তোমরা আমাদের সঙ্গ দিলে কেন? আন-নাসের জিজ্ঞেস করে।
আমাদেরকে তিনি প্রেরণ করেছেন, যিনি মরুভূমিতে পথভোলা নেক বান্দাদের পথের দিশা প্রদান করেন- বড় মেয়েটি বললো- খোদা তোমাদের উপর যে রহমত বর্ষণ করেছেন, তোমরা তার হিসাব করতে পারবে না। তিনি আমাদের বলেছেন, মানুষ মৃত্যুর সময়ও শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। শয়তানের এই অপবিত্র কজা থেকে মুক্ত করার জন্য খোদা তোমাদের শাস্তিদান করেছেন। তারপর আমাদের আদেশ করেছেন, এদের সম্মুখে এসে পড়ো এবং এদেরকে আশ্রয় দান করো। আমরা জানতাম, তোমরা দুশমনকে কিভাবে এবং কী পরিমাণ ক্ষতিসাধন করেছে।
তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করলে কেন? আন-নাসের বললো।
এটা দেখার জন্য যে, তুমি কতটা মিথ্যা বলো, আর কতটা সত্য– মেয়েটি বললো- তুমি সত্যবাদী।
আমরা মিথ্যা বলি না- আন-নাসের বললো- গেরিলা সৈনিকরা আল্লাহকে সাক্ষী বানিয়ে থাকে। আমরা নিজ বাহিনী ও সালারদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে থাকি, আল্লাহ আমাদের দেখছেন। আমরা আল্লাহকে ধোকা দিতে পারি না। আন-নার্সের নীরব হয়ে যায় এবং পরক্ষণেই বলে ওঠে- আচ্ছা, আমি যে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের সঙ্গে তোমরা কিরূপ আচরণ করবে, তার তত উত্তর দিলে না।
আমরা যে নির্দেশ লাভ করেছি, তার বিপরীত করতে পারি না- মেয়েটি জবাব দেয়- তোমাদের সঙ্গে আমাদের আচরণ মন্দ হবে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি, তোমাদের মুখ দিয়ে কথা সরছে না। তোমাদের চোখে ক্লান্তি নেমে এসেছে ঠিক; কিন্তু মনের ভয় তোমাদেরকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। অন্তর থেকে সব ভীতি দূর করে ফেলে এবং ঘুমিয়ে পড়ো।
তারপর কী হবে? আন-নাসের জিজ্ঞেস করে।
খোদা যা নির্দেশ করেন- মেয়েটি জবাব দেয়। আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যদি পালাবার চেষ্টা করো, তাহলে এই খুঁটিগুলোর ন্যায় খুঁটিতে পরিণত হয়ে যাবে। তোমরা দূর থেকে এই খুঁটিগুলো দেখে থাকবে। এগুলোর উপরে কোন ছাদ নেই। দেখতে এগুলো মিনারের ন্যায়। কিন্তু আসলে এগুলো মানুষ মানুষ ছিলো। যদি তোমাদেরকে আসল ব্যাপারটা দেখাবার অনুমতি থাকতো, তাহলে বলতাম, এর কোনো একটি মিনারের গায়ে তরবারীর আঘাত হানো, দেখতে তার দেহ থেকে ফিকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে।
ভয়ে আন-নাসের ও তার সঙ্গীদের চোখ কোঠর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়। তাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
এটা হলো পৃথিবীর জাহান্নাম- মেয়েটি বললো- এদিকে সে আসে, যে পথ ভুলে যায় আর আগমন ঘটে তার, যে পথভোলা পথিককে পথ দেখায়। অন্য কাউকে এ পথে দেখা যায় না। তারা হরিণের ন্যায় সুদর্শন প্রাণী কিংবা আমাদের ন্যায় সুন্দরী মেয়ের রূপে এসে পথহারা পথিকের পথের সন্ধান দিয়ে থাকে এবং এই জাহান্নামের কষ্ট থেকে উদ্ধার করে। কিন্তু মানুষ এতোই অসৎ যে, তীর ছুঁড়ে হরিণকে মেরে ফেলে তার গোশত ভক্ষণ করে আর আমাদের মতো নারীদেরকে অসহায় মনে করে ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করার চেষ্টা করে। সে ভুলে যায়, তার জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এখন আর তার কোনো অন্যায় করা উচিত নয়। সে মেয়েদের প্রলোভন দেখায়, আমার সঙ্গে আসো; আমি তোমাকে বিয়ে করবো আর তুমি আমার হেরেমের রাণী হবে। এই মিনার আর খুঁটিগুলো এমনই মানুষ ছিলো। তবে তোমাদেরকে তাদের পরিণতি বরণ করতে হবে না। তোমরা শুয়ে পড়ে। আমাদের দেখে যদি তোমাদের মনে পাপ প্রবণতা জেগে উঠে, তাহলে সেই কামনাকেও ঘুম পাড়িয়ে রাখো। অন্যথায় তোমাদেরও সেই পরিণতি বরণ করতে হবে, যা তোমরা দেখতে পাচ্ছো। মানুষের একটা দুর্বলতা যে, তারা পিতা-মাতার যে আনন্দের মাধ্যমে জন্মলাভ করে, তারই মোহে মোহাবিষ্ট হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষের এই দুর্বলতা বহু সম্প্রদায়ের নাম-চিহ্ন পর্যন্ত মুছে দিয়েছে।
মেয়েটির বলার ভঙ্গিতে যাদুর ক্রিয়া। তাকে এই জগতের মেয়ে বলে মনেই হচ্ছে না। তার বুকে আছে এক পবিত্র বার্তা। আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা অভিভূত হয়ে পড়ে। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় মেয়েটির বক্তব্য শুনতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তারা ঝিমুতে শুরু করে এবং একজন একজন করে মাটিতে শুয়ে পড়ে।
আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। বড় মেয়েটি ছোট মেয়েটির প্রতি তাকায়। দুজনই মুচকি হাসতে থাকে। তারা প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
***
আন-নাসের যেভাবে তার মিশনে সাফল্য অর্জন করেছে, তেমনি তার বাহিনীও তাদের অভিযানে এক আক্রমণেই সফল হয়েছে। কিন্তু সেই সংবাদ আন-নাসেরের জানা নেই। সুলতান আইউবী সম্মিলিত বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন। বাহিনীর প্রধান সেনাপতি সাইফুদ্দীন রণাঙ্গন থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। সুলতান আইউবী এখন তার এক সালার মুজাফফর উদ্দীনের অপেক্ষা করছেন। তাঁর আংশকা মুজাফফর উদ্দীন যদি রণাঙ্গনে থেকে থাকে, তাহলে অবশ্যই সে হামলা চালাবে। বাহিনীর এক-চতুর্থাংশ তার সঙ্গে রয়েছে। সম্মিলিত বাহিনীর এই অংশটি যুদ্ধে অংশ নেয়ার সুযোগই পায়নি। এরা পরাজিত বাহিনীর অক্ষত রিজার্ভ বাহিনী। সুলতান আইউবী তাদের উপস্থিতির সংবাদ নিশ্চিতভাবে জানতেন না। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার আলোকে অনুভব করছিলেন, এখনো সমস্যা রয়েছে। তিনি তার গোয়েন্দাদেরকে রণাঙ্গনের চারদিকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, যাতে কোথাও কোনো ফৌজের সন্ধান পেলে যেনো সঙ্গে সঙ্গে তাকে অবহিত করা হয়।
