সর্বাগ্রে হারিছকে ঘোড়া থেকে নামানো হলো। এখনো সে জীবিত। ফাওজিয়া ও তার ভাবী দ্রুত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে কথা বলতে শুরু করে। ফাওজিয়া সুলতান আইউবীকে জানায়, সম্মিলিত বাহিনী আক্রমণের জন্য এসে পড়েছে। হারিছ অস্ফুট স্বরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য প্রদান করে এবং কথা বলতে বলতেই চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ঝড় প্রশমিত হতে শুরু করে। সুলতান আইউবী তার সালারদেরকে তলব করে নির্দেশ দেন, তাঁবু টানোর প্রয়োজন নেই। সৈনিকদেরকে ইউনিটে ইউনিটে একত্রিত করো। কমান্ডো দলটিকে এক্ষুণি ডেকে আনো। কী ঘটতে যাচ্ছে, সুলতান সালারদের তা অবহিত করেন এবং রাতারাতি কী কী মহড়া দিতে হবে ও কী কী কাজ করতে হবে বলে দেন।
ঝড়ের তীব্রতা অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু রাতের ঘোর আঁধারে ছেয়ে আছে প্রকৃতি। সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যরা নিজেদের সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সৈনিক শুয়ে পড়েছে। এই বিশৃঙ্খলার কারণে রাতের আক্রমণ মুলতবী করা হয়েছে। পশুগুলোও এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করে বেড়াচ্ছে।
মধ্য রাতের পর। সাইফুদ্দীনের সৈন্যরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু সুলতান আইউবীর ক্যাম্প সম্পূর্ণ সজাগ ও কর্মতৎপর। আইউবী সাইফুদ্দীনকে স্বাগত জানানোর জন্য কী কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন, সাইফুদ্দীদের তা অজানা।
***
ভোর হয়েছে। সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত বাহিনীর মাঝে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। রসদ উড়ে গেছে। দিশেহারা উট-ঘোড়াগুলো সৈন্যদের পিষে মেরেছে। সবকিছু গুছিয়ে সৈন্যদের সংগঠিত করতে দিনের অর্ধেকটা কেটে গেলো। সাইফুদ্দীন সম্মুখ দিক থেকে প্রকাশ্যে সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করার জন্য তার সালারদের নির্দেশ দেন। তিনি জানেন, সুলতান আইউবী তার এই অভিযান সম্পর্কে বে-খবর।
বিকাল বেলা। সাইফুদ্দীনের বাহিনী আইউবী বাহিনীর উপর আক্রমণ করলো। ডানে-বাঁয়ে টিলা আর বড় বড় পাথর। মুহূর্তের মধ্যে অপ্রস্তুত আইউবী বাহিনী নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কথা। সাইফুদ্দীনের কামনাও তা ই। কিন্তু একী! টিলা আর পাথরের আড়াল থেকে উল্টো হামলাকারীদের উপরই তীরবৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু করে। সম্মুখ দিক থেকে ধেয়ে আসতে শুরু করে আগুনের গোলা। দাহ্য পদার্থ ভর্তি পাতিল এসে সৈন্যদের মাঝে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে আর ভেতরের তরল পদার্থগুলো ছিটিয়ে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে তার উপর মিনজানীক দ্বারা নিক্ষিপ্ত অগ্নিগোলা এসে পড়ছে আর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠছে।
সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ থেমে গেছে। সাইফুদ্দীন তার বাহিনীকে পেছনে সরিয়ে নিয়ে যান এবং আক্রমণের বিন্যাস ও পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ফেলেন। কিন্তু তার সৈন্যরা পেছনে সরে যাওয়ামাত্র পেছন দিক থেকেও তাদের উপর এমন তীব্র আক্রমণ আসে যে, তাদের পরিকল্পনা ও মনোবল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
এমনি আক্রমণ হলো বাহিনীর উভয় পার্শ্বের উপরও। সাইফুদ্দীনের কেন্দ্রীয় কমান্ড শেষ হয়ে গেছে। রাতে আক্রমণ অব্যাহত থাকে। সাইফুদ্দীন আরো পেছনে সরে আসেন। এবার শুরু হলো তীরবৃষ্টি। সুলতান আইউবীর বাহিনী সারারাত তৎপর থাকে। শেষ রাতের আলো-আঁধারিতে সুলতান একটি টিলার উপর উঠে রণাঙ্গনের পরিস্থিতি অবলোকন করেন। তার সম্মুখে এখন যুদ্ধের শেষ পর্ব। তিনি দূত মারফত তার রিজার্ভ বাহিনীর নিকট নির্দেশ প্রেরণ করেন। অল্পক্ষণের মধ্যে ধাবমান অশ্বের ক্ষুরধ্বনিতে মাটি কেঁপে ওঠে। পদাতিক বাহিনী ডান-বাম থেকে বেরিয়ে আসে। আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে আকাশ-বাতাশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
এই আক্রমণের ধকল সালমানোর সাধ্য সাইফুদ্দীনের নেই। তারা এখন সম্পূর্ণরূপে আইউবী বাহিনীর বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ। সম্মুখ থেকে তীব্র আক্রমণ এসে পড়ে। শুধু সাইফুদ্দীনের সৈনিকদেরই নয়, স্বয়ং তারও মনোবল ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। উট-গোড়াগুলো আহত সৈনিকদের পিষে মারছে। অবশেষে তারা যার যার মতো অস্ত্রসমর্পণ করতে শুরু করে।
সুলতান আইউবীর যে বাহিনী সাইফুদ্দীনের পেছনে ছিলো, তারা এগিয়ে আসছে। ডান ও বামদিক থেকে কমান্ডো সেনারা মার মার কাট কাট রবে আঘাতের পর আঘাত হানছে। সাইফুদ্দীনের বাহিনী আইউবীর পিঞ্জিরায় আবদ্ধ হয়ে গেছে।
সুলতান আইউবীর সৈন্যরা সাইফুদ্দীনের কেন্দ্রে পৌঁছে যায়। সেখানে মদের পিপা-পেয়ালা ছাড়া আর কিছুই নেই। সেখান থেকে যাদেরকে গ্রেফতার করা হলো, তারা বললো- আমাদের প্রধান সেনা অধিনায়ককে শেষবারের মতো একটি পাথরের আড়ালে দেখেছিলাম। তারপর থেকে আর তার কোন পাত্তা নেই।
সুলতান আইউবী তাকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেন। অনেক অনুসন্ধান করা হলো। কিন্তু পাওয়া গেলো না। তিন বাহিনীর প্রধান সেনা অধিনায়ক তার সৈনিকদেরকে সুলতান আইউবীর দয়ার উপর ফেলে রেখে পালিয়ে গেছেন।
রাতের বেলা। ফাওজিয়া তুর্কমানের সবুজ-শ্যামলিমায় স্থাপিত একটি তাবুতে ভাইয়ের লাশের কাছে বসে স্বগতোক্তি করছে- আমি রক্তের নদী পার হয়ে এসেছি, যার উপর কোনো পুল ছিলো না। হারিছ। আমি তোমার কর্তব্য পালন করেছি।
সুলতান আইউবী এসে তাঁবুতে প্রবেশ করেন। ফাওজিয়া জিজ্ঞেস করে খবর কী সুলতান! আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যায়নি তো?
আল্লাহ দুশমনকে পরাজয় দান করেছেন। তুমি জয়ী। তোমার জীবন স্বার্থক। তুমি…।
