সুলতান আইউবী ঘোড়ায় আরোহন করেন। তার রক্ষী বাহিনীর বারজন সেনা তার পেছনে রওনা দেয়। তারাও অশ্বারোহী। তিনি আধা ডজন দ্রুতগামী অশ্বারোহী দূতও সঙ্গে নিয়ে নেন। সাথে আছে দুজন সালারও। ঘোড়া হাঁকিয়ে তিনি এমন একটি টিলার উপর আরোহন করেন, যেখান থেকে তার বাহিনীর ডান পার্শ্বের সম্মুখের এলাকা ও তার বাহিনীকে দেখা যায়। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে তিনি টিলার উপর থেকে অবতরণ করে ডান পার্শ্বের বাহিনীগুলোর কমান্ডারদের নির্দেশ দেন। আরোহীদেরকে ঘোড়ায় আরোহন করাও। পদাতিকদের মধ্যে যারা তীরন্দাজ, তাদেরকে সম্মুখস্থ অঞ্চলের খানা-খন্দকে ও উঁচু পাথরের আড়ালে গিয়ে মোর্চা তৈরি করতে বলো।
এখন থেকে ডান পার্শ্বের সবকটা ইউনিটের সর্বোচ্চ কমান্ড আমার হাতে থাকবে- সুলতান আইউবী তার কমান্ডার ও নায়েব সালারদের বললেন –যার যার দূতকে সঙ্গে রাখো এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।
মুজাফফর উদ্দীনের বাহিনী এখানো এতো নিকটে এসে পৌঁছায়নি যে, তারা সুলতান আইউবীর বাহিনীর তৎপরতা দেখতে পাবে।
***
মুজাফফর উদ্দীনের অশ্বারোহী বাহিনী আক্রমণ করে। কিন্তু যেইমাত্র তার প্রথম অশ্বারোহী ইউনিটটি সুলতান আইউবীর বাহিনীর সম্মুখস্থ এলাকায় এসে পৌঁছে, সঙ্গে সঙ্গে তার সেনানিবাস লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এলাকাটা অসংখ্য খাদ আর স্তূপের ন্যায় পাথর খণ্ডে পরিপূর্ণ। এসব খানা-খন্দকেই সুলতান আইউবীর তীরন্দাজরা বসে আছে। মুজাফফর উদ্দীনের বাহিনী এসে পৌঁছামাত্র উপর দিয়ে অতিক্রমকারী ধাবমান ঘোড়র উপর তীর ছুঁড়তে শুরু করে। তীরের আঘাত খেয়ে আরোহীরা ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যেতে আরম্ভ করে। যখনই যে ঘোড়র গায়ে তীর বিদ্ধ হচ্ছে, সেটি বেশামাল হয়ে এদিক ওদিক ছুটতে শুরু করে। সাধারণত এমনটি যে কোনো যুদ্ধেই হয়ে থাকে। মুজাফফর উদ্দীনের জন্য এই পরিস্থিতি বিস্ময়কর কোনো ঘটনা নয়। তার অস্থিরতার কারণ হচ্ছে, তার আশা ছিলো, তিনি সুলতান আইউবীর অজান্তে ও অলক্ষ্যে হামলা করবেন। কিন্তু তার সেই আকাঙ্খর বিপরীতে আইউবীর ডান বাহুর সৈন্যরা সচেতন এবং মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত। এই সংঘাতে সুলতান আইউবীর অসংখ্য তীরন্দাজ ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। সৈন্যদের এই ত্যাগের বিনিময়ে সুলতান আইউবীর উপকার এই হলো যে, মুজাফফর উদ্দীনের আক্রমণের তীব্রতা শেষ হয়ে গেছে। এরপর তিনি স্থির হয়ে লড়াই করতে পারবেন। মুজাফফর উদ্দীন যে আশা নিয়ে ময়দানে এসেছিলো, তা পূর্ণ হবে না। তার আশা ছিলো তিনি সুলতান আইউবীর উপর অতর্কিত হামলা চালাবেন এবং আইউবীকে তার কৌশলের ফাঁদে ফেলে পরাস্ত করবেন। কিন্তু তিনি যতোই কুশলী হোন, আইউবী তাঁর ওস্তাদ। ওস্তাদের বিদ্যার কাছে ছাত্রের বিদ্যা হার মানতে বাধ্য। সুলতান আইউবীর নিকট আসার পর মুজাফফর উদ্দীনের বিদ্যা ও কৌশল প্রথমবারের মতো হার মানতে বাধ্য হয়।
