দুশমনের মালপত্র এবং পশুপাল ইত্যাদির ব্যাপারে সুলতানের নির্দেশ কী?- এক সালার সুলতান আইউবীকে জিজ্ঞেস করেন- যুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেছে। আল্লাহ আমাদের জয়ী করেছেন।
না, আমি এখনো এই আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হইনি- সুলতান আইউবী বললেন- যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। আমার পাঠ এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যেও না। সবে আমরা দুশমনের শৃঙ্খলা বিনষ্ট করেছি মাত্র। আমাদের কোনো ইউনিট তাদের পার্শ্ব বাহিনীর উপর হামলা করেছে কি না, করেনি। আমার সন্দেহ, উভয়টি না হলেও তাদের এক পার্শ্ব নিরাপদ আছে। তারা তিনটি ফৌজের যৌথ বাহিনী ছিলো। তাদের সালার ঈমান বিক্রেতা হতে পারে; কিন্তু এমন আনাড়ী নয় যে, তার যেসব ইউনিট যুদ্ধে অংশ নেয়নি, তাদেরকে জবাবী হামলার জন্য ব্যবহার করবে না। তার রিজার্ভ বাহিনীও অক্ষত এবং প্রস্তুত আছে।
তাদের কেন্দ্র খতম হয়ে গেছে মাননীয় সুলতান! সালার বললেন তাদেরকে নির্দেশ দেয়ার মতো কেউ অবশিষ্ট নেই।
না থাকুক, খৃস্টানদের ভয় তো উড়িয়ে দেয়া যায় না- সুলতান বললেন যদিও আমার কাছে এই তথ্য নেই যে, খৃস্টানরা কাছে-ধারে কোথায় অবস্থান করছে। কিন্তু এই অঞ্চলটা পাহাড়ী। এখানে টিলাও আছে, বিস্তৃত সমতল ভূমিও আছে। কোথাও ঝোঁপ-জঙ্গলও আছে। কিছু এলাকা বালুকাময়। চোখে বেশী দূর পর্যন্ত দেখা যায় না। শত্রু আর সাপের উপর কখনো আস্থা রাখা উচিত নয়। ওরা মৃত্যুর সময়ও, ছোবল মেরে যায়। সাইফুদ্দীনের সালার মুজাফফর উদ্দীনের কোনো সংবাদ আমার জানা নেই। তোমরা জানো, মুজাফফর উদ্দীন সহজে পালাবার মতো মানুষ নয়। আমি তার অপেক্ষায় আছি। তোমরা চোখ খোলা রাখে। বাহিনীগুলোকে একত্রিত করো। মুজাফফর উদ্দীন যদি আমার প্রশিক্ষণ মা ভুলে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে সে আমার উপর পাল্টা আক্রমণ চালাবে।
***
সুলতান আইউবীর আশংকা ভিত্তিহীন ছিলো না। প্রিয় পাঠক! হামাত যুদ্ধে সাইফুদ্দীনের জনৈক সালার মুজাফফর উদ্দীন ইবনে যাইনুদ্দীনের আলোচনা পড়েছেন। মুজাফফর উদ্দীন এক সময় আইউবী বাহিনীর সালার ছিলেন এবং আইউবীর কেন্দ্রীয় পটভূমিকে সামনে রেখে সুলতান আইউবী যুদ্ধের পরিকল্পনা ঠিক করেন এবং কিভাবে রণাঙ্গনে তাতে রদবদল করেন। মুজাফফর উদ্দীন একে তো জন্মগত যোদ্ধা। অপরদিকে প্রশিক্ষণ অর্জন করেছেন সুলতান আইউবীর নিকট থেকে। সব মিলিয়ে তিনি রণাঙ্গন থেকে পিছপা হওয়ার মতো লোক নন।
মুজাফফর উদ্দীন ছিলেন সাইফুদ্দীনের নিকটাত্মীয় (খুব সম্ভব চাচাতো ভাই)। সুলতান আইউবী যখন মিশর থেকে দামেস্ক আগমন করেন এবং মুসলিম আমীরগণ তার বিরুদ্ধে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান, তখন মুজাফফর উদ্দীন সুলতানকে কিছুই না বলে তার ফৌজ থেকে বের হয়ে শত্রু শিবিরে চলে যান।
