মশালের আলোতে এখন দেখা যাচ্ছে লাশ আর লাশ। প্রতিটি লাশ শুয়ে আছে একটি করে তীর নিয়ে। দৌড়ে এসে মেয়েদের সঙ্গে মিলিত হয় মুবী। এ সময় একটি ঘোড়ার দ্রুত ধাবন শব্দ শুনতে পায় তারা। শঙ্কিত হয়ে ওঠে বালিয়ান। বলো, এখানে বিলম্ব করা ঠিক হবে না। বেটাদের একজন জীবন নিয়ে পালিয়ে গেছে। লোকটা কায়রোর দিকে গেলো বলে মনে হলো। চল, জলদি কেটে পড়ি।
রক্ষীদের ঘোড়াগুলো নিয়ে নিজেদের ছাউনিতে চলে যায় তারা। গিয়ে দেখে, যিনসহ তাদের একটি ঘোড়া উধাও। বুঝতে বাকী রইলো না, রক্ষী-ই নিয়ে গেছে ঘোড়াটি। নিজেদের ঘোড়ার নিকট যেতে না পেরে লোকটা চলে আসে এদিকে। এখানে বাঁধা ছিলো আটটি ঘোড়া। যিনগুলো খুলে রাখা ছিলো পাশেই এক জায়গায়। একটি ঘোড়ায় যিন কষে পালিয়ে গেছে রক্ষী।
চৌদ্দটি ঘোড়ায় যিন বাঁধায় বালিয়ান। মাল-পত্ৰ বোঝাই করে দুটি ঘোড়ায়। অবশিষ্ট ঘোড়াগুলো সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়ে যায় একদিকে।
সুলতান আইউবীর রক্ষীদের হাত থেকে উদ্ধার করে আনা গোয়েন্দা মেয়েরা মুবীকে তাদের ঘটনার ইতিবৃত্ত শোনায়। রক্ষীরা তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলো, তাও জানায় সে। রবিন ও তার সঙ্গীদের ব্যাপারে বলে, পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা মাঠ থেকে অস্ত্র কুড়িয়ে আনতে গিয়েছিলো। কিন্তু বুঝতে পারলাম না, কিভাবে তারা মারা পড়লো।
মুবী বললো, আইউবীর ক্যাম্পে অকস্মাৎ আমার ও রবিনের সাক্ষাৎ হয়ে গিয়েছিলো। সে বলেছিলো, আমি দেখতে পাচ্ছি, যীশুখৃষ্ট আমাদের সফলতা মঞ্জুর করেছেন। অন্যথায় এভাবে তোমার-আমার অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ ঘটতো না। আজ আমার-তোমাদের সাক্ষাৎ তেমনি অনাকাঙিক্ষতভাবেই ঘটে গেলো ঠিক; কিন্তু যীশুখৃষ্ট আমাদের কামিয়াবী মঞ্জুর করেছেন, সে কথা আমি বলবো না। আমার কাছে বরং যীশুকে আমাদের প্রতি রুষ্ট বলেই মনে হয়। যে কাজে আমরা হাত দিয়েছিলাম, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেলো, রোম উপসাগরে আমাদের বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করলো। মিসরে আমাদের সহযোগী শক্তি সুদানীদের নির্মম পরাজয় হলো। এদিকে রবিন ও ক্রিস্টোফরের ন্যায় নির্ভরযোগ্য সাহসী ব্যক্তিদ্বয় এবং এতগুলো সঙ্গী মারা পড়লো! জানি না, আমাদের কপালে কী আছে।
বালিয়ান বললো, চিন্তা করো না, আমাদের জীবন থাকতে তোমাদের প্রতি কেউ হাত বাড়াতে পারবে না। আমার সঙ্গীদের কৃতিত্ব দেখলে-ই তো।
***
কয়েদীদের এ কাফেলা টিলায় যখন লাশের পার্শ্বে দণ্ডায়মান, ঠিক তখন সমুদ্রোপকূলে সুলতান আইউবীর ক্যাম্পে প্রবেশ করে তিনজন আগন্তুক। তাদের পরনে ইতালীয় বেদুঈনদের সাদাসিধে পোশাক। কথা বলতে শুরু করে ইতালী ভাষায়। কিন্তু তাদের ভাষা বুঝছে না ক্যাম্পের কেউ।
