আন-নাসেরের সঙ্গীরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় এবং অন্ধের ন্যায় হাত আগে বাড়িয়ে দিয়ে এমনভাবে হাঁটতে শুরু করে, যেনো তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আন-নাসের ও তার চেতনাসম্পন্ন সঙ্গীদের হাঁটতে দেখে তারাও উঠে পা টেনে টেনে এগুতে শুরু করে। হঠাৎ আন-নাসেরের চোখও ঝাপসা হয়ে আসে। অন্যদের ন্যায় সেও সবুজ-শ্যামলিমা দেখতে শুরু করে। আন নাসের বুঝে ফেলে, মরুভূমি তাকেও ধোঁকা দিতে শুরু করেছে।
***
আন-নাসের অনেকগুলো টিলার মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। এই টিলাগুলো বেশ চওড়া। কোনটিই তেমন উঁচু নয়। কোথাও বালুকাময় প্রান্তরও চোখে পড়ছে।
আন-নাসের সামনে এবং তার সঙ্গী পেছনে পেছনে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে আন-নাসের হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়। তারা দূর থেকে যে খুঁটি ও মিনার দেখেছিলো, সেগুলো এখন সরাসরি তার চোখের সামনে। এক স্থানে দুটি ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। তারই সন্নিকটে দুটি মেয়ে বসে আছে। তারা উঠে দাঁড়ায়। মেয়েগুলোর বর্ণ গৌর এবং দেহের রূপ-কাঠামো আকর্ষণীয়।
আন-নাসের খানিক দূরে দাঁড়িয়ে গিয়ে সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করে- তোমরা কিদুটি ঘোড়া আর দুটি মেয়ে দেখতে পাচ্ছে?
তার যে দুই সঙ্গী অলীক কল্পনার শিকার হয়েছিলো, তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একজন বললো- না, কিছু তো দেখা যাচ্ছে না।
আন-নাসেরের যে সঙ্গীর মানসিক অবস্থা এখনো ঠিক আছে, সে অস্কুট স্বরে ললো- হ্যাঁ, আমি দেখতে পাচ্ছি।
আল্লাহ আমাদের দয়া করুন- আন-নাসের বললো- আমাদের দুজনেরও মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমরাও অবাস্তব বস্তু দেখতে শুরু করেছি। জাহান্নামসম এই বিরানভূমিতে এমন রূপসী নারী আসতে পারে না।
তাদের পোশাক-আশাক যদি মরু যাযাবরদের ন্যায় হতো, তাহলে বুঝতাম, এটা কল্পনা নয়, বাস্তব- আন-নাসেরের সঙ্গী বললো- চলো, সামনে গিয়ে গাছের ছায়ায় বসে পড়ি। ওরা মেয়ে নয়। এটা আমাদের মানসিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
কিন্তু আমার হুশ-জ্ঞান ঠিক আছে- আন-নাসের বললো- আমি তোমাকে চিনতে পারছি। তুমি যা যা বলেছে, আমি বুঝে ফেলেছি। আমার মস্তিষ্ক এখনো নিয়ন্ত্রণে আছে।
আমারও হুঁশ আছে- সঙ্গী বঁললো- আমরা কি সত্যিই মেয়ে দেখছি, নাকি ওরা জিন-পরী।
মেয়েগুলো একইভাবে মূর্তির ন্যায় তাদের প্রতি তাকিয়ে আছে। আম নাসের সাহসী মানুষ। সে ধীরে ধীরে মেয়েগুলোর দিকে এগিয়ে যায়। মেয়েরা অদৃশ্য হলো না। তারা এখন আন-নাসেরের হাত পাঁচেক দূরে। মেয়েদের একজন অপরজনের তুলনায় বয়সে বড়। এমন রূপসী মেয়ে আন-নাসের জীবনে আর দেখেনি। মাথার ওড়নার ফাঁক দিয়ে যে কটি চুল কাঁধের উপর পড়ে আছে, সেগুলো সরু রেশমের ন্যায় মনে হলো। উভয় মেয়ের চোখের রংও বেশ চিত্তাকর্ষক ও বিস্ময়কর। চোখগুলো মুক্তার ন্যায় ঝিকমিক করছে।
তোমরা সৈনিক- বড় মেয়েটি বললো- তোমরা কার সৈনিক।
সবই বলবো- আন-নাসের বললো- তার আগে বলো, তোমরা মরুভূমির ধা ধা নাকি জিন-পরী?
