কার শিষ্য?- মুজাফফর উদ্দীন জিজ্ঞেস করেন- আলী বিন সুফিয়ানের, নাকি হাসান ইবনে আব্দুল্লাহর?
আমি এদের একজনকেও চিনি না। ধৃত ব্যক্তি জবাব দেয়।
আমি দুজনকেই জানি- মুজাফফর উদ্দীন বললেন- আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর শিষ্য। ওস্তাদ তার শিষ্যকে ধোকা দিতে পারে না।
আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকেও চিনি না, আপনি কে তাও জানি না। ধৃত ব্যক্তি জবাব দেয়।
শোনো হতভাগ্য বন্ধু!- মুজাফফর উদ্দীন তার কাঁধে হাত রেখে বললেন- আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করবো না। আমি এ কথাও বলবো না, তুমি অযোগ্য বা অকর্ম। তুমি বেশ দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। ধরা পড়া কোনো দোষের নয়। তোমার জন্য দুর্ভাগ্য যে, তোমার সঙ্গী তোমারই হাতে খুন হলো। তুমি আমাকে শুধু এটুকু বলল, এ পথে তোমার আর কোনো সঙ্গী ছিলো কিনা এবং সালাহুদ্দীন আইউবীকে সংবাদ দিয়েছে কিনা যে, এখানে ফৌজ আছে? আর বলল, তোমাদের ফৌজের বিন্যাস কিরূপ এবং বাহিনী কোথায় কোথায় আছো তুমি আমার এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও। আমি তোমাদের কুরআনের নামে ওয়াদা দিচ্ছি, যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্র তোমাকে মুক্তি দেবো। আর সে পর্যন্ত তোমাকে সম্মানের সাথে রাখবো।
আপনার শপথে আমার কোনো আস্থা নেই- ধৃত ব্যক্তি জবাব দেয় কারণ, আপনি কুরআন থেকে সরে এসেছেন।
কেন, আমি কি মুসলমান নই মুজাফফর উদ্দীন ধৈর্যের সাথে জিজ্ঞেস করেন।
আপনি মুসলমান নিশ্চয়ই- ধৃত ব্যক্তি জবাব দেয়- তবে আপনি কুরআনের নয়, ক্রশের অফাদার।
তুমি আমাকে অপমান করছো- মুজাফফর উদ্দীন বললেন- কিন্তু একটি শর্তে আমি এই অপমান সয়ে নেবো যে, আমি যা জানতে চেয়েছি, বলে দাও। তোমার জীবন এখন আমার হাতে।
আল্লাহর হাত থেকে আপনি আমার জীবন ছিনিয়ে নিতে পারবেন না ধৃত ব্যক্তি বললো- আপনি তো জানেন, আমাদের প্রত্যেক সৈন্য নিজেদের জীবন আল্লাহর হাতে তুলে দিয়ে যুদ্ধ করে। আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি, আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর এবং আমার সঙ্গীও গুপ্তচর ছিলো। আপনার আর কোনো প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো না। আমি জীবিত আছি। আপনি আমার গায়ের চামড়া তুলে ফেলুন। তারপরও আমার মুখ থেকে আপনার কাঙ্খিত প্রশ্নগুলোর উত্তর বের হবে না। আমি আপনাকে এও বলে রাখছি, পরাজয় আপনারই কপালে লিবিদ্ধ হয়ে আছে।
লোকটার পায়ের সঙ্গে রশি বেঁধে ঐ গাছটার সঙ্গে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখো। মুজাফফর উদ্দীন একটি গাছের দিকে ইশারা করে নির্দেশ দিয়ে আপন তাঁবুতে ফিরে যান।
***
তারা দু-জন তো এখনো আসলো না- হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলছিলেন- ওদের তো ধরা পড়ার কোন আশংকা ছিলো না। এখানে আমাদের গুপ্তচরদের ধরার মতো কারা আছে। তাদের বেশি দূরেও তো যাওয়ার কথা ছিলো না।
