আমার কাছে এখনো যে পরিমাণ সৈন্য আছে, আমি তাদেরকে অপর্যাপ্ত মনে করি না- মুজাফফর উদ্দীন বললেন- আমরা যে বাহিনী নিয়ে এসেছি, এরা তার চার ভাগের এক ভাগ। সুলতান আইউবী এর চেয়েও স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা যুদ্ধ করেন এবং সফল হয়ে থাকেন। আমি তার পার্শ্বের উপর হামলা করবো। এবার আমি তাকে সেই চাল চালতে দেবো না, যেটি তিনি হামাত-এ চেলেছিলেন। তোমরা সবাই আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত থাকো।
মসুলের শাসনকর্তা মহামান্য গাজী সাইফুদ্দীন তিনটি ফৌজের এতো বিপুল সৈন্য সত্ত্বেও হেরে গেছেন- নায়েব সালার বললো- আমি আবারো বলবো, এই সামান্য সৈন্য দ্বারা আক্রমণ করা আর তাদেরকে মৃত্যুর হাতে তুলে দেয়া এক কথা।
যারা যুদ্ধের ময়দানে হেরেমের নারী আর মদের মটকা সঙ্গে রাখে, তাদের কাছে তিন নয়, দশটি বাহিনী থাকলেও সেই পরিণতিই বরণ করতে হবে, যা আমাদের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীনের ভাগ্যে জুটেছে- মুজাফফর উদ্দীন বললেন- আমি মদপান করি। কিন্তু এখানে যদি এক গ্লাস পানিও না জোটে, তবু পরোয়া করবো না। সুলতান আইউবী আমাকে ঈমান নীলামকারী ও বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করে থাকেন। আমি তাকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছাড়বো না। আমার এই লড়াই হবে দুই সেনাপতির লড়াই। এই যুদ্ধ হবে দুই বীরের যুদ্ধ। এটি হবে দুই অসিবিদের সংঘাত। তোমরা তোমাদের নিজ নিজ বাহিনীকে প্রস্তুত করো। মনে রাখতে হবে, সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দারা মাটির তলেও দেখতে পায়। তোমাদের ইউনিটগুলোকে আজ রাতে আরো গোপনে নিয়ে যাবে এবং চারদিকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত গুপ্তচর ছড়িয়ে দেবে। তারা সন্দেহজনক অবস্থায় কাউকে পেলে ধরে নিয়ে আসবে।
মুজাফফর উদ্দীন তার সৈন্যদের লুকিয়ে রাখার জন্য একটি স্থান ঠিক করে নেন। আক্রমণের জন্য তিনি কোনো দিন বা সময় নির্ধারন করেননি। তিনি তার নায়েব সালারদের বললেন- সালাহুদ্দীন আইউবী শিয়ালের ন্যায় ধূর্ত এবং খরগোসের ন্যায় গতিশীল। আমি গুপ্তচর মারফত জানতে পেরেছি, তিনি এখনো মালে গনীমত সগ্রহ করেননি। তার অর্থ হলো, তিনি সম্মুখে অগ্রসর হবেন না এবং আমাদের জবাবী হামলার আংশকা করছেন। আমি তাকে ভালোভাবেই জানি যে, তিনি কোন্ ধারায় চিন্তা করে থাকেন। আমি তাকে ধোকা দেবো যে, আমরা সবাই পালিয়ে গেছি এবং এখন আর আক্রমণের কোনো ভয় নেই। এটি হবে বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার লড়াই। আমি প্রমাণ করবো, কার বিচক্ষণতা বেশি- আইউবীর না আমার। আইউবী দুদিনের বেশি অপেক্ষা করবে না। তার মতো আমিও তার গতিবিধির উপর নজর রাখার জন্য আমার গুপ্তচরদের ব্যবহার করবো। যখনই তিনি গনীমত সগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন এবং তার দৃষ্টি ডান-বাম থেকে সরে যাবে, আমরা তার পার্শ্বের উপর আক্রমণ চালাবো।
সুলতান আইউবী এই শংকাই অনুভব করছিলেন।
