এই মেয়ে দুজনকে খৃস্টানরা কিছুদিন আগে মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীনের নিকট উপহার স্বরূপ প্রেরণ করেছিলো। সাইফুদ্দীন সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমন। খৃস্টানরা এ মেয়ে দুজনকে তিনটি মিশন দিয়ে প্রেরণ করে। প্রথমত, তারা খৃস্টানদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করবে। দ্বিতীয়ত, সাইফুদ্দীন যাতে সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সন্ধি করার ভাবনা ভাবতে না পারে, সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাখবে। তৃতীয় মিশন ছিলো, যেসব মুসলিম আমীর সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে গিয়েছিলো, তাদের মাঝে পরস্পর বিভেদ সৃষ্টি করে রাখা। এ কাজগুলো শুধু এ দুটো মেয়ের উপরই ন্যাস্ত করা হয়নি, সেখানকার গোটা খৃস্টান মিশনারীই এ কাজে নিয়োজিত ছিলো। তারা বেশ কজন মুসলমানের ঈমান ক্রয় করে ফেলেছে। এখন সেসব মুসলমান তাদেরই হয়ে কাজ করছে।
সাইফুদ্দীন যখন সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে তুর্কমানে সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন, তখন রাজা বাদশাদের রীতি অনুযায়ী তিনি তার হেরেমের বাছা বাছা মেয়ে এবং গায়িকা নর্তকীদের রণাঙ্গনে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই রূপসী মেয়ে দুজনও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সাইফুদ্দীন এদেরকে নিষ্পাপ মনে করতেন। কিন্তু বড় মেয়েটি প্রেতাত্মার ন্যায় সাইফুদ্দীনের শিরায় শিরায় মিশে গিয়েছিলো। হেরেমের অন্যান্য মেয়েদেরকে সে তার দাসী বানিয়ে রেখেছিলো।
সাইফুদ্দীন জঙ্গলকে মঙ্গলে পরিণত করে নিয়েছিলো। এক সময় সেখানে মরুঝড় হয়, যার বিবরণ আপনারা উপরে পাঠ করে এসেছেন। এই ঝড়ের মধ্যে ফাওজিয়া নাম্মী এক মেয়ে আপন ভাইয়ের মৃতদেহ ঘোড়ার পিঠে করে সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছে দিয়েছিলো এবং সংবাদ প্রদান করেছিলো যে, তিনটি বাহিনী একজোট হয়ে তার উপর আক্রমণ করতে এসে পড়েছে।
সুলতান আইউবী দ্রুততার সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং সাইফুদ্দীনের বাহিনীর উপর আক্রমণ করে বসেন। অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়ে সাইফুদ্দীনের বহু সৈন্য প্রাণ হারায়। এই একতরফা লড়াইয়ে রণাঙ্গন ছিলো সালাহুদ্দীন আইউবীর হাতে। সাইফুদ্দীন তার সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ড সামলাতে ব্যর্থ হন। যখন তার ময়দান ছেড়ে পালাবার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন এই মেয়ে দুটো তার সঙ্গে ছিলো। খৃস্টানদের কয়েকজন মুসলমান এজেন্ট সাইফুদ্দীনের ফৌজের উচ্চপদে সমাসীন ছিলো। এই মেয়ে দুটোর সঙ্গে তাদের ভালো যোগাযোগ ছিলো। মেয়েরা তাদেরকে খবরাখবর জানাতো আর তারা সেসব সংবাদ খৃস্টানদের নিকট পৌঁছে দিতো।
