এরাই প্রথম পথচারী, যাদেরকে মুজাফফর উদ্দীনের নির্দেশে আটক কর হলো। তাদেরকে দুজন সিপাহীর হাতে তুলে দেয়া হলো। তারা তাদের তাঁবুতে অবস্থান করবে।
মধ্যরাত। ধৃত পথিকদের পাহারাদার সিপাহীদ্বয় ঘুমিয়ে পড়েছে। সাদ দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ জেগে আছে। তাঁবুতে কোন আলো নেই। বৃদ্ধ নাক ডাকা শব্দ পেয়ে বুঝে ফেলে সিপাহী ঘুমিয়ে পড়েছে। সে তার সঙ্গীকে চিমটি মারে। দুজন শুয়ে শুয়েই দরজার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দরজার নিকট পৌঁছেই তারা দাঁড়িয়ে যায় এবং বেরিয়ে পড়ে। বাইরে পিনপতন নীরবতা। তারা পালাতে শুরু করে। তাঁবু থেকে খানিক দূরে পৌঁছে বৃদ্ধ তার সঙ্গীকে বললো- তুমি আমার থেকে আলাদা হয়ে যাও এবং অন্য এক দিক দিয়ে ছাউনি এলাকা থেকে বেরিয়ে যাও।
দুজন আলাদা হয়ে যায়। তাদের ধারণা ছিলো, সমগ্র ক্যাম্পই ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু এই ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়নি। প্রহরী জেগে আছে। এক প্রহরী অন্ধকারে ছায়ার নড়াচড়া দেখে কিছু না বলে ছায়ার পিছু ছুটতে শুরু করে।
লোকটি বৃদ্ধ পথিক। প্রহরীকে দেখে সে একস্থানে লুকিয়ে যায়। প্রহরী এগিয়ে এসে তাকে খুঁজতে শুরু করে। সেই জায়গায় কিছু মালামাল ছিলো। বৃদ্ধ তারই আড়ালে লুকিয়ে থাকে। পরে অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে পা টিপে টিপে বেরিয়ে পড়ে।
তেমনি অপর এক প্রহরী বৃদ্ধের সঙ্গীকে দেখে ফেলে। গোয়েন্দাদের উপর কঠোর দৃষ্টি রাখার এবং গ্রেফতার করার কঠোর নির্দেশ মুজাফফর উদ্দীনের। তিনি জানেন, সুলতান আইউবীর গুপ্তচররা অত্যন্ত চৌকস ও তীব্র গতিসম্পন্ন। তাই মুজাফফর উদ্দীনের এই প্রহরীদ্বয় কর্তব্য পালনে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। উভয়ে চুপচাপ আপন আপন শিকার ধরার জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
বৃদ্ধের সঙ্গীও চুপ হয়ে আছে। এদিকে বৃদ্ধ এক প্রহরীর সঙ্গে কানামাছি খেলে বেড়াচ্ছে। খানিক পর বৃদ্ধ অপর এক জায়গায় লুকিয়ে যায়। প্রহরী তার পেছন পেছন আসছে। বোকা প্রহরী তার বৃদ্ধ শিকারকে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। বৃদ্ধ খঞ্জর হাতে নেয়। নিজের মুক্তির জন্য খঞ্জরাঘাতে প্রহরীকে খতম করার পরিকল্পনা করে। সে উঠে দাঁড়ায়। আঘাত হেনে পালাবে কোন্ পথে ভাবছে মাত্র। ঠিক এমন সময় হঠাৎ এক ব্যক্তি তার নিকটে এসে দাঁড়িয়ে যায়। মুহূর্ত বিলম্ব না করে বৃদ্ধ খঞ্জরটা তারই হৃদপিণ্ডে সেঁধে দেয়। পরক্ষণেই দ্বিতীয় আঘাত হানে। লোকটি ক্ষীণ একটি শব্দ করেই নীরব হয়ে লুটিয়ে পড়ে।
