জনমানবহীন এই নিষ্ঠুর মরুভূমি আন-নাসেরের এই সঙ্গীকে ধোকা দিতে শুরু করে। মরু সাহারা লোকটির জীবন নিয়ে খেলা শুরু করে। তবে এটা সাহারার দয়াও হতে পারে যে, একজন পথিকের জীবন হরণ করার আগে তাকে সুদর্শন ও চিত্তহারী কল্পনায় ব্যস্ত করে দেয়, যাতে মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভূত না হয়।
আন-নাসেরের সঙ্গী দৌড় দেয়। যে লোকটি এততক্ষণ পা হেঁচড়ির পথ চলচিলো, সে কিনা সুস্থ-সবল মানুষের ন্যায় দৌড়াচ্ছে। কিন্তু এই দৌড় সেই প্রদীপের ন্যায়, যা নির্বাপিত হওয়ার আগে দপ করে ওঠে। আন-নাসের তার পেছন পেছন ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে। তার অপর দুই সঙ্গীর দম এখনো কিছুটা অবশিষ্ট আছে। তারাও দৌড়ে গিয়ে সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। সিপাহী সঙ্গীদের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করছে এবং চিৎকার করছে। আমাকে ঝিলের কাছে যেতে দাও। ঐ দেখ, কতো হরিণ ঝিল থেকে পানি পান করছে।
সঙ্গীরা তাকে ধরে রাখে। সে ধীরে ধীরে পা টেনে টেনে এগিয়ে চলে। আন-নাসের তার মুখমণ্ডলের উপর একখানা কাপড় রেখে দেয়, যেনো সে কিছু দেখতে না পায়।
***
সূর্যটা ঠিক মাথার উপর উঠে এসেছে। এবার আরো এক সিপাহী উচ্চস্বরে বলে ওঠে- বাগিচায় নর্তকীরা নাচছে। চলো, নাচ দেখি, রূপ দেখি। চলো, বন্ধুগণ! ওখানে পানি পাওয়া যাবে। মানুষ আহার করছে। আমি তাদেরকে চিনি। চলল… চলো…। বলেই সিপাহী দৌড়াতে শুরু করে।
যে সিপাহী প্রথমে অলীক দৃশ্য অবলোকন করেছিলো, সে বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত নীরব থাকে। সে কারণে সঙ্গীরা তাকে ছেড়ে দিয়েছিলে। এখন এক সঙ্গীকে দৌড়াতে দেখে সেও তার পেছন পেছন ছুটছে এবং চিৎকার করতে শুরু করে- নর্তকীটা অত্যন্ত রূপসী। আমি তাকে কায়রোতে দেখেছি। সেও আমাকে চিনে। আমি তার সঙ্গে খাবো। তার সঙ্গে শরবত পান করবো।
আন-নাসেরের মাথাটা হেলে পড়েছে। মরুভূমির কষ্ট সহ্য করার মতো শক্তি তার ছিলো। কিন্তু সঙ্গীদের এই পরিণতি ও দুর্দশা সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা তার সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিজের শারীরিক অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। এখন তার একজন মাত্র সঙ্গীর মস্তিষ্ক ঠিক আছে। দৈহিক শক্তি তারও শেষ হয়ে গেছে।
যে দুসঙ্গী কল্পনার বাগিচা ও নাচ-গানের পেছনে ছুটে চলছিলো, কয়েক পা এগিয়ে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পড়ারই কথা। দেহে তাদের আছেই বা কী। আন-নাসের ও সঙ্গী তাদেরকে বসিয়ে ধরে রাখে এবং গায়ের উপর কাপড় দিয়ে ছায়া দান করে। তাদের চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। মাথা হেলে পড়েছে।
