এই পরিস্থিতি সুলতান আইউবীকে পেরেশান করে তোলে। তিনি এই নির্দেশসহ দূত পাঠিয়ে দেন যে, রিজার্ভ বাহিনী যেনো পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। ডান বাহুর বিন্যাস বেকার হয়ে পড়ে। মুজাফফর উদ্দীন লড়াই করছে আইউবীরই শেখানো কৌশল অনুপাতে। তবে তার দুর্বলতা হলো, পেছন থেকে তার সাহায্যের কোন ব্যবস্থা নেই। সুলতান আইউবী দূতদের মাধ্যমে তার কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদেরকে ডান ও বাম দিকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। যখন তার রিজার্ভ বাহিনী পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে, মুজাফফর উদ্দীন বেকায়দায় পড়ে যান। এবার তার হেডকোয়ার্টারই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। কিন্তু তারপরও তিনি পালাবার চিন্তা করেননি।
ঐতিহাসিকদের মতে, বিকাল পর্যন্ত উভয় বাহিনীর যে লড়াই অব্যাহত থাকে, তা ছিলো অত্যন্ত তীব্র ও অতিশয় রক্তক্ষয়ী। কমান্ড সুলতান আইউবীর হাতে ছিলো। অন্যথায় ফলাফল ভিন্ন রকম হতো। এই যুদ্ধে মুজাফফর উদ্দীন যে দক্ষতা ও সাহসিকতার প্রমাণ দেন, তাতে সুলতান আইউবী তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে গুরুর কাছে শিষ্য হার মানতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সুলতান আইউবী তার একটি বিশেষ অশ্বারোহী বাহিনী দ্বারা আক্রমণ করান। তাতে মুজাফফর উদ্দীনের অবস্থান অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। টিকতে না পেরে তিনি পেছনে সরে যান। তার বহু সৈন্য সুলতান আইউবীর হাতে বন্দী হয়। মুজাফফর উদ্দীনের সামরিক উপদেষ্টা ফখরুদ্দীনও বন্দী হয়।
ফখরুদ্দীন সাধারণ কোনো লোক নয়। সাইফুদ্দীনের মন্ত্রী ছিলো। তুমানের যুদ্ধে সাইফুদ্দীন পালিয়ে গেলে ফখরুদ্দীন মুজাফফর উদ্দীনের নিকট চলে যায় এবং সুলতান আইউবীর উপর হামলা করার জন্য তাকে প্ররোচিত করে।
ঘটনাটা ৫৭১ হিজরী মোতাবেক ১১৭৪ সালের। এই যুদ্ধে মুজাফফর উদ্দীন পরাজয়বরণ করেন এবং সুলতান আইউবী তার মুসলমান দুশমনদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। কিন্তু সুলতান আইউবীরও এতো বেশি ক্ষতি সাধিত হয়েছিলো যে, পরবর্তী দুই মাস পর্যন্ত তিনি তুকমান থেকে নড়ার শক্তি পাননি। তাঁর ডান বাহু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলো, যেনো তাঁর নিজের বাহু অবশ হয়ে গেছে। তার নিকট নতুন ভর্তি আসছিলো। কিন্তু এখনই তাদের নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিলো না। তিনি সেদিনই দামেস্ক ও মিশর দূত প্রেরণ করে নতুন সৈন্য তলব করেন। ক্ষতিটা যদি এতো বেশি না হতো, তাহলে তিনি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে হাব, মসুল ও হাররানের উপর আক্রমণ করে তাঁর যেসব মুসলমান দুশমন ফিলিস্তিনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছিলো, তাদেরকে হয়তো সুপথে ফিরিয়ে আনতেন, নতুবা খতম করে দিতেন।
এটা আমার বিজয় নয়- যুদ্ধের পর সুলতান আইউবী তাঁর সালারদের উদ্দেশে বললেন- এটা খৃস্টানদের বিজয়। তারা আমাকে দুর্বল করতে চাচ্ছিলো। এই লক্ষ্যে তারা সফল হয়েছে। তারা আমাদের অগ্রযাত্রার গতি শ্লথ করে ফিলিস্তিনের উপর তাদের কজা আরো দীর্ঘতর করে নিলো। আমাদের এই মুসলমান ভাইয়েরা কবে বুঝবে যে, কাফেররা তাদের বন্ধু হতে পারে না এবং তাদের বন্ধুত্বের আড়ালেও শত্রুতা লুকায়িত থাকে। ইতিহাস লেখকরা আমাদের অনাগত বংশধরদের আমাদের এই পারস্পারিক সংঘাতকে কোন্ ভাষায় বুঝাবে, তা আমার জানা নেই।
***
আসিয়াত ও তুর্কমানের মধ্যবর্তী সেই নরকসম এলাকায়, যেখানে সুলতান আইউবীর চারজন কমান্ডো সেনা পথ ভুলে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছিলো, সেখানে এখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। কমান্ডার আন-নাসের চোখ খোলে। সে শোয়া থেকে উঠে বসে। মেয়ে দুটো জেগে আছে। এবার আন-নাসের-এর মনে ভয় ধরে যায়। মেয়েরা তাকে অভয়বাণী শুনিয়েছিলো। আর সে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
ওদেরকে জাগাও- বড় মেয়েটি বললো- আমাদেরকে বহু দূর যেতে হবে।
আমাদেরকে পথে তুলে দিয়ে যাবে তো? আন-নাসের জিজ্ঞেস করে।
তোমরা সবাই আমাদের সঙ্গে যাবে- মেয়েটি জবাব দেয়- আমাদের ছাড়া তোমরা গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না।
আন-নাসের তার সঙ্গীদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। বড় মেয়েটি ছোট মেয়েটিকে কি যেন বললো। সে উঠে অপর একটি ঘোড়ার সঙ্গে বাঁধা থলে থেকে কি যেনো বের করে। তারপর পানির মশক খুলে আনে। মশকের মুখ খুলে থলের বস্তুগুলো মশকের মধ্যে ফেলে দেয়। তারপর নাড়া দিয়ে মশকটি আন-নাসেরের হাতে দিয়ে বললো- পানি পান করে নাও; গন্তব্যে পৌঁছার আগে পানি না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা পানি পান করে। বড় মেয়েটি তাদের প্রত্যেককে কিছু খাবার খেতে দেয়। পরে মেয়েরা থলে থেকে মশকটিকে ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে রাখে। সূর্য নীচের দিকে নামতে থাকে।
তোমরা এই স্থানটিকে জাহান্নাম বলেছিলে- আন-নাসের উচ্চস্বরে বলে ওঠে- আমি তো এখানে সবুজ-শ্যামলিমা দেখতে পাচ্ছি। তোমরা এতো তাড়াতাড়ি আমাদেরকে এখানে কিভাবে পৌঁছিয়ে দিলে?
আন-নাসেরের তিন সঙ্গী বিস্মিত নয়নে এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত করছে।
তোমরাও কি সবুজ-শ্যামলিমা দেখতে পাচ্ছ? বড় মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
আমরা সবুজের মাঝে বসে আছি- একজন বললো।
তোমরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে না তো? তোমরা তো পরী! অপর একজন বললো।
না- মেয়েটি মুচকি হেসে বললো- আমরা তোমাদেরকে এর চেয়েও সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।
