আলী বিন সুফিয়ান এবং ফৌজের একজন সালারকে ডেকে পাঠান সুলতান আইউবী। তারা এসে পৌঁছুলে সুলতান আরোহীকে বললেন, এবার ঘটনাটা বিস্তারিত বলল। লোকটি ক্যাম্প থেকে রওনা হওয়ার সময় থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ঘটনার ইতিবৃত্ত শোনায়। কমাণ্ডার সম্পর্কে বলে, কিছু পথ অতিক্রম করার পর থেকে তিনি একটি কয়েদী মেয়ে নিয়ে মনোরঞ্জনে মেতে ওঠেন এবং দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে সোজা পথ ত্যাগ করে তিনি এমন পথ ধরে চলতে শুরু করেন, যে পথে কায়রো পৌঁছুতে আমাদের অনেক বেশী সময় ব্যয় হতো। আপত্তি জানালে তিনি ক্ষেপে ওঠেন এবং এ ব্যাপারে কাউকে নাক গলাতে বারণ করে দেন। এভাবে একের পর এক পুরো ঘটনা আনুপুংখ বিবৃত করে আরোহী। কিন্তু একথা জানাতে সে ব্যর্থ হলো যে, হামলাটা–কারা করলো।
আলী বিন সুফিয়ান ও নায়েবে সালারকে উদ্দেশ করে সুলতান বললেন তার মানে মিসরে এখনো খৃষ্টান কমাপ্তে রয়ে গেছে।
হতে পারে, তারা মরুদ্য। এমন রূপসী ছয়টি মেয়ে দস্যুদের জন্য বেশ লোভনীয় শিকার। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
তুমি লোকটির কথা খেয়াল করে শোননি। ও বললো, পুরুষ কয়েদীরা ময়দান থেকে অস্ত্র কুড়িয়ে এনে রক্ষীদের হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলো। টের পেয়ে দুজন রক্ষী তীরের আঘাতে তাদেরকে হত্যা করে ফেলে। হামলাটা হয় তার পরে। এতেই বুঝা যায়, খৃষ্টান গেরিলারা পূর্ব থেকেই কাফেলাকে অনুসরণ করছিলো।
মুহতারাম সুলতান! হামলাকারীরা যারা-ই হোক, এক্ষুনি আমাদের যে কাজটি করা দরকার, তাহলে পথ দেখিয়ে নেয়ার জন্য এ সৈনিককে সঙ্গে দিয়ে অন্তত বিশজন দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার তাদেরকে ধাওয়া করার জন্য প্রেরণ করা। তারা কারা, সে প্রশ্নের জবাব পরে খুঁজে বের করা যাবে। বললেন নায়েবে সালার।
আমি আমারএক নায়েবকেও সঙ্গে দেবো। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
এ সৈনিককে আহার করাও। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতে দাও। এ সুযোগে বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলল। প্রয়োজন মনে করলে আরো বেশী সৈনিক দাও। বললেন সুলতান আইউবী।
যেখান থেকে আমি ঘোড়া নিয়ে এসেছি, সেখানে আরো আটটি ঘোড়া বাঁধা ছিলো। সেখানে কোন মানুষ দেখিনি। এ ঘোড়াগুলোর আরোহীরা-ই আক্রমণকারী হবে বোধ হয়। ঘোড়া যদি আটটি-ই হয়ে থাকে, তাহলে তারাও হবে আটজন। বললো আরোহী।
গেরিলাদের সংখ্যা বেশী হবে না। আমরা তাদের ধরে ফেলবো ইনশাআল্লাহ। বললেন নায়েবে সালার।
মনে রাখবে, ওরা গেরিলা, আর মেয়েগুলো গুপ্তচর। তোমরা যদি একটি গুপ্তচর কিংবা একজন গেরিলাকে ধরতে পারো, তাহলে বুঝবে, তোমরা শক্রর দুশ সৈনিককে গ্রেফতার করে ফেলেছে। একজন গুপ্তচর খতম করার জন্য আমি দুশ শত্রুসেনাকে ছেড়ে দিতে পারি। একজন সাধারণ নারী কারুর তেমন কোন ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু একটি গুপ্তচর কিংবা সন্ত্রাসী মেয়ে একাই একটি দেশের সমগ্র সেনাবহর সমুদ্রে ডুবিয়ে মারতে সক্ষম। এই মেয়েগুলো