তোমরা তোমাদের বাহিনীতে চলে যাও- সাইফুদ্দীন বললেন- আমার রক্ষী বাহিনী এসে গেছে। আমি তোমাদেরকে আজীবন স্মরণ রাখবো।
***
রাতের একটা উপযুক্ত সময়ে রওনা হয় তিন বাহিনী। দাউদ ও হারিছ মসুলের একটি ইউনিটে গিয়ে যোগ দেয়। হারিছ অনেকেরই পরিচিত। আগে সে এ বাহিনীতেই কাজ করেছে। দাউদকে কেউ চেনে না। হারিছ তাকে মসুলের শাসনকর্তা সাইফুদ্দীনের প্রেরিত লোক বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। ব্যস্ততার কারণে কেউ দাউদকে যাচাই করে দেখার সুযোগ পায়নি।
তিন সারিতে সম্মুখপানে এগিয়ে চলছে তিন বাহিনী। মধ্যরাত পর্যন্ত চলার পর বাহিনী একটি পার্বত্য এলাকায় এসে উপনীত হয়। ফলে সৈন্যদের সারি বিন্যাস অক্ষুণ্ণ রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দাউদ হারিছকে বললো- এটাই মোক্ষম সুযোগ। চলো, পালাই।
রাতের অন্ধকারকে পুঁজি করে দুজন ধীরে ধীরে নিজ নিজ ঘোড়া একদিকে সরিয়ে নিতে এবং বাহিনী থেকে আলাদা হতে থাকে। দাউদের পরিকল্পনা হলো, দূরে গিয়ে তীব্র গতিতে ঘোড়া হাঁকিয়ে পালিয়ে যাবে। দিনে বাহিনীগুলো ছাউনী ফেলে অবস্থান গ্রহণ করবে আর তারা তুর্কমান পৌঁছে সালাহুদ্দীন আইউবীকে আক্রমণের সংবাদ জানাবে। এভাবে সুলতান সংবাদটা একদিন আগেই পেয়ে যাবেন এবং দুশমনকে স্বাগত জানানোর আয়োজন করে ফেলবেন। দাউদের পূর্ণ বিশ্বাস, এই পরিকল্পনা তার সফল হবে। কিন্তু তার জানা ছিলো না, এতদঞ্চলের চারদিকে শত্রুপক্ষের গেরিলা গুপ্তচর ছড়িয়ে রয়েছে।
তারা ডানদিকে অনেক দূরে সরে যায়। এখন আর কোনো সমস্যা নেই মনে করে এবার তারা তুকমান অভিমুখে রওনা হয়। এখনও ঘোড়া হাঁকায়নি। গতি কিছুটা তীব্র করেছে মাত্র। দীর্ঘ পথ চলার পর ঘোড়াগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সামনের বাকি পথ অতিক্রম করতে হবে অবিরাম গতিতে। তাই ঘোড়াগুলোকে কিছুক্ষণ আরাম দেয়া আবশ্যক।
রাতের শেষ প্রহর। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দাউদ ঘোড়া থেকে নেমে একটি টিলায় চড়ে সাইফুদ্দীনের বাহিনী যে পথে অগ্রসর হওয়ার কথা, সেদিকে তাকায়। কিন্তু দূরে ধূলি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দাউদ নিশ্চিন্ত হয় যে, তারা বাহিনী থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। এখন তারা নিরাপদ। কিন্তু এই ধারণাটা তার সঠিক নয়। কেউ তাকে দেখছে। তাকে অনুসরণ করছে। তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
দাউদ নিশ্চিন্ত মনে নীচে নেমে আসে। ঘোড়ায় চড়ে উভয়ে ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দেয়। এলাকটা টিলায় ঘেরা ও বালুকাময়। দাউদ ও হারিছ দুটি টিলার মাঝখান দিয়ে পথ চলছে। সামনে মোড়। মোড়ে পৌঁছামাত্র অকস্মাৎ সম্মুখ থেকে চারটি ঘোড়া ছুটে এসে তাদের প্রতি বর্শা তাক করে দাঁড়িয়ে যায়।