তুর্কমানের এই যুদ্ধের আগে হামাত যুদ্ধে মুজাফফর উদ্দীন সুলতান আইউবীর পার্শ্বের উপর এমন তীব্র আক্রমণ করেছিলেন, যার মোকাবেলার জন্য সুলতান আইউবী পার্শ্ব বাহিনীর নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের মতে, সেদিন যদি সুলতান আইউবী নিজে সেনাপতিত্ব না করতেন, তাহলে মুজাফফর উদ্দীন যুদ্ধের গতি পাল্টে দিতেন। সুলতান আইউবী মুজাফফর উদ্দীনকে যুদ্ধবিদ্যার ওস্তাদ বলে স্বীকার করতেন। এবার তুর্কমানের গুপ্তচররা তাকে সম্মিলিত শক্ৰবাহিনী সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রদান করেছে, তার মধ্যে একটি হলো, মুজাফফর উদ্দীনও এই বাহিনীতে আছেন। কিন্তু তিনি বাহিনীর কোন্ অংশের সঙ্গে আছেন, তা জানা যায়নি। সুলতান কয়েকজন যুদ্ধবন্দীকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন। কিন্তু তারা মুজাফফর উদ্দীনকে বাহিনীতে উপস্থিত থাকার বিষয়টা সত্যায়ন করলেও কেউ বলতে পারেনি তিনি বাহিনীর কোন্ অংশে আছেন।
হতে পারে বন্দীরা জানা সত্ত্বেও বিষয়টা গোপন রেখেছে- সুলতান আইউবী তার সালারদের বললেন- মুজাফফর উদ্দীন যুদ্ধ না করে ফিরে যাবে আমি বিশ্বাস করি না। সে আমার শিষ্য। আমি তার যোগ্যতা জানি। জানি তার স্বভাব-চরিত্রও। সে হামলা করবে। পরাজয় নিশ্চিত জানলেও করবে। তবে আমি চাই সে হামলা করুক। অন্যথায় আমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে না।
সালাহুদ্দীন আইউবী যেনো বলতে না পারে, মুজাফফর উদ্দীনও পালিয়ে গেছে- সাইফুদ্দীনের সালার মুজাফফর উদ্দীনের কণ্ঠ। তুকমান থেকে দুআড়াই মাইল দূরে ধ্বনিত হচ্ছিলো- আমি যুদ্ধ না করে ফিরে যাবো না।
সুলতান আইউবী যে সময়টায় সাইফুদ্দীনের প্রাসাদোপম বিশ্রামাগারে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঠিক সে সময় সাইফুদ্দীনের নিকট সংবাদ পৌঁছে সালাহুদ্দীন আইউবী কিভাবে যেনো আগেই জেনে ফেলেছেন, তার উপর হামলা আসছে। সে কারণেই আমরা তার ফাঁদে আটকা পড়েছি। এখন এখানে যুদ্ধ করা অনর্থক। ভালোয় ভালো আপনারাও ফিরে যান এবং কোনো একটি উপযুক্ত স্থানে যুদ্ধ করানোর জন্য বাহিনীগুলোকে পেছনে সরিয়ে নিন।
আপনার যে কোনো আদেশ-নিষেধ মান্য করতে আমাদের কোন আপত্তি নেই- মুজাফফর উদ্দীনের এক নায়েব সালার বললো- কিন্তু যেখানে আমাদের বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিহত ও আহত হয়েছে, অনেকে পালিয়ে গেছে, এমতাবস্থায় এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা পাল্টা আক্রমণ করা আমার নিকট যুক্তিযুক্ত বলে মনে হচ্ছে না।