***
সুলতান আইউবী তাঁর কিছুসংখ্যক সৈন্যকে সাইফুদ্দীন বাহিনীর ডান-বাম থেকে সরিয়ে পেছনে প্রেরণ করেছিলেন। তা ছাড়া তিনি কমান্ডোসেনাও রওনা করিয়েছিলেন। এরা তাঁর সেই কমান্ডো ফোর্স, যার প্রত্যেক কমান্ডার ও প্রত্যেক সৈনিক অস্বাভাবিক বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও দুঃসাহসী। এরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচরও। এই ফোর্স চার থেকে বারজন করে এক একটি দলে বিভক্ত হয়ে দুশমনের বিপুল ক্ষতিসাধন করেছিলো। তন্মধ্যে একটি দলের সদস্য সংখ্যা ছিলো বারজন, যার মাত্র তিনজন সৈনিক আর তার কমান্ডার আন-নাসের জীবিত আছে।
আন-নাসর তার দলের সঙ্গে তুর্কর্মানের রণাঙ্গনে থেকেই সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত বাহিনীর পেছনে চলে গিয়েছিলেন। তার টার্গেট হতো সাধারণত দুশমনের রসদ। এবারও তিনি তার কমান্ডোদের ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যান। তার সঙ্গে আছে সলিতাওয়ালা তীর। সামান্য দাহ্য পদার্থ, বর্শা, তরবারী ও খঞ্জর। শত্রুর রসদ এখান থেকে অনেক দূরে। আন-নাসেরের জন্য একটি বিশেষ সুবিধা হলো, এই ভুখণ্ডটি না উন্মুক্ত ময়দান, না বালুকাময় প্রান্তর। বরং জায়গাটি দূর-দূরান্ত পর্যন্ত পার্বত্য ও টিলাময়, যার অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সহজ। দিনের বেলা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি ঘোড়া লুকিয়ে রাখা যায়। সম্মিলিত বাহিনীর রসদ- যাতে সৈন্যদের খাদ্যদ্রব্য ও পশুপালের জন্য শুকনা ঘাস, দানাদার খাদ্য ইত্যাদি রয়েছে- পিছনে আসছে। এই মালপত্রে তীর-ধনুক-বর্শাও আছে। আন-নাসের প্রথম রাতেই শত্রু বাহিনীর এই রসদের উপর সফল আক্রমণ পরিচালনা করেন। বিপুল পরিমাণ রসদ অগ্নিতীরে ভষ্ম হয়ে গেছে।
আন-নাসের কমান্ডোদেরসহ দিনের বেলা এক স্থানে লুকিয়ে থাকে। সে দেখতে পায়, শত্রুবাহিনী খানা-খন্দক ও টিলার আড়ালে তাদের অনুসন্ধান করছে। সে-তার কমান্ডোদেরকে এদিক-ওদিক উপযুক্ত উঁচু স্থানে বসিয়ে রাখে। তারা ধনুকে তীর সংযোজন করে ওঁৎ পেতে বসে থাকে। শত্রুসেনারা দূর থেকেই ফেরত চলে যায়। সূর্যাস্তের পর সে চুপি চুপি রসদ বহরের উপর দৃষ্টি রাখে।
কাফেলা একস্থানে ছাউনি ফেলে। কিন্তু এ রাত আক্রমণ করা সহজ মনে হলো না। দুশমন চারদিকে কঠোর টহল প্রহরার ব্যবস্থা করে রেখেছে। এই প্রহরায় পদাতিকও আছে, অশ্বারোহীও আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আন-নাসের হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। দুশমনের এখনো বহু রসদ অক্ষত আছে। কমান্ডো হামলার মাধ্যমে রসদ ধ্বংস একটি বিশেষ কৌশল। এ কাজের জন্য তিনি এমন বাহিনী গঠন করে রেখেছেন, যারা চেতনার দিক থেকে উন্মাদ ও উগ্র প্রকৃতির। তাদের বীরত্ব অস্বাভাবিক ও বুদ্ধিমত্ত্বা ঈর্ষণীয়। এই জানবাজদের সততা ও ঈমানী চেতনার অবস্থা হলো, তারা এতো দূরে গিয়েও দায়িত্ব পালনে জানবাজির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে থাকে। যেখানে তাদের খোঁজ নেয়ার মতো কেউ থাকে না।
