ঘোড়া লোকটার নিকটে এসে পৌঁছলে ফাওজিয়া চিৎকার করে ওঠে হারিছ? ভাবী! বেঁচে আছে। তার দেহে অনেকগুলো ক্ষত।
ফাওজিয়াদের সঙ্গে পানি আছে। তারা হারিছকে পানি পান করায়। কিছুটা চৈতন্য আসলে হারিছ জিজ্ঞেস করে- আমি কি ঘরে? দাউদ কোথায়?
ফাওজিয়া ঘটনার ইতিবৃত্ত শোনায়। দাউদের শাহাদাঁতের সংবাদ জানায় এবং তারা কী কাজে কোথায় যাচ্ছে, হারিছকে অবহিত করে। হারিছ বললো- আমাকেও ঘোড়ায় তুলে নাও এবং সময় নষ্ট না করে তুকমান অভিমুখে ঘোড়া হাঁকাও।
ফাওজিয়া ও তার ভাবী হারিছকে পাজাকোলা করে ঘোড়ার পিঠে তুলে নেয়। ফাওজিয়া তার পেছনে বসে। হারিছের দেহে এক ফোঁটাও রক্ত নেই। লোকটা বেঁচে আছে শুধু আত্মার শক্তিতে। কর্তব্য এখানো শেষ হয়নি বলেই তার এই বেঁচে থাকা। ফাওজিয়া তার পিঠটা নিজের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নিয়ে। তাকে এক বাহু দ্বারা আগলে রাখে। হারিছ অস্ফুট স্বরে ডান-বাম বলে বোনকে পথনির্দেশ করছে।
সাইফুদ্দীনের কমান্ডে আইউবীর শত্রু বাহিনী তুর্কমানের কাছাকাছি পৌঁছতে আর বেশি বাকি নেই। এদিকে ফাওজিয়া, হারিছ ও হারিছের স্ত্রী এক নিরাপদ পথে তুর্কমানের দিকে এগিয়ে চলছে। ধীরে ধীরে দিগন্ত থেকে আকাশ বাদামী বর্ণ ধারণ করছে এবং এই রংটা উপর দিকে উঠে যাচ্ছে। ফাওজিয়ার ভাবীর দিগন্তপানে চোখ পড়া মাত্র আঁৎকে ওঠে এবং চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে- ফাওজিয়া, ওদিকে চেয়ে দেখ।. হারিছ ক্ষীণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- কী ফাওজিয়া!
ধূলিঝড়। ফাওজিয়া বললো। তার অন্তরে ভয় ঢুকে গেলো।
হারিছ এই ভূখণ্ডের এসব ধূলিঝড় সম্পর্কে অবহিত। এলাকাটা পাথুরে বটে; কিন্তু কিছু বালুকাময় অঞ্চলও আছে। ধূলিঝড় শুরু হলে টিলা ও পাথর খণ্ডগুলো বালিতে সমাধিস্ত হয়ে যায়। মানুষ এবং অন্যান্য জীব-জন্তুর জন্য তা কেয়ামতের রূপ ধারণ করে। কিন্তু এইমাত্র ফাওজিয়া ও তার ভাবী যে ঝড় দেখতে পেলো, তা অত্র অঞ্চলের আরো পাঁচ-দশটি ভয়ংকর ঝড়ের একটি, যেটি ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। মেজর জেনারেল আকবর খান তার ইংরেজি গ্রন্থ গেরিলা ওয়ার ফেয়ার-এ কয়েকজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ও মুসলিম কাহিনীকারের সূত্রে লিখেছেন- যেদিন আল-মালিকুস সালিহ, গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত বাহিনী সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকটে পৌঁছে গিয়েছিলেন, ঠিক সেসময় এমন এক ধূলিঝড় উঠেছিলো যে, নিজের নাকের আধা হাত দূরে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না। সুলতান আইউবীর জানা ছিলো না যে, এই ঝড়ের মাঝে আরো একটি ঝড় ধেয়ে আসছে তার দিকে।