তারা যখন দেখলো, যুদ্ধ পরিস্থিতি এমন এক রূপ ধারণ করেছে যে, সম্মিলিত বাহিনীকে পিছপা হওয়া ব্যতীত কোন উপায় নেই, তখনই তারা মেয়ে দুটোকে ওখান থেকে নিয়ে কেটে পড়ার পরিকল্পনা আঁটে। খৃস্টানদের এই মেয়ে দুজন খুবই মূল্যবান। সাইফুদ্দীন যুদ্ধের ময়দানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। হেরেমের মেয়েরা তার বিশ্রামাগারের একটি তাঁবুতে এসে জড়ো হয়। এই খৃস্টান মেয়ে দুটো এক স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের লোকেরা এসে পড়েছে। তাদেরকে দুটি ঘোড়া দেয়া হলো। ঘোড়ার জিনের সঙ্গে পানির চারটি মশক ও খাবারের দুতিনটি থলে বেঁধে দেয়া হলো। খঞ্জরও দেয়া হলো। কিন্তু তাদের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হচ্ছে হাশিশ আর অনুরূপ এমন একটি নেশাকর দ্রব্য, যার কোনো স্বাদ নেই। এই বস্তুটা কাউকে তার অজান্তে পান করানো বলে সে টেরই পায় না যে, পানি বা শরবতের সঙ্গে তাকে অন্য কিছু পান করানো হয়েছে। এই নেশাকর পদার্থ দুটো তাদের সঙ্গে দেয়ার উদ্দেশ্য হলো, তাদেরকে কোনো পুরুষের সঙ্গ ছাড়া সফর করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত যদি পথে কারো হাতে পড়ে যায়, তাহলে অজান্তে এসব পান করিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলবে।
রাতের বেলা। রণাঙ্গনে ঘোরতর যুদ্ধ চলছে। দুব্যক্তি মেয়ে দুটোকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে ছুটতে শুরু করে। তুর্কন পেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত লোকগুলো তাদের সঙ্গে যায়। তারপর মেয়েদেরকে পথ বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে আসে। মেয়েদের গন্তব্য অসিয়ানের দুর্গ। বড় মেয়েটি অত্যন্ত বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ ও সাহসী। ছোট মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে সে যাত্রা শুরু করে। তোর নাগাদ তারা সবুজ-শ্যামল অঞ্চল ত্যাগ করে বেশ দূরে চলে যায় এবং উক্ত অঞ্চলের নরক বলে পরিচিত ভূখণ্ডে এসে পৌঁছে। মেয়েদের জানা আছে, এ স্থানে পৌঁছে তরুলতাহীন পাথুরে পথ অতিক্রম করতে হবে। অঞ্চলটা ভীতিকর এবং উত্তপ্ত চুলোর ন্যায় গরম। সূর্য মাথার উপর উঠে এলে তারা পাবর্ত্য এলাকায় এসে পৌঁছে। তারা একটি টিলার আড়ালে অবস্থান নিয়ে পানাহার করে বিশ্রাম করতে থাকে। ঐ সময় তারা আন-নাসেরকে তার তিন সঙ্গীসহ আসতে দেখে।
তাদেরকে দেখেই বড় মেয়েটি বুঝে ফেলে, তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন। মেয়েটির তার বিদ্যার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে শুরু করে, যার ফলে আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা তাদেরকে কাল্পনিক বস্তু কিংবা পরী বলে বিশ্বাস করে ফেলে। মেয়েটির প্রতিটি পদক্ষেপই শতভাগ সফল হয়। প্রথমে সে লোকগুলোকে পানি ও কাবাব খাওয়ায়। তারপর হাশিশ এবং অন্য নেশাকর দ্রব্যটি পান করায়। লোকগুলোকে নেশা পান করিয়ে তারা ফুল, সবুজ-শ্যামলিমা, পাখ-পাখালি ও মখমলসম ঘাসের উল্লেখ করেছিলো, তা লোকগুলোর মস্তিষ্কে জান্নাতের কল্পনা জাগ্রত করে দেয়। হাশিশ পান করিয়ে মানুষের মন-মস্তিষ্কে সুদর্শন কল্পনা সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হাসান ইবনে সাব্বাহর আবিষ্কৃত পদ্ধতি। শত বছর পরে শেখ সান্নান এখন তার স্থলাভিষিক্ত। এই চক্রটিকে এখন হাশিশি কিংবা ফেদায়ী বলা হয়। বড় মেয়েটির এ বিদ্যার প্রশিক্ষণ আছে।