বৃদ্ধ সেখান থেকে পালাবার পথ খুঁজছে। কিন্তু অকস্মাৎ কে একজন পেছন থেকে তাকে ঝাঁপটে ধরে। বৃদ্ধ নিজেকে ছাড়াবার জন্য সজোরে এমন ঝটকা টান মারে যে, লোকটি পড়ে যায়। নিজে দ্রুত পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু দৌড়াতে গিয়ে কি একটা বস্তুর সঙ্গে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। বৃদ্ধ যাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে এসেছে, সে উঠে দাঁড়ায়। সে দ্রুত ছুটে এসে আবারো বৃদ্ধকে ঝাঁপটে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে ডাক-চিৎকার শুরু করে দেয়। সাথে সাথে কয়েকটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে। তিন-চারজন প্রহরী ছুটে আসে। তারা প্রদীপের আলোতে দেখতে পায়, তাদের শিকার একজন শশ্রুমণ্ডিত বয়োঃবৃদ্ধ। কিন্তু তাদের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য লোকটি এমন শক্তি প্রদর্শন করছে, যা এই বয়সে তার মধ্যে থাকার কথা নয়। প্রহরীদের কবল থেকে মুক্ত হতে সক্ষম হয়নি। ধস্তাধস্তির ফলে তার মুখে সাদা দাড়ি উপড়ে যায়। সকলে দেখতে পায় তার মুখমণ্ডলে খোঁচা খোঁচা কালো দাড়ি। লোকটি বলিষ্ঠ নওজোয়ান। সাদা দাড়ি কৃত্রিম। শুভ্র শশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ এখন টগবগে যুবক।
এই যুবক যে স্থানে খঞ্জরের আঘাতে এক প্রহরীকে হত্যা করে এসেছে, ধরে তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রদীপের আলোতে সবাই দেখলো, নিহত লোকটি মুজাফফর উদ্দীনের প্রহরী নয়- হত্যাকারী যুবকেরই সঙ্গী। মুখোশধারী বৃদ্ধ প্রহরী মনে করে তারই সঙ্গীকে খুন করে ফেলেছে। তারা দুজন আলাদা আলাদাভাবে ক্যাম্প থেকে পালাবার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু প্রহরীরা তাদেরকে দেখে ফেলেছে। প্রহরীদের ধাওয়া থেকে নিষ্কৃতি লাভের আশায় ঘটনাক্রমে একত্র হয়ে গিয়েছিলো। বৃদ্ধ তারই সঙ্গীকে প্রহরী মনে করে খঞ্জর দ্বারা আঘাত হানে। পরপর দুটি আঘাতে যুবক প্রাণ হারায়।
লাশের অনুসন্ধান নেয়া হলো। তার পোশাকের ভেতর থেকে খঞ্জর বেরিয়ে আসে। তাদের উটের পিঠে যে বোঝাটি ছিলো, সেটি খোলা হলো। তাতে কোন মালপত্র নেই। বস্তার ভেতরে ঘাস ভরে রাখা আছে।
ধৃত ব্যক্তিকে এক নায়েব সালারের তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। নায়েব সালার ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। তিনি লোকটিকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না। তার মুখের কৃত্রিম সাদা দাড়িগুলো নায়েব সালারকে দেখানো হলো। এ ব্যাপারেও সে কোনো মন্তব্য করলো না। কিন্তু এটা তো একটা জ্বলন্ত প্রমাণ, যা সে অস্বীকার করতে পারে না। তাকে বলা হলো, তুমি স্বীকার করো- তুমি এবং তোমার সঙ্গী সুলতান আইউবীর গুপ্তচর। কিন্তু এই অভিযোগ স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায় সে। তাকে বেদম প্রহার করা হলো। তাকে অস্থির করে তোলা হলো। তারপরও সে স্বীকার করলো না সে গুপ্তচর। রাত কেটে যায়। সকালে তাকে মুজাফফর উদ্দীনের নিকট নিয়ে যাওয়া হলো এবং তাকে রাতের ঘটনা শোনানো হলো। তার কৃত্রিম দাড়ি এবং সামানপত্রও মুজাফফর উদ্দীনের সম্মুখে রাখা হলো।
