বড় মেয়েটি আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের তার সম্মুখে পাশাপাশি বসিয়ে দুহাত দুজনের কাঁধের উপর রেখে বললো- আমার চোখে দৃষ্টিপাত করো।
ছোট মেয়েটিও আন-নাসেরের অপর সঙ্গীদেরকে অনরূপ সামনাসামনি বসিয়ে নিজের হাত দুটো তাদের কাঁধে রেখে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে বললো। সুলতান আইউবীর চার কমান্ডের কানে বড় মেয়েটির সুরেলা কণ্ঠ প্রবেশ করতে শুরু করে- এটি তোমাদের জান্নাত। এই ফুলগুলোর রং দেখো। এর সৌরভ শুঁকে দেখো। ফুলের মাঝে উড়ন্ত পাখিগুলোকে দেখো। তোমাদের পায়ের নীচে মখমলের ন্যায় ঘাস। কূপ দেখো। কূপগুলোর স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট পানি দেখো।
মেয়েটির কণ্ঠ চার কমান্ডোর বিবেক, চোখ ও সমস্ত অনুভূতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। আন-নাসের পরে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা প্রধান হাসান ইব্নে আব্দুল্লার নিকট ঘটনার যে বিবরণ প্রদান করেছিলো, তাতে সে বলেছিলো, মেয়ে দুটোর চোখগুলোকে পানির স্বচ্ছ কূপ মনে হতে লাগলো। সঙ্গে তাদের কাঁধের উপর ছড়ানো রেশমকোমল চুলগুলো চিত্তাকর্ষক ফুলের পাপড়িতে পরিণত হয়ে যায়। আমাদের মনে হচ্ছিলো, আমরা এমন একটি বাগিচায় বসে আছি, যার সৌন্দর্য ও ফুলের রঙের বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়। সেখানে বালি ও মাটির লম্বা লম্বা টিলা ছিলো না। ছিলো না মরু অঞ্চল। সর্বত্র গাছ-গাছালি আর সবুজের সমারোহ। পায়ের নীচে মখমলসম ঘাসের ফরাশ আর রং-বেরঙের পাখ-পাখালির কিচির-মিচির শব্দ।
***
আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা মখমলসম যে ঘাসের উপর দিয়ে এগিয়ে চলছিলো, সেগুলো ছিলো মূলত বালি। কোথাও কোথাও শক্ত মাটি। তারা সব কজন গুন গুন করে একটি গান গেয়ে চলছে। মেয়ে দুটো তাদের কয়েক পা দূরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের গতি তুর্কমান নয়, যেখানে সুলতান আইউবীর ফৌজ অবস্থান করছে এবং সেটি আন নাসের ও তার সঙ্গীদের গন্তব্য। তাদের গতি আসিয়াতের সেই দুর্গ, যেখানে হাশিশিদের নেতা শেখ সান্নান অবস্থান করছে। আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা জানে না, তারা কোনদিকে যাচ্ছে। বরং পথ চলছে কিনা, তাদের সেই অনুভূতিটাই ভোতা হয়ে গেছে। তাদের পেছনে পেছনে সেই মেয়ে দুটো আপসে কথা বলছে। সেই কথার শব্দ কমান্ডোদের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। সূর্য ডুবে গেছে।
তুমি বলছো, রাতে কোথাও অবস্থান করবে না- ছোট মেয়েটি বড় মেয়েকে বললো- লোকগুলো কি সারারাত হাঁটতে পারবে?
