এখন আর দাউদ ঘোড়া হাঁকাচ্ছে না, বরং ঘোড়া তাকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। এবার দাউদের মনে হচ্ছে, তার দেহের জোড়াগুলো যেনো আলাদা হয়ে যাচ্ছে। একবার মাথাটা একদিকে হেলে গিয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। দাউদ নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে।
***
আবারো ঘোঁড়া থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় দাউদ। নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু পারলো না। দাউদ তার পায়ের নীচে মাটির অস্তিত্ব অনুভব করে। তার চোখের সম্মুখে শুধুই অন্ধকার।
একসময় যখন খানিক চৈতন্য ফিরে আসে, তখন দাউদ উপলব্ধি করে এখন রাত এবং তাকে কে একজন আগলে রেখেছে। লোকটাকে শক্র মনে করে তার থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তার কানে এক নারীকণ্ঠ প্রবেশ করে- দাউদ! তুমি ঘরে আছো, ভয় পেও না। দাউদ কণ্ঠটা চিনে ফেলে ফাওজিয়ার কণ্ঠ। চেতনাহীন অবস্থায় নিজে নিজেই সে হারিছের বাড়ি এসে পৌঁছেছিলো। আল্লাহ তাকে পথ দেখিয়ে গন্তব্যে নিয়ে এসেছেন।
বাপজান কোথায়? জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর দাউদের প্রথম উক্তি।
তিনি বাইরে চলে গেছেন- ফাওজিয়া জবাব দেয়- আগামীকাল কিংবা পরশু আসবেন।
ফাওজিয়া ও তার ভাবী দাউদের ক্ষতস্থান মুছতে শুরু করে। এ সময়ে দাউদ পানি তলব করে। ফাউজিয়া পানি এনে দিলে দাউদ তা পান করে বললো- ফাওজিয়া! তুমি বলেছিলে পুরুষের কাজ নারীরাও করতে পারে। আমার ক্ষতস্থান ধুয়ে লাভ নেই। ভেতরে রক্ত নেই। আমি সুস্থ থাকলে যতো প্রয়োজনই হোক, তোমাদেরকে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিতাম না। কিন্তু বিষয়টা আমার-তোমার ব্যক্তিগত নয়। তুমি সাহস করলে এবং জীবন ও সম্ভ্রমের ঝুঁকি নিলে একটি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পেতে পারে। অবর্ণনীয় এক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারে ইসলামী দুনিয়া।
দাউদ ফাওজিয়াকে কিভাবে তুকমান যেতে হবে বুঝিয়ে দেয়। তারপর হালব, হাররান ও মসুলের বাহিনীসমূহ যৌথ কমান্ডের অধীনে কিভাবে আসছে, কোন্ দিক থেকে আসছে এবং তাদের পরিকল্পনা কী, ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়ে বললো- তোমার ভাই এই কর্তব্য পালন করতে গিয়ে শাহাদাতবরণ করেছে।
ফাওজিয়া প্রস্তুত হয়ে যায়। তার সঙ্গে প্রস্তুতি গ্রহণ করে হারিছের স্ত্রীও। একটি ঘোড়া নিজেদের সংরক্ষণে আছে। আর একটি আছে দাউদের। ফাওজিয়া ও তার ভাবী দাউদকে এই অবস্থায় ঘরে রেখে কিভাবে যাবে ভাবছে।
ফাওজিয়া- দাউদ ক্ষীণ কণ্ঠে বললো- আমার কাছে এসো।
ফাওজিয়া দাউদের নিকট আসে। দাউদ তার ডান হাতটা মুঠো করে ধরে বহু কষ্টে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা টেনে বললো- সত্যের পথের পথিকদের বিবাহ আকাশে সম্পাদিত হয়ে থাকে। তাদের বরযাত্রা গন্তব্যে পৌঁছে কণ্টকাকীর্ণ পথ বেয়ে। আমাদের বিয়ের উৎসবে আকাশে তারকার বাতি প্রজ্বলিত করা হবে।
দাউদের মাথাটা একদিকে কাত হয়ে ঢলে পড়ে। ফাওজিয়া চিৎকার দেয় দাউদ। ততক্ষণে দাউদের আত্মা ইহজগত ত্যাগ করে চলে গেছে অনন্ত শান্তিময় জান্নাতে। ফাওজিয়ার ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ফাওজিয়াকে সবকিছু বলে-বুঝিয়ে দাউদ শাহাদাত বরণ করে। ঘরটা আল্লাহর হেফাজতে তুলে দিয়ে ফাওজিয়া ও তার ভাবী বেরিয়ে পড়ে। পিঠে জিন কষে এক ঘোড়ায় ফাওজিয়া এবং অপর ঘোড়ায় হারিছের স্ত্রী চড়ে বসে। দাউদের ঘোড়ার পিঠে চপচপে রক্তের দাগ। ঘোড়া দুটো গ্রাম থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়ে দুটো আল্লাহর উপর ভরসা করে গন্তব্যপানে এগিয়ে চলে। পথ তাদের অজানা। দাউদ ফাওজিয়াকে একটি তারকার কথা বলেছিলো। সেই তারকার অনুসরণে তারা এগিয়ে যেতে থাকে।
তিন বাহিনী দিনভর অবস্থান করার পর রাতে আবার রওনা হয়। তুকমান এখন আর বেশি দূরে নয়। সুলতান আইউবী তুর্কমান অভিমুখে ধেয়ে আসা ঝড় সম্পর্কে বেখবর। তিনি অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন বটে; কিন্তু এবার তার শত্রুরা ভালো আয়োজন করে রেখেছে। ইতিহাসবেত্তাগণ লিখেছেন- সালাহুদ্দীন আইউবীর পক্ষে এই সাইমুমের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া বাহ্যত সম্ভব ছিলো না। তার সম্পূর্ণ অসতর্ক অবস্থায় আক্রান্ত হয়ে পড়া নিশ্চিত ছিলো। তিনি তার সালারদের সম্মুখে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, হাব, হাররান ও মসুলের যযাদ্ধারা এতো দ্রুত আক্রমণ করতে সক্ষম হবে না। অথচ সাইফুদ্দীনের প্রতি আল মালিকুস সালিহর পত্র তার হাতে এসে পৌঁছেছিলো।
ফাওজিয়া ও তার ভাবী ভুলেই গেছে যে, তারা নারী। পথে তারা কী কী সমস্যায় পড়তে পারে, সেই চিন্তা তাদের মাথায় নেই। ভাবনা শুধু একটাই কখন তুর্কমান পৌঁছে সুলতান আইউবীকে সংবাদ পৌঁছাবেন, আপনার শত্রুরা ধেয়ে আসছে; আপনি প্রস্তুত থাকুন।
তারা রাতটা ঘোড়ার পিঠে কাটিয়ে দেয়। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। তারা টিলা ও বালুকাময় এলাকার কোল ঘেঁষে অগ্রসর হচ্ছে। হঠাৎ ফাওজিয়া দেখতে পায়, একটি পাথরের সঙ্গে হেলান দিয়ে এক লোক উদাস মনে বসে আছে। লোকটার পরিধানের কাপড় রক্তে লাল হয়ে আছে। ফাওজিয়া তার ভাবীকে ডেকে বললো- দেখ ভাবী! একজন লোক বসে আছে; জখমী মনে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের থামা যাবে না। কে বলবে, কে না কে তবে লোকটার পাশ দিয়েই তাদের যেতে হবে। তারা দেখতে পায়, লোকটা উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে।
