেন শুনতে হবে!
একথা সত্য যে, মেয়েটিকে শৈশব থেকেই এই নোংরা জীবনধারার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু যৌবনে পদার্পন করার পর যখন তার চোখ ফোটে এবং নিজের চোখে দেখতে ও নিজের মাথায় ভাবতে শিখে, তখন দীর্ঘ প্রশিক্ষণের ক্রিয়া এলোমেলো হয়ে যায়। যে মানুষগুলোকে ফাঁসিয়ে রাখতে এবং খৃস্টানদের জালে আটকে রাখতে তাকে প্রস্তুত করা হয়েছিলো, তাদের প্রতি তার মনে ঘৃণার সৃষ্টি হয় এবং নিজের এই পেশাটিকে হীন ভাবতে শুরু করেছে। জানালার কাছে বসে মেয়েটি নানা তিক্ত কল্পনায় ডুবে আছে। তার চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে আসে। কিন্তু সে চোখের সামনে না কোনো আশ্রয় দেখতে পাচ্ছে, না পালাবার পথ পাচ্ছে।
বড় মেয়েটির ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ খুলে দেখতে পায়, তার সঙ্গী হেট মেয়েটি জানালার কাছে বসে আছে। সেও উঠে তার পাশে গিয়ে বসে। চোখে অশ্রু দেখে বললো- প্রথম প্রথম এমনটা হয়ে থাকে। আমরা যা কিছু করছি বিলাসিতার জন্য করছি না, করছি ক্রুশের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ইসলামের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলে ক্রুশের রাজত্ব কায়েম করা। আমাদের সৈনিকরা তাদের অঙ্গনে লড়াই করছে। আমাদেরকে আমাদের অঙ্গনে লড়তে হবে। মনটাকে বড় বানাও। দেহের চিন্তা বাদ দাও, আত্মাটা পবিত্র থাকলেই হলো। তোমার আত্মা পবিত্র।
আচ্ছা, আমাদের যেভাবে ব্যবহার করা হয়, মুসলিম মেয়েদেরকে সেভাবে ব্যবহার করা হয় না কেন?- ছোট মেয়েটি জিজ্ঞেস করে- আমাদের বাদশাহ এবং তাদের সৈন্যরা মুসলমানদের ন্যায় লড়াই করে না কেনো? মুসলমানদেরকে তারা চোরের ন্যায় খুন করে কেননা? খৃস্টান বাহিনী সালাহুদ্দীন আইউবীর এই চার কমান্ডোর ন্যায় কমান্ডো তৈরি করে না কেননা? তার কারণ একটাই- আমাদের জাতি কাপুরুষ। যারা চুপি চুপি আক্রমণ করে, তারা কাপুরুষ না তো কী?
ছোট মেয়েটির বক্তব্য ও প্রশ্নবাণে বড় মেয়েটি চমকে ওঠে বললো- এমন কথা অন্য কারো সামনে বলবে না। অন্যথায় খুন হয়ে যাবে। এ মুহূর্তে আমরা শেখ সান্নানের কাছে রয়েছি। তার দ্বারা আমাদের অনেক কাজ নিতে হবে। তাকে নারাজ করা যাবে না।
লোকটার প্রতি আমার ঘৃণা জন্মে গেছে- ছোট মেয়েটি বললো- ইনি . তো কোন রাষ্ট্রের সম্রাট নন, ভাড়াটিয়া খুনীদের লিডার মাত্র। আমি তাকে আমার দেহ স্পর্শ করার যোগ্য মনে করি না।
বড় মেয়েটি দীর্ঘ কথোপকথনের পর বড় কষ্টে ছোট মেয়েটিকে সম্মত করতে সক্ষম হয় যে- সে শেখ সান্নানের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলবে ও সদ্ব্যবহার করবে।
সে মেয়েটিকে পরামর্শ দেয়- তুমি তাকে প্রলোভন দেখিয়ে সময় পার করে দেবে। তুমি তো আমার কৌশল দেখেছো। আমি মুসলিম রাজাদেরকে মুঠোয় নিয়ে তাদের গোমরা করতে জানি। শেখ সান্নানকে আমি কোন ব্যক্তিত্বই মনে করি না। . তুমি কি আমাকে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারো? ছোট মেয়েটি বললো।
চেষ্টা করবো- বড় মেয়েটি বললো- আগে আমাদের সংবাদ পৌঁছাতে হবে যে, আমরা এখানে আছি।
এমন সময় দুজন লোক কক্ষে প্রবেশ করে। তারা মেয়েদেরকে তাদের নিয়ে আসা লোকগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। লোকগুলো কারা, কোথা থেকে কিভাবে এবং কী উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে? বড় মেয়েটি তার বিবরণ দেয়।
তারা কী অবস্থায় আছে? বড় মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
এখনো ঘুমিয়ে আছে। একজন জবাব দেয়।
তাদেরকে কি কারাগারে আটকে রাখবে? ছোট মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
কারাগারে নিক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজন নেই- লোকটি জবাব দেয় এখান থেকে পালিয়ে যাবে কোথায়?
আমরা কি তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারি? ছোট মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
অবশ্যই পারবে- লোকটি জবাব দেয়। তারা তোমাদের শিকার। যাও, দেখা করো। তোমরা তাদের কাছে যাও, তাদেরকে তোমাদের জালে আটকে রাখো।
কিছুক্ষণ পর ছোট মেয়েটি বড় মেয়েটির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা যে কক্ষে ঘুমিয়ে আছে, সেখানে চলে যায়। আন-নাসের মূলত সজাগ। মেয়েটিকে দেখে সে উঠে বসে এবং জিজ্ঞেস করে- আমাদেরকে কোথায় নিয়ে এসেছো? বলো, তোমরা কারা? তোমাদের মিশন কি? এটা কোন্ জায়গা?
