আন-নাসের দিনের বেলা যেখানে লুকিয়ে ছিলো, রাতে সেখানেই ঘোড়াগুলো বেঁধে রাখে। তারপর পায়ে হেঁটে দলের সদস্যদের নিয়ে এক স্থান দিয়ে দুশমনের রসদ বহরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। মালপত্রের স্তূপ দাহ্য পদার্থ ফেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দলের সদস্যদের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে দেয়। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। শত্রুসেনারা ছুটোছুটি করতে ও করে। আন-নাসেরের কমান্ডোরা ছুটন্ত ও পলায়নপর শত্রুসেনাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু করে দেয়। শত্রুসেনারা তাদের সন্ধান করতে শুরু করে। সফল অপারেশনের পর তাদের পক্ষে বেশি সময় লুকিয়ে হামলা করা সম্ভব হল না। তারা এক একজন করে ধরা পড়তে ও শহীদ হতে শুরু করে। যে তিনজন কমান্ডো আন-নাসেরের সঙ্গে ছিলো, শুধু তারাই বেঁচে থাকে। তা। ব্যাপক ধ্বংস সাধন করে। রসদের সঙ্গে যেসব পাহারাদার ছিলো, তার তাদেরকে ঘেরাও করে ধরার চেষ্টা করে। আন-নাসের তার এই তিন সঙ্গীকে তার থেকে আলাদা হতে দেয়নি। তারা ধীরে ধীরে কৌশলে আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে অন্ধকারে ঘোরাফেরা ও তাবুর আড়ালে লুকিয়ে শত্রুসেনাদে চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়।
আন-নাসের আকশের দিকে তাকায়। আকাশে কোনো তারকা নেই। কমান্ডোসেনাদের তারকা দেখে দিক নির্ণয় করার প্রশিক্ষণ থাকে। কিন্তু আজকের আকাশটা মেঘে ছেয়ে আছে। আন-নাসের শত্রু বাহিনীর রসদে অবস্থান থেকে অনেক দূর চলে এসেছে। তবে এখনো দুশমনের প্রজ্বলমান রসদ ও আসবাবপত্রের আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে। তার অপর ৯ সৈনিক বেঁচে আছে নাকি শহীদ হয়েছে, তা সে জানে না। সে মনে মনে তাদের নিরাপত্তার জন্য দুআ করে তিন সঙ্গীকে নিয়ে যে জায়গায় দলের ঘোড়াগুলো বাঁধা আছে, অনুমান করে সেদিকে এগিয়ে চলে। তারা রাতভর হাঁটতে থাকে। দুশমনের রসদের অগ্নিশিখা এখন আর দেখা যাচ্ছে না।
পথ হারিয়ে ফেলেছে আন-নাসের। তারা যে পথে হাঁটছে, এটি তাদের গন্তব্যের পথ নয়। হাঁটছে দিক-নির্দেশনাহীন। এখন তারা যে মাটিতে হাঁটতে তার প্রকৃতি অন্য রকম। তারা যে পথে এসেছিলো, তাতে কোন গাছ-গাছা ছিলো না। পায়ের নীচে শক্ত মাটির পরিবর্তে বালি অনুভূত হচ্ছে। পানি। খাদ্যদ্রব্য তাদের ঘোড়ার সঙ্গে বাঁধা। আন-নাসের পিপাসা অনুভব করে। শরীর ক্লান্ত। তার সঙ্গীরাও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েছে। চলার গতি বী হয়ে আসছে তাদের। আন-নাসের সেখানেই যাত্রাবিরতি দিয়ে বিশ্রাম নেয়। ইচ্ছা ব্যক্ত করে। তার সঙ্গীরা এই আশায় এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়, হয়তো সামনে কোথাও পানি পাওয়া যাবে। তারা আরো কিছুক্ষণ হাঁটে এ ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে।
