আসিয়াত পৌঁছে আমাকেও এই ওস্তাদী শিখিয়ে দিও- ছোট মেয়েটি বললো- এই কাজগুলো করতে আমার কেমন যেনো অনীহা লাগছে। আমি মুসলমান শাসকদের খেলনা হয়ে আছি। তুমি তো চালাকি করে আঁচল বাঁচিয়ে রাখছে; কিন্তু আমি পারছি না। অনেক সময় মনে চিন্তা আসে, পালিয়ে কোথাও চলে যাই। কোন পথও পাই না, আমার কোন আশ্রয়ও নেই।
সবই শিখতে পারবে- বড় মেয়েটি বললো- তোমাকে আমার সঙ্গে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। আমি তোমার দুর্বলতাগুলো বুঝতে পেরেছি। এসব দূর হয়ে যাবে।
আন-নাসের তার সঙ্গীদের নিয়ে এগিয়ে চলছে। মেয়েরা ঘোড়া নিয়ে তাদের সামনে চলে যায়, যাতে তারা পথ হারিয়ে না ফেলে। তারা সমকণ্ঠে গান গেয়ে চলছে। বালি, মাটি ও পাথর তাদের জন্য ঘাস হয়ে আছে।
ওদেরকে অন্য কোন পথে তুলে দেয়া প্রয়োজন ছিলো- ছোট মেয়েটি বললো- ওদেরকে অসিয়াত নিয়ে কী করবে?
আমাদের গুরু শেখ সান্নানের জন্য এর চেয়ে উত্তম উপহার আর কিছু হতে পারে না- বড় মেয়েটি জবাব দেয়- এরা সালাহুদ্দীন আইউবীর কমান্ডোসেনা এবং গুপ্তচর। আইউবীর একজন গুপ্তচর ধরে তার মস্তিষ্ক ধোলাই করতে পারলে বুঝতে হবে, তুমি তার বাহিনীর এক হাজার সৈনিককে বেকার করে দিয়েছে। আইউবীর একজন গুপ্তচর গেরিলা সৈন্য আমাদের ঊর্ধ্বতন একজন সেনা অফিসারের সমান, বরং তার চেয়েও মূল্যবান। তারা দৈহিক দিকে থেকে অস্বাভাবিক শক্তিশালী ও সহনশীল। আবার মানসিক দিক থেকেও পাহাড়ের ন্যায় অটল। নিজের কর্তব্যকে তারা জীবনের চেয়েও মূল্যবান মনে করে থাকে। এই চার সৈনিক অভিযান পরিচালনা এবং ক্লান্তির পরও মরু অঞ্চলে যে বিপদ ও ক্ষুৎপিপাসা সহ্য করেছে, তা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের সৈন্যদের মাঝে এই চেতনা ও ক্ষমতা নেই। সুলতান আইউবীর এই চার সৈনিককে আমি শেখ সান্নানের হাতে তুলে দেবো। তুমি সম্ভবত, জানো না, সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা চালানো হয়েছিলো। কিন্তু একটি অভিযানও সফল হয়নি। এই চার ব্যক্তিকে হাশিশ ও ওস্তাদীর মাধ্যমে আইউবীকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত করা যেতে পারে। এরা আইউবীর নিজস্ব কমান্ডো। এরা সহজে আইউবী পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারবে।
আচ্ছা, আমরা সাইফুদ্দীন, গোমস্তগীন ও অন্যান্যদেরকে যেভাবে কাবু করেছি, সালাহুদ্দীন আইউবীকে কি সেই প্রক্রিয়ায় কাবু করা যায় না? ছোট মেয়েটি প্রশ্ন করে।
না–বড় মেয়েটি জবাব দেয়- যে ব্যক্তি জগতের সুখ-ভোগ ত্যাগ করে একটি পবিত্র লক্ষ্য অর্জনে আত্মনিয়োগ করেছে, আমাদের ন্যায় রূপসী মেয়ে আর সোনার স্তূপ কোনকিছুই তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। আইউবী এক স্ত্রীর প্রবক্তা। নুরুদ্দীন জঙ্গীর এই একটি সমস্যা ছিলো যে, রাজা হয়েও তিনি ঘরে একজন মাত্র স্ত্রী রেখেছিলেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তারই অনুরক্ত ছিলেন। এই সমস্যাটা সালাহুদ্দীন আইউবীর মধ্যেও বিদ্যমান। বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু এই পাথরটাকে গলানো যায়নি। অথচ আইউবীকে হত্যা না করে আমাদের ফিলিস্তিনে দখল বজায় রাখা সম্ভব নয়।
সেই পুরুষই আমার কাছে ভালো লাগে, যে এক স্ত্রী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে ছোট মেয়েটি বললো- আমি ক্রুশের পুজারী। ক্রুশের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জানা থাকা সত্ত্বেও আমি মাঝে-মধ্যে ভাবি, আমি এমন একজন পুরুষের হৃদয়ে স্থান করে নেই, যে আমার দেহ-মন ও আত্মার অংশ হয়ে থাকবে।
আবেগ ত্যাগ করো- বড় মেয়েটি ছোট মেয়েটিকে ধমক দিয়ে বললো ক্রুশের মহান মিশন বাস্তবায়নে নিবেদিত হয়ে কাজ করো। ক্রুশ হাতে নিয়ে যে শপথ করে এসেছে, সে কথা স্মরণ করো। আমি জানি, তুমি টগবগে এক তরুণী। এই বয়সে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন কাজ। কিন্তু ক্রুশ আমাদের থেকে এই কুরবানীই কামনা করছে।
রহস্যময় এই কাফেলাটি এগিয়ে চলছে। আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা মেয়েদের ঘোড়ার পেছন পেছন হাঁটছে। তারা কখনো সমস্বরে গান গাইছে, কখনো গুন গুন করছে। আবার কখনোবা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। রাত যতো গম্ভীর হচ্ছে, তাদের গন্তব্যও কাছে চলে আসছে।
***
এরা সেই গোত্রের মেয়ে, যাদের একাধিক কাহিনী আপনারা পেছনে পাঠ করে এসেছেন। ইহুদী-খৃস্টানরা সুন্দরী কিশোরী-তরুণীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করে মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা বিনষ্ট, চরিত্র ধ্বংস এবং শত্রুকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করার কলাকৌশল শিক্ষা দিতো। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে শত্রুর চিন্তা-চেতনার উপর কিভাবে প্রভাব সৃষ্টি করতে হবে, সেই প্রশিক্ষণ তাদের কৈশোরেই প্রদান করা হতো। তাদের মাঝে চঞ্চলতা ও বেহায়াপনা সৃষ্টি করা হতো। তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে নীতি নৈতিকতা ও লাজ-শরম কিছুই অবশিষ্ট রাখা হতো না। ইহুদীরা যেহেতু মুসলমানদেরকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করতো, সে জন্যে তারা তাদের কন্যাদেরকে এ কাজের জন্য খৃস্টানদের হাতে তুলে দিতো। খৃষ্টানরা নিজেদের কন্যাদেরকে ব্যবহার করতো। তারা তাদের শাসিত অঞ্চলগুলোতে মুসলমানদের কাফেলার উপর আক্রমণ করতো এবং কোন রূপসী-কিশোরী কন্যা পেলে তাকে তুলে নিয়ে আসতো এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মিশনের জন্য প্রস্তুত করতো।
