***
সন্ধ্যার পর সাইফুদ্দীন ও আল-মালিকুস সালিহর সাক্ষাৎ ঘটে। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তার রোজনামচায় এই সাক্ষাতের বিবরণ এভাবে উল্লেখ করেছেন
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো, আল-মালিকুস সালিহ ও সাইফুদ্দীনের সাক্ষাৎ হবে। সাক্ষাৎ হলো দুর্গে। আল-মালিকুস সালিহ সাইফুদ্দীনকে স্বাগত জানান। সাইফুদ্দীন বালক রাজী আল-মালিকুস সালিহকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন। সাক্ষাতের পর সাইফুদ্দীন আল-মাবারিকের কূপের পাড়ে নির্মিত তাঁর তাঁবুতে চলে যান। সেখানে তিনি অনেক দিন অবস্থান করেন।
দুজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, সাইফুদ্দীন আল-মালিকুস সালিহকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি আমার পত্রের জবাব দিলেন না কেননা? কিন্তু প্রশ্ন শুনে আল মালিকুস সালিহ বিস্মিত হন, না তো, আমি তো পরদিনই আপনার পত্রের লিখিত জবাব পাঠিয়ে দিয়েছি! তাতে আমি লিখেছি, আপনি চিন্তা করবেন না। এই সন্ধিচুক্তি স্রেফ প্রতারণা। সময় নেয়ার জন্য আমি আইউবীর সঙ্গে এই প্রতারণার কৌশল অবলম্বন করেছি।
আমি আপনার কোনো পত্র পাইনি- সাইফুদ্দীন বললেন- আমি তো এই ভেবে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম যে, আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সন্ধি করে ভুল করেছেন এবং আমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছেন।
আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে তার দুজন সালারও ছিলো। যার মাধ্যমে বার্তাটি প্রেরণ করা হয়েছিলো, তারা তৎক্ষণাৎ তাকে ডেকে পাঠায়। সে এসে কোন্ দূত পত্র নিয়েছিলো, তার নাম জানায়। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে জানা গেলো, সে যেদিন বার্তা নিয়ে গিয়েছিলো, সেদিনের পর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। তুমুল দৌড়-ঝাঁপ ও ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু দূতের কোনো সন্ধান পাওয়া গেলো না। লোকটির বাড়ি কোথায় কেউ জানে না। এখানে যে জায়গায় থাকতো, সেখানে তার বিছানাপত্র পড়ে আছে। কিন্তু নিজে নেই। সে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সালাহুদ্দীন আইউবীর হাতে পৌঁছিয়ে দিতে পারে, এমন কল্পনাও কারো মনে ছিলো না।
বিষয়টি আল-মালিকুস সালিহর খৃস্টান উপদেষ্টাকে অবহিত করা হলো। তারা অভিমত ব্যক্ত করে- দূত হয়তো সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর ছিলো কিংবা সাইফুদ্দীনের নিকট যাওয়ার পথে সে আইউবীর গেরিলাদের হাতে ধরা পড়ে গেছে এবং তারা তাকে হত্যা করে ফেলেছে। তবে ঘটনা যাই হোক, এটা নিশ্চিত যে, এই ঘটনার পর সালাহুদ্দীন আইউবী তার যুদ্ধ প্রস্তুতি নিশ্চয় তীব্র করে তুলেছেন। এমনও হতে পারে, এখন তিনিই আগে হামলা করে বসবেন। এর মোকাবেলায় আমাদের সবকটি বাহিনীর যতো দ্রুত সম্ভব একত্রিত করে আইউবীর উপর আক্রমণ চালাতে হবে।
খৃস্টানদের এটাই কামনা যে, মুসলমানদের মাঝে যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক। একই দিনে মসুল ও হাররানে বার্তা প্রেরণ করা হলো যে, বাহিনী যে অবস্থায় থাকুক না কেননা, এক্ষুণি হাল্ব পাঠিয়ে দেয়া হোক। হাররানের শাসনকর্তা গোমস্তগীন কিছুটা ইতস্তত করলেও বৈঠকে বসে সকলের মঝে প্রকাশ্য বিরোধিতা করলেন না। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো যে, সবকটি বাহিনী এক হাই কমান্ডের অধীনে কাজ করবে এবং সুপ্রিম কমান্ডার থাকবেন সাইফুদ্দীন। গোমস্তগীন তার বাহিনীকে পাঠিয়ে দিলেন বটে; কিন্তু নিজে হালবে বসে থাকাই ভালো মনে করলেন। তিনি সাইফুদ্দীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারলেন না।
দু-তিন দিনে বাহিনীত্রয় হাব এসে একত্রিত হয়ে যায়। খৃস্টানরা অস্ত্র ও অন্যান্য সামানপত্র পাঠিয়ে দেয়। তারা প্রয়োজন অনুপাতে আরো সাহায্য সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাহিনী রওনা করিয়ে দেয়। তাড়াহুড়ো করে আক্রমণের পরিকল্পনা ঠিক করা হয়। এই অভিযানের সংবাদ গোপন রাখার জন্য রাতে পথচলা এবং দিনে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাছাড়া বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য বিপুলসংখ্যক কমাভোসেনা পথের ডানে-বাঁয়ে এই বলে ছড়িয়ে দেয়া হয় যে, কোনো পথিকও যদি চোখে পড়ে, ধরে হাব পাঠিয়ে দেবে। যাতে অভিযানের সংবাদ গোপন থাকে।
রওনা হওয়ার প্রাক্কালে সাইফুদ্দীন, দাউদ ও হারিছকে ডেকে তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন- তোমরা বিপদের সময় আমার সঙ্গ দিয়েছে। যুদ্ধের পর তোমাদের পদোন্নতি দেয়া হবে এবং পুরস্কারও পারে। তিনি হারিছকে বললেন- আমার মাথার উপর তোমার বোনের একটি কর্তব্য আছে। আমি তার সম্মুখে তখন যাবো, যখন আমি এই কর্তব্য আদায় করার যোগ্য হবো। হারিছকে বিস্মিত হতে দেখে তিনি বললেন- ফাওজিয়া বলেছিলো, আপনি যদি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর তরবারী নিয়ে এবং তার ঘোড়র পিঠে সওয়ার হয়ে আসতে পারেন, তখন আমি আপনার সঙ্গে চলে যাবো…। হারিছ! আমি যদি জয়ী হয়ে ফিরে আসতে পারি, তাহলে তোমার বোন মসুলের রাণী হবে।
ইনশাআল্লাহ-হারিছ বললো- আমরা আপনাকে বিজয়ী বেশেই ফিরিয়ে আনবো। আচ্ছা, তিন বাহিনী কি একত্রে যাচ্ছে।
হা- সাইফুদ্দীন জবাব দেন- আর আমি এই সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি থাকবো।
জিন্দাবাদ–দাউদ স্লোগান দিয়ে ওঠে- এবার পালাবার পালা আইউবীর।
দাউদ ও হারিছ ভৃত্যসুলভ কথাবার্তা বলে। সাইফুদ্দীনকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এবং বারবার ফাওজিয়ার নাম উল্লেখ করে তার থেকে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও গতিবিধি জেনে নেয়।