আগন্তুকদের পাঠিয়ে দেয়া হয় বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের নিকট। সুলতান আইউবীর অবর্তমানে তিনি এখন ক্যাম্পের কমাণ্ডার। আগন্তুকদের পরিচয় জানতে চান শাদ্দাদ। তারা ইতালী ভাষায় জবাব দেয়। তিনিও তাদের ভাষা বুঝছেন না।
বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ ইতালীয় এক যুদ্ধবন্দীকে ডেকে আনেন কয়েদখানা থেকে। মিসরী ভাষাও তার জানা। তিনি তার মাধ্যমে আগন্তুকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনজনের একজন মধ্য বয়সী। দুজন যুবক। তারা হুবহু একই কথা শোনায়। বলে, খৃষ্টানরা আমাদের তিনজনের তিনটি সুন্দরী বোনকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছিলো। শুনেছি, ওরা নাকি খৃষ্টানদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে আপনাদের ক্যাম্পে এসে পৌঁছেছে। আমরা বোনদের খুঁজে বের করতে এসেছি।
বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ জানান, এখানে সাতটি মেয়ে এসেছিলো। তারাও আমাদেরকে একই কাহিনী শুনিয়েছিলো। ছয়জন আমাদের হাতে বন্দী আছে; সপ্তমজন পালিয়ে গেছে। আমাদের জানা মতে ওরা গুপ্তচর। আগন্তুকরা জানায়, গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে আমাদের বোনদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা নির্যাতিত গরীব মানুষ। একজন থেকে একটি নৌকা চেয়ে নিয়ে বোনদের সন্ধানে এতদূর এসেছি। আমাদের মত গরীবদের বোনেরা গুপ্তচর বৃত্তির সাহস করবে কিভাবে। আপনি যে সাত মেয়ের কথা বললেন, ওরা তাহলে আমাদের বোন হবে না। জানিনা ওরা কারা।
আমাদের নিকট আর কোন মেয়ে নেই। এই সাতজন-ই ছিলো, তাদেরও একজন লাপাত্তা হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ছয়জনকে গত পরশু কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ওদের মধ্যে তোমাদের বোনরা আছে কিনা, দেখতে চাইলে কায়রো চলে যাও। আমাদের সুলতান হৃদয়বান মানুষ, বললে তিনি মেয়েদেরকে দেখাতে পারেন। বললেন বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ।
না, আমাদের বোনরা গুপ্তচর নয়। ঐ সাতজন অন্য মেয়ে হবে। তারা হয়তো সমুদ্রে ডুবে মরেছে কিংবা খৃষ্টান সৈনিকরা তাদের কাছে আটকে রেখেছে। বললো আগন্তুকদের একজন।
বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ একজন সরল-সহজ দয়ালু মানুষ। তিনি আগন্তুক বেদুঈনদের সাজানো কাহিনীতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তাদের বেশ খাতিরদারী করেন এবং স্বসম্মানে বিদায় করে দেন। আলী বিন সুফিয়ান হলে তাদেরকে এত সহজে ছেড়ে দিতেন না। চেহারা দেখেই তিনি বুঝে ফেলতেন, লোকগুলো গুপ্তচর, যা বলছে সব মিথ্যে।
বিদায় নিয়ে চলে যায় তিনজন। কোথায় গেলো তা দেখারও চেষ্টা করলো কেউ। ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সোজা হাঁটা দেয় একদিকে। একটানা চলতে থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তারা ক্যাম্প থেকে বেশ দূরে নিরাপদ এক পাহাড়ী অঞ্চলে ঢুকে পড়ে।