ঘোড়া থেকে নেমে এসো। এক আরোহী হুংকার দিয়ে বললো।
আমরা মুসাফির। দাউদ বললো।
মুসাফির হলে মসুলের বাহিনী থেকে দূরে থাকতে না- অশ্বারোহী বললো- পথচারীদের সঙ্গে এসব অস্ত্র থাকে না, যেগুলো তোমাদের সাথে আছে। তোমরা যারাই হয়ে থাকো, আমাদের সঙ্গে মসুল যেতেই হবে। আমরা তোমাদের ছাড়তে পারবো না। ঘোড়া ঘুরাও।
লোকগুলো হালবের গেরিলা সেনা, যাদেরকে সন্দেহভাজন লোকদেরকে ধরে হাল্ব নিয়ে যাওয়ার জন্য সমগ্র এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারা দাউদ ও হারিছকে ঘিরে ফেলে। দাউদ হারিছকে কানে কানে বলুনো- সময় এসে গেছে ভাই। হারিছ তার ঘোড়ার লাগাম নাড়া দেয়। ছুটে চলার জন্য তার ঘোড়া সামনের দুপা উপরে তোলে। ঘোড়া ছুটতে শুরু করলে হারিছ তার সামনের অশ্বারোহীর বুকে বর্শা বিদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু ততক্ষণে তার বাঁ-দিকের অশ্বারোহীর বর্শা তার কাঁধে এসে গেঁথে যায়। দাউদ অভিজ্ঞ গেরিলা সৈনিক। সে ঘোড়া হাঁকিয়ে মোড় ঘুরিয়ে একটা চক্কর কেটে এক অশ্বারোহীকে ঘায়েল করে ফেলে।
তারা চারজন। আর এরা দুজন। জায়গাটা ঘোড়ায় চড়ে লড়াই করার উপযোগী নয়। উভয় দিকে টিলা। কিছুক্ষণ ঘোড়াগুলো লম্ফঝম্ফ করতে থাকে। পরস্পর টক্কর খেতে থাকে বেশকটি বর্শা। হারিছ ঘোড়া থেকে পড়ে গেছে। দাউদও আহত হয়ে পড়েছে। দেহের দুতিন স্থানে তার গভীর ক্ষত। কিন্তু তার চৈতন্য ঠিক আছে।
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। চার অশ্বারোহীর কেউ নিহত, কেউ গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে আছে। দাউদও গুরুতর আহত।
দাউদ উঠে দাঁড়ায়। ঘোড়ার পিঠে চড়ে হারিছের গ্রাম অভিমুখে রওনা হয়। হারিছের খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। দাউদ নিশ্চিত, হারিছ মারা গেছে। নিজেও শেষ পর্যন্ত বাঁচবে না বলে তার ধারণা। তার দেহঝরা রক্তে ঘোড়ার জিন ও পিঠ লাল হয়ে গেছে। তার জানা মতে এখান থেকে তুর্কমান অপেক্ষা হারিছদের বাড়ি নিকটে। হারিছের পিতাই এখন তার ভরসা। তার আশা, হারিছদের বাড়ি পর্যন্ত জীবিত পৌঁছতে পারলে বৃদ্ধকে বলবে- শহীদ পুত্রের আত্মার শান্তির জন্য এক্ষুণি তুর্কমান চলে যান এবং সুলতান আইউবীকে সতর্ক করুন।
দাউদ ঘোড়া হাঁকায়। কিন্তু ঘোড়া যততবেশী নড়াচড়া করছে, তার ক্ষতস্থানগুলো থেকে তততবেশী রক্তক্ষরণ হচ্ছে। পিপাসায় তার কণ্ঠনালীটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে তার। দাউদ দোআ-কালাম পড়তে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর পর আকাশপানে মাথা তুলে উচ্চস্বরে বলছে- জমিন ও আসমানের মালিক! তোমার রাসূলের উসিলা করে বলছি, আমাকে আর অল্প কিছু সময়ের জন্য জীবন দান করো।