বড় ভয়ঙ্কর। এরা যদি মিসরের অভ্যন্তরেই থেকে যায়, তাহলে তোমরা পুরো বাহিনী-ই ব্যর্থ হয়ে পড়বে। একটি পুরুষ কিংবা মেয়ে গুপ্তচরকে গ্রেফতার কিংবা খুন করার জন্য প্রয়োজনে নিজেদের একশত সৈনিককে উৎসর্গ করে দাও। তারপরও আমি বলবো, এ সওদা অনেক সস্তা। গেরিলাদের ধরতে না পারলেও তেমন চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু যে কোন মূল্যে মেয়েগুলোকে ধরতে-ই হবে। যদি প্রয়োজন হয়, তীর ছুঁড়ে ওদের হত্যা করে ফেলো; তবু জীবিত পালাতে যেন না । পারে। বললেন সুলতান আইউবী।
এক ঘন্টার মধ্যে বিশজন দ্রুতগামী আরোহী প্রস্তুত করে রওনা করা হয়। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে এই রক্ষী। আলী বিন সুফিয়ানের এক নায়েব যাহেদীন হলেন বাহিনীর কমাণ্ডার।
আলী বিন সুফিয়ান ফখরুল মিসরীকে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করেন এ বাহিনীতে। ফখরুল মিসরীর একান্ত কামনা ছিলো, যেন তাকে বালিয়ান ও মুবীকে গ্রেফতার করার জন্য প্রেরণ করা হয়। এখন এ বাহিনী যাদেরকে ধাওয়া করতে যাচ্ছে, তারা-ই যে বালিয়ান আর মুবী, সে তথ্য না জানে ফখরুল মিসরী, না জানেন আলী বিন সুফিয়ান।
এদিক থেকে রওনা হলো বিশজন আরোহী। একুশতম ব্যক্তি তাদের কমাণ্ডার। টার্গেট তাদের কয়েকটি মেয়ে এবং যারা তাদেরকে ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। আবার অপর দিক থেকেও এগিয়ে আসছে খৃষ্টানদের বিশজন কমাণ্ডো, একুশতম ব্যক্তি তাদের কমাণ্ডার। তাদেরও লক্ষ্য সেই মেয়েরা। কিন্তু তাদের দুর্বলতা হলো, তাদের বাহন নেই। পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসছে তারা। মজার ব্যাপার হলো, দু পক্ষের কারুর-ই জানা নেই, যাদের উদ্দেশ্যে এ অভিযান, তারা কোথায়।
***
খৃষ্টানদের কমাণ্ডো দলটি পরদিন সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত অনেক পথ অতিক্রম করে ফেলে। এখন তারা যে স্থানে অবস্থান করছে, সেখানকার কোথাও চড়াই কোথাও উত্রাই। উঁচু-নীচু এলাকা। চড়াই বেয়ে উপরে আরোহণের পর তারা দূরবর্তী একটি ময়দানে কতগুলো উট দেখতে পায়। অসংখ্য খেজুর গাছসহ অন্যান্য গাছও আছে সেখানে। তারা দেখতে পায়, উটগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে পিঠ থেকে মাল নামানো হচ্ছে। বার-চৌদ্দটি ঘোড়াও আছে সেখানে। সেগুলোর আরোহীদেরকে সৈনিক বলে মনে হলো। আর যারা আছে, সবাই উষ্ট্ৰচালক। দেখে থেমে যায় এই একুশ কমাণ্ডোর কাফেলা। তারা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। এ মুহূর্তে যা একান্ত প্রয়োজন, তা-ই পেয়ে গেছি এমন একটা ভাব ফুটে উঠেছে সকলের চোখে-মুখে। কাফেলাকে থামিয়ে কমাণ্ডার বললো–সত্যমনে ক্রুশের উপর হাত রেখে আমরা শপথ করে এসেছিলাম। ঐ দেখ, ক্রুশের কারিশমা। জাজ্বলমান অলৌকিক ব্যাপার। আকাশ থেকে খোদা তোমাদের জন্য সওয়ারী পাঠিয়েছেন। তোমাদের কারো মনে কোন পাপবোধ, কর্তব্যে অবহেলা কিংবা জান বাঁচিয়ে পালাবার ইচ্ছা থাকলে এ মুহূর্তে তা ঝেড়ে ফেলে দাও। খোদার পুত্র–যিনি মজলুমের বন্ধু, জালিমের দুশমন–আকাশ থেকে তোমাদের সাহায্যে নেমে এসেছেন।
