আন-নাসেরের নিজের উপরই নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সে অনুভব করছে, নিজের ইচ্ছায় কিছু ভাববার শক্তি তার নেই। তার সঙ্গীদের চেহারায় জীবন ফিরে এসেছে। এটা সেই যৎসামান্য পানির সুফল, যা তাদের দেহে অনুপ্রবেশ করেছে। কিন্তু আন-নাসেরের ন্যায় তাদের উপরও ভীতি চেপে বসেছে। মেয়েগুলো চুপচাপ তাদের প্রতি তাকিয়ে আছে। বাইরের জগত আগুনে জ্বলছে। মাটি এমন অগ্নিশিখা উদগীরণ করছে, যা অনুভব করা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আন-নাসের ও তার সঙ্গীরা যে স্থানটিতে বসে আছে, সেটি এই উত্তাপ থেকে নিরাপদ।
বড় মেয়েটি আন-নাসেরের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেয়। মধ্যমা ও শাহাদাত অঙ্গুলী দ্বারা ঘোড়ার প্রতি ইংগিত করে বললো- ঐ থলেটা খুলে এনে সঙ্গীদের দাও।
আন-নাসের ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা চামড়ার থলেটা এমনভাবে খুলে নিয়ে আসে, যেনো এই কাজটা সে কোনো জাদুর ক্রিয়ায় সম্পন্ন করেছে। থলেটি খুলে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে। ভেতরে খেজুর ছাড়াও এমন সব খাবার রয়েছে, যা রাজা-বাদশারা খেয়ে থাকেন। আছে গোশতও। সে বিস্ময়মাখা দৃষ্টিতে মেয়েদের প্রতি তাকায়। বড় মেয়েটি বললো- খাও।
আন-নাসের বস্তুগুলো তার সঙ্গীদের মাঝে বণ্টন করে দেয়। সকলের পেট আর পিঠ, এক হয়ে ছিলো। তারা খেতে শুরু করে। মহামূল্যবান হলেও খাবার পরিমাণে কম, যা বড়জোর একজনের জন্য যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু তারা চারজনই পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। তাদের দেহ-মনে সজীবতা ফিরে না আসে। এবার মেয়েগুলোর রূপ-সৌন্দর্য আগের তুলনায় আরো মনোহারী ও রহস্যময় হয়ে ওঠে।
তোমরা আমাদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করবে?- আন-নাসের বড় মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে- জিন মানুষের তো মোকাবেলা হয় না। তোমরা আগুন আর আমরা মাটি। আল্লাহ আমাদের সকলের সৃষ্টিকর্তা। তোমাদেরই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি বিবেচনা করে আমাদের প্রতি দয়া করো। তোমরা আমাদেরকে তুর্কমানের রাস্তায় তুলে দাও। তোমরা ইচ্ছে করলে তো মুহূর্তের মধ্যে আমাদেরকে তুকমান পৌঁছিয়ে দিতে পারো।
তোমরা কোথাও গেরিলা আক্রমণ করতে গিয়েছিলে কী?- বড় মেয়েটি জিজ্ঞেস করে- সালাহুদ্দীন আইউবীর কমান্ডো সেনারাও জিন হয়ে থাকে। বলো কোথায় গিয়েছিলে? কী করে এসেছে?
আন-নাসের তার পুরো কার্যক্রমের বিবরণ প্রদান করে। তার বাহিনী যে বীরত্বপূর্ণ গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে এসেছে এবং শত্রু পক্ষের কী কী ক্ষতিসাধন করেছে, সব বলে দেয়। তারপর ফেরত পথে কিভাবে পথ ভুলে উভ্রান্ত হয়ে পড়েছে, তারও বিবরণ প্রদান করে।
তোমাদেরকে তোমাদের বাহিনীর শ্রেষ্ঠ সৈনিক বলে মনে হচ্ছে- বড় মেয়েটি বললো- তোমাদের বাহিনীর সব সৈনিকই কি এ কাজ করতে পারে, যা তোমরা করেছো?
না–আন-নাসের জবাব দেয়- আমাদেরকে তোমরা মানুষ মনে করে। আমাদের ওস্তাদগণ আমাদেরকে যে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন, তা যে কোনো সৈনিক সহ্য করতে পারে না। আমরা বনের হরিণের ন্যায় দৌড়াতে পারি। আমাদের চোখ বাজপাখির ন্যায় বহুদূর পর্যন্ত দেখতে সক্ষম এবং আমরা চিতার ন্যায় আক্রমণ করতে পারঙ্গম। আমরা কেউ চিতা দেখিনি। চিতা কী এবং কিভাবে আক্রমণ করে, ওস্তাদগণ আমাদের সেই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই শারীরিক পারঙ্গমতা ছাড়াও আমাদের মস্তিষ্কও অন্যান্য সৈনিকের তুলনায় বেশী উন্নত ভাবনা ভাবতে পারে। শত্রুর দেশে গিয়ে কিভাবে তাদের সামরিক গোপন তথ্য বের করে আনা যায়, আমাদের ওস্তাদগণ আমাদেরকে সে বিদ্যাও শিক্ষাদান করেছেন। আমরা বেশ বদল করে ফেলি, কণ্ঠ পরিবর্তন করে ফেলি এবং অন্ধ হতে পারি। প্রয়োজন হলে আমরা চোখের অশ্রু ঝরাতে পারি এবং ধরা পড়ার আশংকা দেখা দিলে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করি এবং বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। আমরা বন্দী হই না- শহীদ হই।
আমরা যদি পরী না হতাম, তাহলে তোমরা আমাদের সঙ্গে কী আচরণ করতে?–মেয়েটি প্রশ্ন করে।
তোমরা বিশ্বাস করবে না- অনি-নাসের বললো- আমরা সেই পাথর, নারীর রূপ যাকে ভাঙ্গতে পারে না। আমি যদি নিশ্চিত হতে পারি যে, তোমরা মানুষ আর জানতে পারি, তোমরা পথ ভুলে এসেছে, তাহলে তোমাদের দুজনকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে নেবো। আমার ঈমানের ন্যায় তোমাদের মূল্যবান বিবেচনা করবো। কিন্তু তোমরা তো মানুষ নও। তোমাদের অবস্থাই বলছে, তোমরা মানুষ নও। তোমাদের ন্যায় মেয়ে এই ধরায় আসতে পারে না। তোমাদের প্রতি আমার আকুল আবেদন, আমাদেরকে আশ্রয় দাও।
আমরা মানুষ নই- বড় মেয়েটি বললো- আমরা তোমাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। আমাদের জানা ছিলো, তোমরা পথ হারিয়ে ফেলেছো। তোমরা যদি গুনাহগার হতে, তাহলে যে বিজন মরু এলাকা অতিক্রম করে এসেছে, সেটি তোমাদের রক্ত চুষে নিতে এবং তোমাদের দেহের গোশতকে বালিতে পরিণত করে তোেমাদের কংকর বানিয়ে ছাড়তো। এই মরুদ্যান কখনো পথভোলা পাপিষ্ঠকে ক্ষমা করেনি। আমরা দুজন তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিলাম। তেমাদেরকে যেসব কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, তা এই জন্য করতে হয়েছে, যাতে তোমরা খোদাকে ভুলে না যাও এবং তোমার অন্তর থেকে পাপের কল্পনাটুকুও বের হয়ে যায়। আমাদের ধারণা ছিলো, আমাদের ন্যায় রূপসী মেয়েদের দেখে তোমরা ক্ষুৎপিপাসার কথা ভুলে যাবে এবং শয়তানের কজায় চলে যাবে।
