সবাই হেসে ওঠে। তবে এই হাসির জন্য তাদেরকে শক্তি ব্যয় করতে হয়েছে।
সূর্য তাদের মাথার উপর উঠে এসেছে। উপর থেকে সূর্য আর নীচ থেকে উত্তপ্ত বালি তাদেরকে পোড়াতে শুরু করে। আন-নাসের গুন গুন করে একটি জিহাদী গান গাইতে শুরু করে। গান গাওয়া শেষ হলে সে ভিন্ন এক সুরেলা কণ্ঠে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদর রাসুলুল্লাহ জপতে শুরু করে। হাল্কা বেগে বাতাস বইছে। চিকচিকে বালিকণা তাদের পদচিহ্নগুলো মুছে দিচ্ছে।
এবার সূর্যটা পশ্চিমাকাশের দিকে নামতে শুরু করেছে। চারজন আদম সন্তানের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণ হয়ে চলছে। পা ভারি হয়ে যাচ্ছে। হাঁটার গতি কমে গেছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। আদ্রতার অভাবে হা করা মুখ বন্ধ হচ্ছে না। একজনের জবান বন্ধ হয়ে গেছে; এখন আর সে কথা বলতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর আরো একজন নীরব হয়ে যায়। আন-নাসের ও তার তৃতীয় সঙ্গী এখনো অস্ফুট স্বরে আল্লাহর নাম জপ করছে। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর তৃতীয় সঙ্গীর কণ্ঠও রুদ্ধ হয়ে যায়।
সঙ্গীগণ!- আন-নাসের দেহের অবশিষ্ট শক্তি ব্যয় করে বললো- হিম্মত হারাবে না। আমরা ঈমানের শক্তিতে বলিয়ান। ঈমানের শক্তিতেই আমরা বেঁচে থাকবো।
আন-নাসের একজন একজন করে সঙ্গীদের চেহারার প্রতি তাকায়। কারো চেহারায় যেনো রক্ত নেই। সকলের চোখ কোঠরে ঢুকে গেছে।
সূর্য ডুবে গেছে। আঁধারে ছেয়ে গেছে প্রকৃতি। পদতলের উত্তপ্ত বালি ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। আন-নাসের সঙ্গীদের থামতে দেয়নি। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় পথ চলা সহজ হয়। সাধারণ পথচারী হলে লোকগুলো বহু আগেই হারিয়ে যেতো। এরা সৈনিক এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডো। সাধারণ মানুষের তুলনায় এদের দেহ বেশী কষ্ট-সহিষ্ণু। আরো কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর আন-নাসের সঙ্গীদের যাত্রা বিরতি দিয়ে শুয়ে পড়তে বললো।
***
আন-নাসের শেষ রাতে জাগ্রত হয়। আকাশ পরিষ্কার। তারকা দেখে অনুমান করে রাত পোহাতে আর কত দেরি। একটি তারকা দেখে দিক নির্ণয় করে সঙ্গীদের জাগিয়ে তোলে। তাদের নিয়ে রওনা হয়। তাদের হাঁটার গতি ভালো। তবে পিপাসার কারণে মুখ দিয়ে কথা সরছে না।
এই মরুভূমি এতো বেশি বিস্তীর্ণ নয়- আন-নাসের বড় কষ্টে বললো আজই শেষ হয়ে যাবে। আমরা আজই পানি পর্যন্ত পৌঁছে যাবো।
সম্মুখে পানি পাওয়া যাবে এই আশায় তারা এগুতে থাকে। রাত পোহায়ে ভোর হলো। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উদিত হলো। মাইল দশেক দূরে কতগুলো খুটি ও মিনার চোখে পড়ে। এগুলো মাটির টিলা ও পর্বতের চূড়া। দূর থেকে খুঁটি আর মিনারের মতো দেখা যাচ্ছে। একটি গাছও চোখে পড়ছে না। পায়ের তলার মাটি এখন ফেটে চৌচির। মনে হচ্ছে, কয়েক শত বছর ধরে এই মাটি পানির ছোঁয়া পায়নি। শত শত বছরের পিপাসাকাতর মাটি মানুষের রক্ত পেলে পান করতে কুণ্ঠিত হবে না।