তুমি পানিতে মিশিয়ে তাদেরকে যে পরিমাণ হাশিশ পান করিয়েছে, তার ক্রিয়া আগামীকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবে- বড় মেয়েটি বললো- আর আমি তাদেরকে যা খাইয়েছি, তা তুমি দেখেছো। এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। আশা করি, সূর্যোদয়ের আগে আগেই আমরা আসিয়ান পৌঁছে যাবো।
আমি তো ওদেরকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম- ছোট মেয়েটি বললো তোমার কৃতিত্ব যে, তুমি তাদেরকে আয়ত্ত্ব করে ফেলেছে এবং তাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছে, আমরা পরী। মুসলমানরা জিন-পরী বিশ্বাস করে।
এটা ছিলো বুদ্ধির খেলা- বড় মেয়েটি বললো- আমি তাদের মানসিক অবস্থাটা আয়ত্ত্ব করে ফেলেছিলাম। তাদের চেহারা ও চালচলন দেখে আমি বুঝে ফেলেছিলাম, ওরা সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈনিক এবং পথ ভুলে গেছে। আমি এও বুঝে ফেলেছিলাম যে, আমাদেরকে দেখে তারা ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। যদি আমরা ভয় পেয়ে যেতাম এবং নারীর ন্যায় কাপুরুষতা প্রদর্শন করতাম, তাহলে উল্টো তারা আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে, যা আমরা জীবনেও ভুলতে পারতাম না। এই বিজন অঞ্চলে কোনো পুরুষ যদি আমাদের ন্যায় মেয়েদের হাতে পেয়ে যায়, তাহলে তারা আমাদের সঙ্গে বোন-কন্যার চোখে দেখবে, এমন আশা করা যায় না। আমি তাদের দৈহিক অবস্থা দেখেছি। তারপরও কৌশল ঠিক করেছি, মুসলমানদের মধ্যে তো এই দুর্বলতা আছে যে, জিনের ব্যাপারে তারা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তাই আমি বুদ্ধি করে জিন সেজেছি। এই নরকে আমাদের ন্যায় রূপসী মেয়েদের উপস্থিতিকে তাদের বিবেক মেনে নিতে পারে না। তারা আমাদেরকে হয়তো কাল্পনিক বলে মনে করছে, নয়তো জিন-পরী ভাবছে। আমি তাদের সঙ্গে যে ধারায় কথা বলেছি, তাতে তারা নিশ্চিতভাবে বুঝে নিয়েছে। আমরা পরী। মুসলমান আবেগপ্রবণ জাতি। এটা তাদের দুর্বলতা। বিষয়টা আমার জানা ছিলো। তোমাকে এখনো অনেক কিছু শেখাতে হবে। তাড়াতাড়ি শিখে ফেলল। আমি সাইফুদ্দীনের ন্যায় সুচতুর লোকটাকে আঙ্গুলের ইশারায় নাচিয়ে ছেড়েছি। এরা তো সৈনিক।
জানি না আমি কেন এই বিদ্যায় সফল হতে পারছি না- ছোেট মেয়েটি বললো- আমার অন্তর আমাকে সঙ্গ দেয় না। তোমার মতো কৃতিত্ব প্রদর্শনের চেষ্টা তো কম করছি না। কিন্তু হৃদয় থেকে আওয়াজ আসে, এটা প্রতারণা।
তাহলে তুমি পুরুষদের হাতের খেলনা-ই হয়ে থাকবে- বড় মেয়েটি বললো- তুমি এই প্রথমবার বাইরে বের হয়েছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি সফল হচ্ছে না। এমন হলে তোমাকে পুরুষদের গণিকা হয়েই থাকতে হবে। এভাবে তুমি ক্রুশের কোন সেবা করতে পারবে না। নিজের শরীরটাকে তুমি সময়ের অনেক আগে বৃদ্ধ বানিয়ে ফেলবে আর এই পুরুষরা তোমাকে বাইরে ছুঁড়ে মারবে। আমাদের উদ্দেশ্য এই নয় যে, আমরা মুসলিম আমীর ও শাসকদের বিনোদনের উপকরণ হয়ে থাকবে। একদিন না একদিন আমাদেরকে জাদু হয়ে তাদের বিবেকের উপর জয়ী হতেই হবে। এই চার সৈনিকের মাঝে তুমি যে কুসংস্কার দেখেছে, তা আমাদের খৃস্টান গুরু এবং ইহুদীরা তাদের মাঝে জন্ম দিয়েছে। তুমি দেখেছো, আমি কতো তাড়াতাড়ি তাদেরকে আমার হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছি। আমি তাদেরকে একটি কথা বলছিলাম। কথাটা আমাকে আমার ওস্তাদ শিক্ষা দিয়েছেন। তাহলে মানুষ একটি আনন্দের সৃষ্টি। আর সবসময় তারা সেই আনন্দ ভোগ করার প্রত্যাশী থাকে। আবার তারা এই কামনাকে দমন করারও চেষ্টা করে থাকে। আমাদের মিশন হলো মুসলমানদের মাঝে এই ভোগলিপ্সা জাগিয়ে তোলা। এটাই মানুষের সেই দুর্বলতা, তাকে ধ্বংসের দুয়ারে পৌঁছিয়ে দেয়। তোমার কি সেই রাতের কথা মনে নেই, যে রাতে সাইফুদ্দীন আমাদের উপস্থিতিতে তার এক সালারকে বলেছিলেন- আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সন্ধি করা যায় কিনা ভাবছি। আমি সেই রাতেই তার মস্তিষ্ক থেকে এই ভাবনা বের করে দিয়েছিলাম।