***
আন-নাসের চোখ খুলে দেখতে পায়, তার সঙ্গী তিন সৈনিক অচেতন ঘুমিয়ে আছে। সূর্যটা উদায়স্থল ত্যাগ করে উপরে উঠে এসেছে। সে চারদিকে তাকায়। অনুভব করে- সে বালির সমুদ্র মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। মনটা ভেঙ্গে পড়ে আন-নাসেরের। লোকটার লালন-পালন, বড় হওয়া, যুদ্ধ করা সবই মরু অঞ্চলে হয়েছে। বালির সমুদ্রকে ভয় পাওয়ার মতো লোক নয় সে। তার ভয় পাওয়ার কারণ হলো- তার ধারণা ছিলো না, এখানে মরুদ্যান আছে। আরো একটি কারণ হলো, যতদূর পর্যন্ত চোখ যায় পানির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পিপাসায় কণ্ঠনালীতে জ্বালা অনুভব করছে, আন-নাসেরের। সঙ্গীদের অবস্থাও আন্দাজ হচ্ছে তার। এখান থেকে তুর্কমান কোন্দিক হতে পারে সূর্য দেখে তা ঠিক করে সেদিকে তাকায়। পর্বতমালার বাঁকা একটা রেখা দেখতে পায়। কিন্তু সোজা সেদিকে যাওয়া সম্ভব নয়। কেননা, পথে দুশমনের ফৌজ রয়েছে।
আন-নাসের তার সঙ্গীদের জাগায়। জাগ্রত হয়ে তারা উঠে বসে। চেহারায় ভীতির ছাপ।
প্রয়োজন হলে আমরা আরো দুদিন না খেয়ে থাকতে পারবো- আন নাসের তার সঙ্গীদের বললো- আর এই দুদিনে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছতে না পারলেও পানি পর্যন্ত অবশ্যই পৌঁছে যাবো।
তিন সৈনিক যার যার অভিমত ব্যক্ত করে। কিন্তু তারা চলে এসেছে বহু দূর। সঙ্গে ঘোড়া থাকলে অনেকটা সহজ হতো। নিদ্রা তাদের পরিশ্রান্ত দেহকে কিছুটা সজীবতা দান করেছে।
সঙ্গীগণ- আন-নাসের বললো- মহান আল্লাহ আমাদেরকে যে পরীক্ষায় নিক্ষেপ করেছেন, তাকে মাথা পেতে বরণ করে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
এখানে বসে থাকা তো কোনো প্রতিকার নয়- এক সঙ্গী বললো- সূর্য মাথার উপর এসে পোড়াতে শুরু করার আগে আগেই রওনা হওয়া দরকার। আল্লাহ আমাদেরকে পথের দিশা দান করবেন।
স্রেফ অনুমানের ভিত্তিতে দিক নির্ণয় করে তারা হাঁটতে শুরু করে। সূর্য মাথার উপর উঠে আসছে। পায়ের নীচের বালি উত্তপ্ত হয়ে ওঠছে। সামান্য দূরের বালিগুলোকে মরিচিৎকার ন্যায় পানি বলে মনে হচ্ছে। আন-নাসেরও তার সঙ্গীরা মরুভূমির নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে অবহিত এবং অভ্যন্তও। তাদের মরিচিকাও চোখে পড়তে শুরু করে। কিন্তু মরুভূমির এই প্রতারণা সম্পর্কে অবগত থাকার সুবাদে তারা প্রতিটি মরিচিকাকে উপেক্ষা করে সম্মুখে এগিয়ে চলছে।
বন্ধুগণ!- আন-নাসের বললো- আমরা ডাকাত নই, আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেবেন না। এই অবস্থায় যদি আমাদের মৃত্যু হয় তা হবে শাহাদাত। আল্লাহকে স্মরণ করে হাঁটতে থাকো।
যদি এমন কোন পথিক পেয়ে যাই, যার সঙ্গে পানি আছে, তাহলে ডাকাতি করতে পরোয়া করবো না। এক সৈনিক বললো।
