রণাঙ্গন থেকে দু-আড়াই মাইল দূরে বন ও টিলা পরিবেষ্টিত সমতল ভূমি। সেখানকার তাঁবুতে বসে মুজাফফর উদ্দীন সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন। বেশ কর্মব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন তিনি। ইত্যবসরে নায়েব সালার এক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে তাবুতে প্রবেশ করে।
নতুন কোনো খবর আছে? মুজাফফর উদ্দীন জিজ্ঞেস করে।
সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনীতে কোন পরিবর্তন আসেনি- নায়েব সালার বললো- বিস্তারিত এর থেকে শুনুন। এ সবকিছু দেখে এসেছে।
গুপ্তচর বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী এখনো আমাদের পালিয়ে যাওয়া বাহিনীর পরিত্যক্ত সামানপত্র আহরণ করেনি। শুধু তাদের নিহত ও আহতদের তুলে নিয়েছে। তাদের লাশের সঙ্গে আমাদের লাশগুলোও ভিন্ন ভিন্ন কবরে দাফন করছে।
মৃতদের নয়- জীবিতদের সংবাদ বলো- মুজাফফর উদ্দীন বললেন আইউবী কি তার বাহিনীতে কোনো রদবদল করেছেন। তার ডান বাহু সেখানেই আছে, নাকি এদিক-ওদিক হয়ে গেছে?
মহামান্য সালার!- গুপ্তচর বললো- আমি সাধারণ সৈনিক নই। আমি আপনাকে যে রিপোর্ট প্রদান করছি, তা কিছু একটা বুঝে-শুনেই দিচ্ছি। আপনাকে সন্তুষ্ট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি আপনার অসন্তোষকেও ভয় করি না। আমার উদ্দেশ্য ঠিক আপনারই ন্যায় যে, সুলতান আইউবীর বিজয়কে পরাজয়ে পরিণত করতে হবে। আপনি খুব তাড়াহুড়ার মধ্যে আছেন বলে মনে হচ্ছে। তাড়াতাড়িই করতে হবে। তবে আপাতত অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত থাকুন। আমি যা বলছি, বলতে দিন। আমি জানি, আপনার দৃষ্টি সুলতান আইউবীর ডান পার্শ্বের উপর নিবদ্ধ। আপনার এই টার্গেট সঠিক। কিন্তু এই ডান পার্শ্বের উপর হামলা চালালে আইউবী তার অন্যান্য অংশগুলোকে কিভাবে কাজে লাগাবে, আমি তাও পর্যবেক্ষণ করে দেখে এসেছি।
তিনি আমাদেরকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করবেন- মুজাফফর উদ্দীন বললেন- ঘেরাও বিস্তৃত রাখবেন। আমাদেরকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরে ধীরে ধীরে ঘেরাও ছোট করে ফেলবেন। আমি তার কৌশল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি।
সালাহুদ্দীন আইউবী যে ইউনিটগুলো দ্বারা আমাদের কাবের উপর আক্রমণ করে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তাদেরকে গুটিয়ে নিয়ে সম্মুখের বাহিনীর এক ক্রোশ দূরে প্রস্তুত রেখেছেন। আপনি ঠিকই ধরেছেন যে, আইউবী আমাদের আক্রমণকারী বাহিনীকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করবেন। সুলতান আইউবীর ডান বাহু যে স্থানটিতে অবস্থিত, তার থেকে এক-দেড় ক্রোশ পেছনে আমাদের ও আইউবীর সৈন্যদের জন্য কবর খনন করা হয়েছে। তার সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার হবে- দেড় হাজার গর্ত। আপনি তো জানেন, কবরের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা কতটুকু হয়ে থাকে। আপনি এমন একদিক থেকে হামলা করবেন, যাতে আইউবীর বাহিনী পিছনে সরে যেতে বাধ্য হয়। আপনি তাদেরকে কবরগুলোর নিকটে নিয়ে যাবেন। হাতাহাতি লড়াই করার পরিবর্তে কবরের নিকট চলে যেতে বাধ্য করবেন। আপনি কল্পনা করতে পারবেন না, ঘোড়া উন্মুক্ত করে কিভাবে নিক্ষিপ্ত হবে।
