সেখানে বসে তাদের অপেক্ষা করছিলো তাদের-ই আঠারজন লোক। এ তিনজনের মধ্য বয়সী লোকটির নাম মিগনানা মারিউস। গ্রেফতার হওয়া মেয়েদের মুক্ত করা এবং সম্ভব হলে সুলতান আইউবীকে হত্যা করার জন্য যে কমাখো পাঠানো হয়েছে, মিগনানা মারিউস সে বাহিনীর কমাণ্ডার।
এরা তিনজন সুলতান আইউবীর ক্যাম্প সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্যও সংগ্রহ করে নিয়েছিলো। তারা জেনে যায়, সুলতান আইউবী এখন এখানে নেই, আছেন কায়রোতে। শাদ্দাদের সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পারে, গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেফতার করা মেয়েগুলোকে কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। পাঁচজন পুরুষ বন্দীও আছে তাদের সঙ্গে।
বড় একটি নৌকায় করে এসেছে এ ঘাতক দলটি। সমুদ্রের পাড়ে এক স্থানে সরু একটি খাল। সেই খালে ঢুকিয়ে বেঁধে রেখে এসেছে তারা নৌকাটি। এখন তাদের কায়রো অভিমুখে রওনা হতে হবে। কিন্তু বাহন নেই।
যে তিনজন লোক ক্যাম্পে গিয়েছিলো, তারা ক্যাম্পের আস্তাবল ও উট বাঁধার স্থানটা দেখে এসেছে। তারা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছে, ক্যাম্প থেকে পশু চুরি করে আনা সহজ নয়। প্রয়োজন তাদের একুশটি ঘোড়া বা উট। ক্যাম্প থেকে এতগুলো পশু চুরি করে আনা অসম্ভব।
ভোরের আকাশে নতুন দিনের সূর্য উদিত হতে এখনো বেশ বাকি। পায়ে হেঁটেই রওনা হয় কাফেলা। বাহন পেয়ে গেলে তারা মেয়েদেরকে পথে-ই গিয়ে ধরার চেষ্টা করতো। কিন্তু কায়রো না গিয়ে উপায় নেই তাদের। তারা জানে, তাদের এ মিশনের সফলতা জীবন নিয়ে খেলা করার শামিল। কিন্তু সফল হতে পারলে খৃষ্টান সেনানায়ক ও সম্রাটগণ যে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার পরিমাণও এত বেশী যে, অবশিষ্ট জীবন তাদের আর কাজ করে খেতে হবে না। গোষ্ঠীসুদ্ধ বেশ আরামে বসে বসে তারা খেয়ে যেতে পারবে। এ লোভ সামলানোও তো কষ্টকর। তাই তাদের এত ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অবতরণ।
মিগনানা মারিউসকে বের করে আনা হয়েছিলো কারাগার থেকে। দস্যুবৃত্তির অপরাধে ত্রিশ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিলো তাকে। তার সঙ্গে ছিলো আরো দুজন কয়েদী, যাদের একজনের সাজা ছিলো চব্বিশ বছর, একজনের সাতাশ বছর। সে যুগের কারাগার মানে কসাইখানা। আসামী-কয়েদীদেরকে মানুষ মনে করা হতো না। কয়েদীদের রাতের বেলাও এতটুকু আরাম করার সুযোগ ছিলো না। তাদের নির্মমভাবে খাটান হতো। পশুর মতো অখাদ্য খাবার দেয়া হতো। তেমন কারাভোগ অপেক্ষা মৃত্যু-ই ছিলো শ্রেয়।
এ তিন কয়েদীকে মহামূল্যবান পুরস্কার ছাড়া সাজা-মওকুফের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে খৃষ্টানরা। তাদের ক্রুশ হাতে শপথ করিয়ে এ মিশনে নামান হয়েছে। যে পাদ্রী তাদের শপথ নিয়েছিলেন, তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, তারা যুত মুসলমানকে হত্যা করবে, তার দশগুণ পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করতে পারলে মাফ হয়ে যাবে জীবনের সমস্ত গুনাহ আর পরজগতে যীশুখৃষ্ট তাদের দান করবেন চিরশান্তির আবাস জান্নাত।
প্রতিজ্ঞা তাদের দৃঢ় মনোবলও বেশ অটুট। ভাব তাদের, কাজের কাজ করে-ই তবে মিসর ত্যাগ করবে কিংবা ক্রুশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেবে।
অবশিষ্ট আঠার ব্যক্তিও খৃষ্টান বাহিনীর বাছাবাছা সৈনিক। তারা জ্বলন্ত জাহাজ থেকে জীবন রক্ষা করে এসেছে। তারা নোম উপসাগরে এই অপমানজনক পরাজয় বরুণের প্রতিশোধ নিতে চায়। পুরস্কারের লোভ তো আছে-ই। প্রতিশোধ স্পৃহা আর পুরস্কারের লোভে-ই অদেখা এক গন্তব্যপানে তাদের এই পদব্রজে রওনা হওয়া।
***
বেলা দ্বি-প্রহর। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর হেডকোয়ার্টারের সামনে এসে দাঁড়ায় এক ঘোড়সওয়ার। পা বেয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে ঘোড়ার গায়ের ঘাম। ভীষণ ক্লান্ত। কথা ফুটছে না আরোহীর মুখ থেকে। লোকটি ঘোড়ার পিঠ থেকে অবতরণ করলে প্রবল একটা ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ঘোড়াটি। কোন দানা-পানি-বিশ্রাম ছাড়াই গোটা রাত এবং আধা দিন একটানা ঘোড়া দুটায় আরোহী। আরোহীকে ধরে নিয়ে একস্থানে বসায় সুলতান আইউবীর রক্ষীরা। সামান্য পানি পান করতে দেয় তাকে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার পর এবার বাক্শক্তি ফিরে পায় আরোহী। ভগ্নস্বরে বলে, একজন কমাণ্ডার বা সালারের সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে। সংবাদ পেয়ে বেরিয়ে আসেন সুলতান আইউবী নিজেই। সুলতানকে দেখে উঠে দাঁড়ায় আরোহী। সালাম করে বলে–দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছি আমি মহামান্য সুলতান! সুলতান তাকে কক্ষের ভিতরে নিয়ে যান এবং বলেন–জদি বলো, কী সংবাদ তোমার।
বন্দী মেয়েরা পালিয়ে গেছে। আমাদের প্লাটুনের সব কজন রক্ষী মারা গেছে। পুরুষ কয়েদীদের আমরা হত্যা করেছি। বেঁচে এসেছি আমি একা। আক্রমণকারীরা কারা ছিলো, আমি তা জানি না। আমরা ছিলাম মশালের আলোতে আর তারা ছিলো অন্ধকারে। অন্ধকারের দিক থেকে তীর ছুটে আসে এবং সেই তীরের আঘাতে মারা যায় আমার সব কজন সঙ্গী। বলল আরোহী।
এ লোকটি কয়েদীদের রক্ষী প্লাটুনের সেই ব্যক্তি, যে আক্রমণের পর অন্ধকারে উধাও হয়ে গিয়েছিলো এবং সুদানীদের ঘোড়া নিয়ে পালিয়েছিলো। কাফেলা ত্যাগ করে ঘোড়র পিঠে বসে লোকটি দ্রুত ছুটে চলে এবং পথে কোথাও মুহূর্তের জন্য না থেমে এত দীর্ঘ পথ অর্ধেকেরও কম সময়ে অতিক্রম করে চলে আসে।
