সুলতান আইউবীর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে। তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে শুরু করে।
৫.৫ জানবাজ
জানবাজ
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিজয়ী কমান্ডারদের সম্মুখে দুশমনের অগনিত লাশ পড়ে আছে। দিশেহারা আহত উট-ঘোড়াগুলো হতাহতদের পিষে চলেছে। শত্রু শিবিরের যেসব সৈনিক পালাতে পারেনি, তারা অস্ত্র ত্যাগ করে একস্থানে জড়ো হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক ঢাল-তরবারী, ধনুক-বর্শা, তাঁবু ও অন্যান্য আসবাবপত্র দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সেই জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আছেন, যেটি তাঁর শক্রজোটের প্রধান সেনানায়ক সাইফুদ্দীনের হেডকোয়ার্টার ও বিশ্রামাগার ছিলো। গাজী সাইফুদ্দীন তার বাহিনীর পরাজয় ও সুলতান আইউবীর জয় নিশ্চিত টের পেয়ে কাউকে কিছু না বলে কাপুরুষের ন্যায় পালিয়ে গিয়েছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি। তার পলায়ন যেমন ছিলো গোপনীয়, তেমনি ছিলো লজ্জাজনক। হেরেমের বেশ কটি রূপসী মেয়ে তার সঙ্গে ছিলো, ছিল নর্তকী ও সোদানা। নিজ সৈন্যদের ভাতা প্রদান ও আইউবীর লোকদের ক্রয় করার জন্য তিনি এই স্বর্ণমুদ্রা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। মহামূল্যবান মনোহরী কাপড়ের তাবু ও শামিয়ানার তৈরি বিশ্রামাগারটি যেন একটি রাজ প্রাসাদ। সে যুগের যুদ্ধবাজ শাসকবর্গ এরূপ মহল ও যতোসব বিলাস সামগ্রী সঙ্গে রাখতেন। গাজী সাইফুদ্দীন তেমনই এক শাসক ছিলেন। তিনি মদের পিপা এবং রং-বেরঙের পেয়ালা-মটকাও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।
সুলতান আইউবী মন পাগলকরা এই প্রাসাদটির প্রতি এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ সাইফুদ্দীনের পালংকটির উপর তার চোখ পড়ে। পালংকের উপর সাইফুদ্দীনের তরবারীটি পড়ে আছে। পালাবার সময় তিনি তারবারীটাও নিতে ভুলে গেছেন। সুলতান আইউবী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে তারবারীটা হাতে তুলে নেন। ধীরে খাপ থেকে তরবারীটা বের করেন। তারবারীটা ঝিকমিক করছে। সুলতান তারবারীটার প্রতি এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর মুখ ঘুরিয়ে পার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সালারের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন- মুসলমানের তরবারীর উপর যখন নারী ও মদের ছায়া পড়ে, তখন সেটি লোহার অকেজো টুকরায় পরিণত হয়ে যায়। এই তরবারীর ফিলিস্তিন জয় করার কথা ছিলো। কিন্তু খৃস্টানরা একে তাদের পাপ পংকিলতায় চুবিয়ে কাঠের অকেজো লাঠিতে পরিণত করেছে। যে তরবারী মদ দ্বারা সিক্ত হয়, সেই তরবারী রক্ত থেকে বঞ্চিত থাকে।
সাইফুদ্দীনের বিশ্রামাগারের পার্শ্বেই আরেকটি প্রশস্ত মনোরম তাঁবু। তার মধ্যে কতগুলো অর্ধনগ্ন রূপসী মেয়ে ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে। তারা তাদের অশুভ পরিণাম চিন্তায় বিভোর। তারা জানে, বিজয়ী বাহিনীর হাতে ধরা খেলে মেয়েদের কী দশা হয়! এমন চিত্তাকর্ষক মেয়েদের মুঠোয় পেলে কে না পশু হয়। কিন্তু সুলতান আইউবীর ঘোষণা শুনে তারা নির্বাক। আইউবী ঘোষণা দিলেন- তোমরা মুক্ত। তোমরা যেখানে ইচ্ছা যেতে পারো। সসম্মানে ও নিরাপদে সেখানে পৌঁছিয়ে দেয়া হবে।
সুলতান আইউবীর এই অভাবিত ঘোষণায় তারা আরো সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সুলতানের এই ঘোষণাকে উপহাস মনে করে তারা অধিকতর লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের ভয়ে মুষড়ে পড়ে। সুলতান মেয়েদেরকে নিজের হেফাজতে নিয়ে যান। যুদ্ধের ময়দানে নারীর উপস্থিতিকে সুলতান সহ্য করতেন না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলো, তোমরা কতজন ছিলে? তারা জানায়, এখন যে কজন আছি, আরো দুজন ছিলো। তারা এখন নিখোঁজ। তারা মুসলমান ছিলো না। তারা দুজন সাইফুদ্দীনকে কজা করে রাখতো। হয়তোবা তারাও সাইফুদ্দীনের সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
সেকালের যুদ্ধ-বিগ্রহে সাধারণত যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে বিজয়ী বাহিনীর সৈন্যরা পরাজিত শত্রু বাহিনীর ফেলে যাওয়া সম্পদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। পরাজিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতির বিশ্রামাগার তথা হেডকোয়ার্টারের উপর লুটিয়ে পড়তো অধিকাংশ সৈনিক। সেখানে থাকতো সম্পদের খাজানা, মদ আর নারী। এসবের দখল নিয়ে তাদের মাঝে বিবাদ সংঘাতও বেঁধে যেতো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সুলতান আইউবীর নীতি ছিলো খুবই কঠোর। কোন অফিসারের জন্যও তার পদমর্যাদা যতোই উঁচু হোক না কেন- মালে গনীমতে হাত লাগানোর অনুমতি ছিলো না। তিনি কোনো একটি ইউনিটকে মালে গনীমত কুড়িয়ে এক জায়গায় জমা করার দায়িত্ব প্রদান করতেন। তারপর নিজ হাতে তা বণ্টন করতেন। কিন্তু তুমানের যুদ্ধ শেষে সুলতান আইউবী মালে গনীমত সম্পর্কে কোনো নির্দেশ জারি করলেন না। তিনি নিজ বাহিনী এবং শত্রুপক্ষের আহতদের তুলে সেবা-চিকিৎসা এবং যুদ্ধবন্দীদের আলাদা করার নির্দেশ প্রদান করেন।
সুলতান আইউবী অত্যন্ত কঠোরভাবে রণাঙ্গনের শৃঙ্খলা বিধান করতেন। এই যুদ্ধে তার শত্রুপক্ষ অতিশয় বিশৃঙ্খলভাবে পলায়ন করেছিলো। তার কোনো কোনো ইউনিট পলায়নপর শত্রুসেনাদের ধাওয়াও করেছিলো। এই পশ্চাদ্ভাবনেও তারা শৃঙ্খলা বিনষ্ট করেনি। সুলতান আইউবী ধাওয়াকারীদের ফিরিয়ে আনেন এবং ডান ও বাম পার্শ্বকে ঠিক যুদ্ধ পূর্বের অবস্থার ন্যায় প্রস্তুত রাখেন। যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরও তিনি পার্শ্ব বাহিনীকে প্রত্যাহার করেননি। তাছাড়া তিনি তাঁর রিজার্ভ বাহিনীটিকে তলব করে নিজের কমান্ডে নিয়ে নেন।