আইউবীর ডান বাহুর শক্তি কতটুকু এবং কী প্রকৃতির? মুজাফফর উদ্দীন জিজ্ঞেস করে।
অন্তত এক হাজার অশ্বারোহী এবং দেড় হাজার পদাতিক- গুপ্তচর কমান্ডার উত্তর দেয়- এই বাহিনী প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। আপনি তাদেরকে তাদের অজান্তে হামলা করতে পারবেন না। সে মুজাফফর উদ্দীনের সম্মুখস্থ নকশাটির এক স্থানে আঙ্গুল রেখে বললো- এই হলো দুশমনের (আইউবীর) ডান বাহু। আমার অনুমান যদি ঠিক হয়, তাহলে এর বিস্তৃতি আটশ কদম। তার সম্মুখের জমি খানাখন্দকে পরিপূর্ণ। ডানের এলাকা সমতল ও পরিচ্ছন্ন আক্রমণের জন্য এই পথটি উপযুক্ত মনে হয়। কিন্তু হামলা করতে হবে সন্ধু থেকে। তাহলে দুশমন পেছনে সরে যেতে বাধ্য হবে।
আমার আক্রমণ সামনের পরিত্যক্ত রাস্তা থেকেও হবে, ডানদিকে থেকে পরিচ্ছন্ন রাস্তা থেকেও- মুজাফফর উদ্দীন বললেন- আমি কবরের গর্ত এক মাটির স্তূপকেই কাজে লাগাবো। তিনি তার নায়েব সালারদের বললেন- বে কোনো স্থানে কাউকে পেলে ধরে নিয়ে আসবে। এই অঞ্চল এখন যুদ্ধকবলিত। এদিক থেকে কোনো পথিক পথ অতিক্রম করবে না। এই পথে সে-ই পা রাখবে, যে কোনো না কোনো পক্ষের গুপ্তচর।
দু-জন পথিক। বোধ হয় তারা জানে না, এই অঞ্চলটা এখন যুদ্ধকবলিত। একজন উটের পিঠে সাওয়ার পাকা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ। উটের উপর কিছু মালপত্রও বোঝাই করা। অপরজনের হাতে উটের লাগাম। দুজনেরই পরনে সাদাসিধে পোশাক। তারা সেই পথে অতিক্রম করছে, যেখান থেকে মুজাফফর উদ্দীনের লুকিয়ে থাকা সৈন্যদের দেখা যাচ্ছে। এক সিপাহী তাদের ডাক দেয়। তারা থামেনি। তাদের গতি আরো তীব্র হতে থাকে। মুজাফফর বাহিনীর এক অশ্বারোহী তাদের পিছু নিলে তারা দাঁড়িয়ে যায়। অশ্বারোহী তাদেরকে তার সঙ্গে যেতে বলে।
আমরা পথিক- যুবক বলল- আপনাদের তো আমরা কোনো ক্ষতি করছি না। আমাদের যেতে দিন।
এই পথে যেই যাবে, তাকেই ধরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আছে। অশ্বারোহী বললো এবং তাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলো।
ধৃতদের একটি তাঁবুর সম্মুখে দাঁড় করিয়ে তাঁবুতে সংবাদ দেয়া হলো। এক কমান্ডার বেরিয়ে এসে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে- তোমরা কোথা থেকে এসেছো? তাদের উত্তরে কমান্ডার নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। কিন্তু তাদের বলা হলো, তোমাদেরকে সম্মুখে যেতে দেয়া হবে না। তোমাদেরকে বন্দী করব না, সম্মানের সঙ্গে রাখা হবে। তবে কতদিন পর্যন্ত এখানে রাখা হবে। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলো না।