আমরা যাই হই না কেন, আগে বলো তোমরা কারা এবং এদিকে কী করতে এসেছে? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে- আমরা মরুভূমির ধা ধা নই। তোমরা আমাদের দেখতে পাচ্ছো, আমরাও তোমাদের দেখছি।
আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর গেরিলা সৈনিক- আন-নাসের বললো পথ ভুলে এদিকে এসে পড়েছি। তোমরা যদি জিন-পরী না হয়ে থাকো, তাহলে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর দোহাই, আমার এই সঙ্গীদের পানি পান করাও এবং তার বিনিময়ে আমার জীবন নিয়ে নাও। এটা আমার কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।
অস্ত্রগুলো আমাদের সামনে রেখে দাও- মেয়েটি বললো- হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর নামে প্রার্থিত বস্তু আমরা না দিয়ে পারি না। তোমার সঙ্গীদের ছায়ায় নিয়ে আসো।
আন-নাসের তার অস্তিত্বে একটি ঢেউ খেলে গেছে বলে অনুভব করে, যেনো ঢেউটি মাথা দিয়ে প্রবেশ করে পা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সে মানুষের সঙ্গে যুদ্ধকারী জানবাজ। তার সকল গেরিলা আক্রমণ সঙ্গীদের অবাক করে তুলতো। কিন্তু এই মেয়ে দুটোর সামনে সে কাপুরুষ হয়ে গেছে। তার মনে এমন একটা ভীতি চেপে বসেছে, যা পূর্বে কখনো অনুভব করেনি। সে জিন পরীর গল্প শুনতো; কিন্তু কখনো জিনের মুখোমুখি হয়নি। প্রতি মুহূর্তেই তার আশংকা ছিলো, মেয়ে দুটো এবং ঘোড়গুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করে ফেলবে। তখন সে কিছুই করতে পারবে না। আন-নাসের মেয়েগুলোর সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। সে তার সঙ্গীদের বললো- তোমরা ছায়ায় চলে আসে। তাদের একজন অচেতন পড়ে ছিলো। তাকে টেনে ছায়ায় নিয়ে আসা হলো।
বলল, তোমরা কী করতে এসেছো?–মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
পানি পান করাও- আন-নাসের অনুনয়ের সাথে বললো- শুনেছি, জিনরা যখন-তখন যে কোনো বস্তু উপস্থিত করতে পারে।
ঘোড়ার সঙ্গে মশক বাঁধা আছে- মেয়েটি বললো- একটি খুলে নাও।
আন-নাসের একটি ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা মশক খুলে হাতে নেয়। মশকটি পানিতে পরিপূর্ণ। সবার আগে তার অচেতন সঙ্গীর মুখে পানির ছিটা দেয়। পানির ছোঁয়া পেয়ে সে চোখ খোলে এবং ধীরে ধীরে উঠে বসে। আন নাসের মশকের মুখটা তার মুখের সঙ্গে লাগায়। সঙ্গীর সামান্য পানি পান করার পর মশক সরিয়ে নেয়। আন-নাসের তাকে বেশি পানি পান করতে দেয়নি। ভীষণ পিপাসার পর বেশি পানি পান করা ক্ষতিকর। তারপর একজন একজন করে প্রত্যেকে পানি পান করে। সবশেষে আন-নাসের নিজে পানি পান করে। তার মস্তিষ্ক পরিস্কার হয়ে গেছে। এবার তার ভাবনা হচ্ছে, এই মেয়েগুলো যদি বাস্তব না হয়ে তার কল্পনা হতো, তাহলে মস্তিষ্ক পরিস্কার হওয়ার পর এখন তারা অদৃশ্য হয়ে যেতো। কিন্তু তাতো হয়নি। মেয়েগুলো এখানো যথাস্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পরিস্কার হওয়ার আগে মেয়েগুলোর ন্যায় মশকভর্তি পানিও দেখেছিলো। সেই পানি তার সঙ্গীরা এবং সে নিজে পান করে চাঙ্গা হয়ে ওঠেছে। বিষয়টা যদি অলীক অল্পনা হতো, তাহলে পানি পান করাই সম্ভব হতো না। সব মিলিয়ে আন নাসের নিশ্চিত যে, সে যা দেখছে, বাস্তব দেখছে। সে মেয়েগুলোর প্রতি তাকায় এবং গভীরভাবে নিরিক্ষা করে। এবার তাদেরকে পূর্বের তুলনায় আরো রূপসী মনে হলো, যেনো তারা মানুষ নয়।