সুলতান আইউবীর কিছুসংখ্যক তীরন্দাজ মুজাফফর উদ্দীনের ঘোড়ার পদতলে পড়ে জীবন কুরবান করে দেয়। তাদের এই কুরবানীতে সুলতান আইউবী লাভবান হন। মুজাফফর উদ্দীনের আক্রমণকারী বাহিনী কিছুসংখ্যক ঘোড়া ও তাদের আরোহীদের নিহত ফেলে সম্মুখে এগিয়ে যায়। সম্মুখে সুলতান আইউবী স্বয়ং। আক্রমণকারীদের বিস্তার দেখে সে অনুপাতে নিজ সৈন্যদের নির্দেশ প্রদান করেন। আক্রমণকারী বাহিনী নিকটে এসে পৌঁছলে সুলতান আইউবীর বাম বাহুর অশ্বারোহী সৈন্যরা তাদের ঘোড়াগুলোকে বামদিকে ঘুরিয়ে ছুটতে শুরু করে। ডান বাহুর অশ্বারোহী সৈন্যরাও তা-ই করে। এখন আক্রমণকারীদের সম্মুখে কোনো প্রতিপক্ষ নেই। তাদের প্রতিপক্ষ ডান ও বামদিকে পালিয়ে গেছে।
আক্রমণকারীদের কিছু ঘোড়া ডানদিকে মোড় নেয়। কিছু বামদিকে। অধিকাংশ সৈন্য নাক বরাবর চলে আসে। এখন আক্রমণকারী বাহিনীর পার্শ্বে আইউবীর সৈন্যদের সম্মুখে তারা প্রবলবেগে ঘোড়া হাঁকায় এবং উভয় দিক থেকে ক্ষীপ্র গতিতে হামলা করে বসে। আক্রমণটা এতোই,তীব্র ও কার্যকর প্রমাণিত হয় যে, তাদের একটি বর্শার আঘাতও ব্যর্থ হয়নি। আক্রমণকারীরা তো সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। পার্শ্ব বাহিনীকে হেফাজত করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সামনের দিকে চলে যেতে পারলেই তারা নিষ্কৃতি পায়। সামনে দেড় হাজার কবরের গর্ত। আক্রমণকারীদের পেছনে পেছনে সুলতান আইউবীর অশ্বারোহী বাহিনী ধেয়ে আসছে। পেছনের ধাওয়া খেয়ে আক্রমণকারীদের ঘোড়া উন্মুক্ত কবরগুলোর উপর দিয়ে অতিক্রম করতে শুরু করে।
মুজাফফর উদ্দীন ভয় পাওয়ার মতো সেনাপতি নন। প্রথম আক্রমণটা স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা করিয়ে তিনি রণাঙ্গনের ভাবটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। পরিস্থিতিটা বুঝে এবার তিনি সৈন্যের স্রোত ছেড়ে দেন। সুলতান আইউবীর সৈন্যরা খোঁড়া কবরগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। তারা সুলতান আইউবীর দ্বিতীয় নির্দেশ বাস্তবায়ন শুরু করলো বলে, অমনি মুজাফফর উদ্দীনের দ্বিতীয় ইউনিটটি তাদের মাথার উপর এসে পড়ে। তারা আত্মসংবরণ করতেই শত্রু বাহিনীর পেছন দিক থেকে প্রবল বেগে হামলা করে বসে। এই আক্রমণে সুলতান আইউবীর সৈন্যদের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। কয়েকজন অশ্বারোহী সামনের দিকে পালিয়ে যায় এবং তাদের ঘোড়াগুলো কবরের গর্তে পড়ে যায়। পরক্ষণেই মুজাফফর উদ্দীন ডানদিক থেকেও আক্রমণ করে বসে।
