মেয়েটি আন-নাসের ও তার সঙ্গীদেরকে আয়ত্ত্বে নিয়ে একটি লক্ষ্য তো এই অর্জন করতে চাচ্ছিলো যে, লোকগুলো তাদের প্রতি হাত বাড়াবে না কিংবা অপহরণ করে নিয়ে যাবে না। দ্বিতীয়ত, যদি প্রমাণিত হয় যে, এরা সুলতান আইউবীর গুপ্তচর কিংবা কমান্ডো সেনা, তাহলে কৌশলে তাদেরকে নিয়ে শেখ সান্নানের হাতে তুলে দেবে। এদের দ্বারা তার কোনো না কোনো উপকার আসতে পারে। সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ লক্ষ্যে হাররানের স্বাধীন শাসক গোমস্তগীন আসিয়ান দুর্গে শেখ সান্নানের সঙ্গে সাক্ষাতও করে গেছেন।
***
তুর্কমানে মুজাফফর উদ্দীনের আক্রমণ ব্যর্থ করে দিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবী তাঁর সালারদের বললেন- এবার যুদ্ধ শেষ হলো। তিনি মালে গনীমত সংগ্রহ করার নির্দেশ প্রদান করেন। শত্রু বাহিনীর ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পদ। সাইফুদ্দীনের ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হলো বিপুল সোনা ও নগদ অর্থ। শত্রু বাহিনীর সৈন্যদের লাশের দেহ থেকেও নগদ অর্থ, সোনার আংটি ইত্যাদি সম্পদ পাওয়া যায়। অন্যান্য মালপত্র ও অস্ত্রশস্ত্রের কোনো হিসাব ছিলো না। সালাহুদ্দীন আইউবী যুদ্ধের কাজে আসতে পারে এমন সব মালপত্র সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দেন। একাংশ মালামাল দামেস্ক এবং সেসব এলাকায় গরীবদের মাঝে বণ্টন করে দেয়ার আদেশ প্রদান করেন, যেগুলো মিশর ও সিরিয়ার সাম্রাজ্যের আওতায় এসে গেছে। অপর এক অংশ মাদ্রাসা নিজামুল মুলককে প্রদান করেন। ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ লিন পোলের বর্ণনা মতে- সালাহুদ্দীন আইউবী উক্ত মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা অর্জন করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ইতিহাসে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সালাহুদ্দীন আইউবী তুর্কমানের গনীমত থেকে নিজে কোনো ভাগ নেননি।
এবার বন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা। বন্দীরা সকলেই মুসলমান। সালাহুদ্দীন আইউবী তাদেরকে একত্রিত করে বললেন- তোমরা মুসলমান এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলে। তোমাদের পরাজয়ের কারণ হচ্ছে, তোমাদের শাসনকর্তা তোমাদের ধর্মের ঘৃণ্যতম শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তার হাত শক্ত করছে। তোমাদের দুনিয়াও নষ্ট হলো, আখেরাতও বরবাদ হলো। এখন তোমাদের সামনে পাপ স্খলনের একমাত্র পথ হচ্ছে, তোমরা ইসলামের সৈনিক হয়ে যাও এবং নিজেদের প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করো।
সালাহুদ্দীন আইউবীর এই ভাষণটি ছিলো অত্যন্ত তেজস্বী ও আবেগপ্রবণ। বন্দীদের সমাবেশের মধ্য থেকে শত কণ্ঠে আকাশ কাঁপানো নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারিত হতে শুরু করে। তারা সমস্বরে সালাহুদ্দীন আইউবীর আনুগত্যের ঘোষণা দিতে আরম্ভ করে। এভাবে আইউবীর বাহিনীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক ও কমান্ডারের সংখ্যা বেড়ে গেলো। তথাপি সুলতান অগ্রযাত্রা মুলতবি রাখেন। বাহিনীর নববিন্যাস আবশ্যক। তিনি দামেস্ক ও. কায়রো থেকেও সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছেন। সেখানেই আহতদের চিকিৎসা সেবা চলছে। যুদ্ধে জয়ী হলেও মুজাফফর উদ্দীনের এই আক্রমণ সালাহুদ্দীন আইউবীকে বেশ বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
আসিয়াত দুর্গ ছিলো বর্তমানকার লেবাননের সীমান্ত এলাকায়। মিশরী ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ ফরীদ আবু হাদীদের বর্ণনা মোতাবেক আসিয়াত দুর্গ ছিলো হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতক চক্র হাশিশিদের কেন্দ্র ও আস্তানা। সেখানে হাসান ইবৃনে সাব্বাহর স্থলাভিষিক্ত শেখ সান্নানের রাজত্ব ছিলো। দুর্গে তার একটি বাহিনীও রাখা ছিলো। দুৰ্গটা ছিলো বেশ বড়সড়। তার থেকে দূরে দূরে ছোট আরো তিন-চারটি দুর্গ ছিলো। এই দুর্গগুলোও ছিলো শেখ সান্নানের হাশিশীদের দখলে। খৃস্টানরা তাদেরকে এই দুর্গগুলো দিয়ে রেখেছিলো। খৃস্টানরা এই হাশিশীদের মুসলিম নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা এবং মুসলিম জাতির চরিত্র ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করতো। কিন্তু তাদেরই একটি দল শেষ পর্যন্ত ভাড়াটিয়া খুনী চক্রে পরিণত হয়ে যায়। তারা কতিপয় খৃস্টান নেতৃবর্গকেও হত্যা করেছিলো। বিনিময় পেলেই তারা যে কাউকে খুন করতে প্রস্তুত হয়ে যেতো। সালাহুদ্দীন আইউবীর আমলে খৃস্টানরা তাদেরকে এতো বেশি সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে যে, কতগুলো দুর্গ পর্যন্ত তাদেরকে দিয়ে দেয়। তাদের মাধ্যমে, খৃস্টানরা সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী ও সালাহুদ্দীন আইউবীকে খুন করাবার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।
নুরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যু সম্পর্কে মেজর জেনারেল আকবর খান কোনো কোনো ঐতিহাসিকের সূত্রে লিখেছেন- এটি ছিলো হাশিশীদের কর্ম। হাশিশীরা তাকে গোপনে কি যেনো খাইয়েছিলো, যার ক্রিয়ায় দিন কয়েক পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তারা এখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে। হাশিশীরা খৃস্টানদের হাতে খেলছে।
সকাল বেলা। সূর্য এখনো উদিত হয়নি। আন-নাসের ও তার তিন সঙ্গী খৃস্টান মেয়ে দুটির সঙ্গে আসিয়াত দুর্গের ফটকের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। বড় মেয়েটি একটি সাংকেতিক শব্দ উচ্চারণ করে। ক্ষণিক পর দুর্গের দরজা খুলে যায়। শেখ সান্নান সব বিচারেই রাজা। একজন রাজার সব ক্ষমতাই তার আছে। তার চলন-বলন, ভাবগতি ও শান-শওকত রাজকীয়। লোকটার এই অনুভূতিটুকুও নেই যে, সে বৃদ্ধ হয়ে গেছে। বড় মেয়েটি যখন তাকে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছিলো এবং সাইফুদ্দীনের শোচনীয় পরাজয়ের বিস্তারিত শোনাচ্ছিলো, তখনো তার লোলুপ দৃষ্টি ছোট মেয়েটির উপর নিবদ্ধ ছিলো।