আন-নাসের তার সঙ্গীদের চেহারা পর্যবেক্ষণ করে। এক সঙ্গীর জিহ্বা কিছুটা বেরিয়ে এসেছে। লক্ষণটা ভয়ানক। মরু সাহারা ট্যাক্স উসুল করতে শুরু করেছে। অপর দুই সঙ্গীর বাহ্যিক অবস্থা অতোটা সঙ্গীন না হলেও স্পষ্ট যে, দশ মাইল পথ অতিক্রম করে মিনারসদৃশ টিলা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। আন-নাসের দলের কমান্ডার। দায়িত্ববোধের কারণেই তার হুশ-জ্ঞান এখানো ঠিক আছে। তার শারিরিক অবস্থা সঙ্গীদের চেয়ে ভালো নয়। সে কথা দ্বারা সঙ্গীদের সাহস বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ধীরে ধীরে সূর্য উপরে উঠছে আর মাটির উত্তাপ বাড়ছে। আন-নাসের ও তার সঙ্গীগণ পা তুলে হাঁটতে পারছে না। তারা পা হেঁচড়িয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। যে সিপাহীর জিহ্বা বেরিয়ে এসেছিলো, তার বর্শাটা হাত থেকে পড়ে যায়। তারপর সে কোমরবন্ধ থেকে তরবারীটাও খুলে ফেলে দেয়। নিজের অজ্ঞাতে এসব আচরণ করে সে। তার হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব কাজ করে যাচ্ছে। এটি মরুভূমির একটি নির্দয় ক্রিয়া যে, মানুষ যেমন ঘুমের ঘোরে অজ্ঞাতে নানা আচরণ করে থাকে, তেমনি পথভোলা পিপাসার্ত পথিকও নিজের অজান্তে দেহের বোঝা ছুঁড়ে ফেলতে শুরু করে। সে কোথাও থামে না। লক্ষ্যহীনভাবে হাঁটতে থাকে আর এক এক করে নিজের সহায়-সম্বল ও পাথেয় ফেলে দিতে থাকে। মরু মুসাফিররা যখন স্থানে স্থানে এরূপ বস্তু পড়ে থাকতে দেখে, তখন তারা বুঝে ফেলে, আশ-পাশে কোথাও কোন হতভাগা আদম সন্তানের লাশ পড়ে আছে।
মরুভূমি আন-নাসেরের এক সঙ্গীকে এমনি এক অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে। আন-নাসের তার বর্শা ও তারৰারীটা তুলে নিয়ে তাকে স্নেহমাখা কণ্ঠে বললো- এতো তাড়াতাড়ি পরাজয় মেনে নিও না বন্ধু। আল্লাহর সৈনিকরা জীবনদান করে, অন্ত্রত্যাগ করে না। তুমি তোমার মর্যাদাকে বালির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলো না।
সঙ্গী অসহায় দৃষ্টিতে আন-নাসেরের প্রতি তাকায়। আন-নাসের তার প্রতি তাকিয়ে থাকে। সিপাহী হঠাৎ খিল খিল করে হেসে ওঠে সামনের দিকে তাকিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে ইশারা করে। তারপর নিজের দেহের অবশিষ্ট সবটুকু শক্তি ব্যয় করে চিৎকার করে ওঠে- পানি… ঐ দেখ… বাতাস… পানি পেয়ে গেছি। লোকটি সামনের দিকে দৌড় দেয়।
সেখানে পানি ছিলো না, না মরিচিকা। তুমি এমন যে, এরূপ ভূমিতে মরিচিকা দেখা যায় না। মরিচিকা সৃষ্টি হয় বালির চমক থেকে। লোকটির উপর সাহারার দ্বিতীয় নিষ্ঠুর আচরণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। সে দেখতে পায়, তার সম্মুখে পানির ঝিল, বাগ-বাগিচা ও অসংখ্য প্রাসাদ। আসলে কিছুই নেই। একজন অসহায় মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নিমর্ম উপহাস। সে আরো দেখতে পায়, মাইল দুয়েক দূরে একটি শহর। দলে দলে মানুষ চলাচল করছে। গায়িকা-নর্তকীরা গাইছে-নাচছে।