ইতিহাসে একথাও লিখা আছে। এই পরিস্থিতিতে সম্মিলিত বাহিনী সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণে বিলম্ব করে, যা ছিলো মূলত প্রধান সেনানায়কের ভুল সিদ্ধান্ত। সত্যের পথের পথিকদের সাহায্য করা আল্লাহর ওয়াদা। বলা যেতে পারে, এই প্রক্রিয়ায় মহান আল্লাহ দুটি বীরাঙ্গনা মুসলিম নারীর ঈমানী চেতনার লাজ রক্ষা করেছেন। এক বোন তার আহত মুজাহিদ ভাইকে আগলে ধরে মুজাহিদীনে ইসলামকে কাফিরদের আক্রমণ সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য ছুটে চলছিলো। মনে তার নিজের কিংবা ভাইয়ের কোনো ভাবনা নেই। ভাবনা তার একটাই- ইসলাম ও সালতানাতে ইসলামিয়া।
ঝড় এতো দ্রুত ধেয়ে আসে যে, কেউ আত্মসংবরণ করার সুযোগ পায়নি। সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে বড় বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের উট-ঘোড়াগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। কমান্ডারদের দৃঢ় বিশ্বাস, অল্প সময়ের মধ্যে ঝড় থেমে যাবে এবং তারা বাহিনীকে সংগঠিত করে নিতে সক্ষম হবে। কিন্তু ঝড় উত্তরোত্তর তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে চলছে।
***
সুলতান আইউবীর ছাউনি এলাকার অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। তাঁবুগুলো উড়ছে। রশিবাধা উট-ঘোড়াগুলো প্রলয় সৃষ্টি করে ফিরছে। বালি তো আছেই, পাশাপাশি নুড়ি-কংকরও উড়ে এসে গায়ে বিদ্ধ হচ্ছে। চারদিকের আর্ত চিৎকার এমন রূপ ধারণ করেছে, যেনো প্রেতাত্মারা চিৎকার করছে। সূর্য এখনো উদিত হয়নি। কিন্তু মনে হচ্ছে, মরুঝড় আকাশের সূর্যটাকেও উড়িয়ে নিয়ে গেছে। কমান্ডারগণ চিৎকার করে ফিরছেন। সৈন্যরা উড়ন্ত তাঁবুগুলোকে সামলাতে গিয়ে নিজেরাই বেসামাল হয়ে পড়ছে।
তিন-চারজন সৈনিক একটি পাথরের আড়ালে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। ধীর-পদবিক্ষেপে অগ্রসরমান একটি ঘোড়া এসে তাদের উপর উঠে পড়ার উপক্রম হয়। সৈন্যরা এদিক-ওদিক হুমড়ি খেয়ে পড়ে চিৎকার করে ওঠে। ঘোড়াটাকে থামাও। হতভাগা! কোথাও আড়াল হয়ে যাও।
ঘোড়া থেমে যায়। এক সৈনিক তার সঙ্গীদের বললো- কিছু বল না, মহিলা। অন্য একজন বললো- দুজন।
তারা ফাওজিয়া ও তার ভাবী। ঝড়ের কবলে পড়ে পথ ভুলে এদিকে এসে পড়েছে মনে করে সৈনিকরা তাদের ঘোড়ার বাগ ধরে ফেলে এবং একটি পাথরের আড়ালে নিয়ে যায়।
আমাদেরকে সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছিয়ে দিন- চারদিকের হট্টগোলের মধ্যে চিৎকার করে ফাওজিয়া বললো- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কোথায়? আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়গাম নিয়ে এসেছি। আমাদের তাড়াতাড়ি সুলতানের নিকট নিয়ে যান। অন্যথায় সকলে মারা পড়বেন।
সৈনিকরা ঘোড়ার উপর একজন রক্তাক্ত জখমীও দেখতে পায়। তারা লাগাম ধরে বড় কষ্টে ঘোড়াটাকে সুলতান আইউবীর তাবুর নিকট নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে তাঁবু নেই। উড়ে গেছে। সুলতান কোথায় আছেন, জেনে নিয়ে কমান্ডার মেয়েগুলোকে তাঁর নিকট নিয়ে যায়। সুলতান বৃহদাকার একটি পাথরের আড়ালে বসে আছেন। দুটি মেয়েকে দেখেই সুলতান দ্রুত দাঁড়িয়ে যান।