হয়তো বা তারা ধরা পড়ে গেছে- সুলতান আইউবী বললেন- যখন তারা সকালে গিয়ে সন্ধ্যার পরও এসে পৌঁছলো না, তো তারা ধরাই পড়ে গেছে। তাদের না আসাই প্রমাণ করে, এখানে ধরার মতো লোফ আছে। রাতে আরো কিছু লোক পাঠিয়ে দাও। তারা আরো খানিক দূরে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে আসুক।
সুলতান আইউবী ও হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ সেই দুই গুপ্তচরের কথাই বলছিলেন। আইউবী সবসময় তার গোয়েন্দা ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেছেন এবং এই ব্যবস্থারই দিক-নির্দেশনায় দুশমনকে নাকাকি-চুবানি খাইয়েছেন। কিন্তু এবার তার সেই ব্যবস্থা ব্যর্থ হতে চলেছে। কারণ হচ্ছে, এখানকার যুদ্ধে তার প্রতিপক্ষ তারই শিষ্য মুজাফফর উদ্দীন। গত রাতে তুৰ্কৰ্মনের কিছু দূরে এক বিজন এলাকায় আইউবীর এক গোয়েন্দার লাশ পাওয়া গেছে। তার পাজরে তীর গাঁথা ছিলো। মুজাফফর উদ্দীন তার নায়েব সালারদের বলেছিলেন- তোমরা যদি সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারো, তাহলে তিনি অন্ধ ও বধির হয়ে যাবেন। তারপর তোমরা তাকে পরাজিত করার কথা ভাবতে পারবে।
এখন আবার তার দুজন গোয়েন্দা নিখোঁজ হয়ে গেলো। এ দুটি ঘটনাকে সুলতান অবহেলা করতে পারেন না। তার নির্দেশে হাসান ইবনে আব্দুল্লাহ ছয়জন কমান্ডো গোয়েন্দা রওনা করিয়ে দেন।
রাতের শেষ প্রহর। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ফজরের আযানের প্রথম ধ্বনি আল্লাহু আকবার ধ্বনিত হওয়ামাত্র সুলতান আইউবীর চোখ খুলে যায়। তিনি তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে আসেন। খাদেম প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁর তাঁবুর সম্মুখে রেখে দেয়। ওদিক থেকে এক আরোহী ঘোড়া হাঁকিয়ে এগিয়ে আসে। লোকটি সুলতানের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে ঘোড়া থেকে অবতরণ করে বললো সুলতানের মর্যাদা বুলন্দ থোক। আপনার বাহিনীর ডান পার্শ্ব যে স্থানে অবস্থান করছে, তার সম্মুখে অন্য কোনো বাহিনীর পদচারণা লক্ষ্য করা গেছে। খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য দুজন লোক এগিয়ে গিয়েছিলো। তারা তথ্য নিয়ে এসেছে যে, বাহিনী আসছে।
সুলতান আইউবী তার কেন্দ্রীয় কমান্ডের সালারদের নাম উল্লেখ করে বললেন, ওদেরকে ডেকে আনো। তিনি তায়াম্মুম করেন। তার কাছে অজু করার মতো সময় নেই। তারপর জায়নামায বিছানোনা ছাড়াই কেবলামুখী হয়ে সেখানেই নামায আদায় করেন। শেষে সংক্ষিপ্ত দুআ করে ঘোড়া তলব করেন।
এই বাহিনী মুজাফফর উদ্দীন ছাড়া আর কারো হতে পারে না সুলতান আইউবী তার সালারদের বললেন- এরা খৃস্টান হতে পারে না। এই তথ্য যদি সত্য না হয় যে, দুশমন আমাদের ডান পার্শ্বের বাহিনীর সমুখ দিক থেকে আসছে, তাহলে হামলাটা হবে দুতরফা। আমাদের কোনো ইউনিটকে পিছু হটতে দেয়া যাবে না। পেছনে দেড় হাজার কবরের গর্ত। এখানো সব লাশ দাফন করা হয়নি। অন্যথায় এইসব গর্ত আমাদের অশ্বারোহীদের কবরে পরিণত হবে।