তোমরা আল্লাহর সৈনিক- আন-নাসের ক্ষীণ কণ্ঠে বলতে শুরু করে– তোমরা প্রথম কেবলা ও কাবা গৃহের প্রহরী। তোমরা ইসলামের দুশমনের কোমর ভেঙ্গেছে। কাফিররা তোমাদের ভয়ে ভীত ও কম্পিত। তোমরা মরণজয়ী মর্দে মুমিন। এই মরুভূমি, পিপাসা ও সূর্যের উত্তাপকে তোমরা কী মনে করছো? তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হচ্ছে। জান্নাতের ফেরেশতারা তোমাদের পাহারা দিচ্ছে। তোমাদের দেহ পিপাসার্ত হলেও আত্মা পিপাসার্ত নয়। ঈমানদাররা পানির শীতলতায় নয়- ঈমানের শতীলতায় জীবিত থাকে।
উভয়ে এক সঙ্গে চোখ খুলে আন-নাসেরের প্রতি তাকায়। আন-নাসের হাসবার চেষ্টা করে। আবেগের আতিশয্যে সে যে বক্তব্য প্রদান করে, তা ক্রিয়া করে বসেছে। উভয় সিপাহী কল্পনার জগত থেকে বাস্তব জগতে ফিরে আসে। তারা উঠে দাঁড়ায় এবং ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে।
সকালে রওনা হওয়ার সময় তারা টিলা-পর্বতের যে খুঁটি ও মিনার দেখেছিলো, সেগুলো নিকটে এসে গেছে। এখন সেগুলো তখনকার তুলনায় অনেক বড় দেখাচ্ছে। ওখানে পানি থাকতে পারে আশা করা যায়। থাকতে পারে সমতল ভূমি ও খানা-খন্দক। আন-নাসের তার সঙ্গীদের বললো, আমরা পানির নিকটে এসে পড়েছি এবং আজ সন্ধ্যার আগেই পানি পেয়ে যাবো। তারা টিলা-পর্বতের আরো নিকটে পৌঁছে যায়। হঠাৎ এক সিপাহী চিৎকার করে ওঠে- আমি আমার গ্রামে এসে পড়েছি। আমি গিয়ে সকলের জন্য খাবার রান্না করি। আমার গ্রামের মেয়েরা কূপ থেকে পানি তুলছে। বলেই সে দৌড়াতে শুরু করে।
তার পেছনে অপর সিপাহীও দৌড়াতে শুরু করে। হঠাৎ উপুড় হয়ে পড়ে যায়। পড়ে গিয়ে মুঠি করে মাটি ও বালি তুলে মুখে পুরে।
আন-নাসের ও তার তৃতীয় সঙ্গী দৌড়ে গিয়ে তার মুখ থেকে মাটিগুলো বের করে ফেলে। মুখটা পরিস্কার করে তুলে দাঁড় করায়। কিন্তু তার হাঁটার শক্তি নেই। অপর সিপাহীও পড়ে যায় এবং উপুড় হয়ে পড়ে থেকে বলতে থাকেকূপ থেকে পানি পান করে নাও। আমি তোমাদের জন্য খাবার রান্না করবো।
আন-নাসের দুআর জন্য দুহাত একত্রিত করে আকাশপানে তুলে ধরে বলতে শুরু করে
মহান আল্লাহ! আমরা তোমার নামে লড়তে ও মরতে এসেছিলাম। আমর কোনো পাপ করিনি। আমরা দস্যু-তস্করও নই। কাফিরদের সঙ্গে লড়াই করা যদি পাপের কাজ হয়ে থাকে, তাহলে তুমি আমাদের ক্ষমা করে দাও। হে মহান আল্লাহ! আমার জীবনটা তুমি নিয়ে নাও। আমার দেহের রক্তকে পানি বানিয়ে দাও। সে পানি পান করে আমার সঙ্গীরা বেঁচে থাকুক। তারা তো। রাসূলের প্রথম কেবলা জবর-দখলকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আমার রক্তকে পানি বানিয়ে তুমি তাদের পান করাও।
