আমরা বরাবরই মানুষের সেই দুর্বলতা থেকে উপকৃত হয়েছি, যাকে পলায়নপরতা ও বিলাসপ্রিয়তা নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে- ফিলিপ অগাস্টাস বললেন- যেসব মুসলমানের কাছে বিত্ত আছে, তারা শাসক হতে চায়। আমরা তাদের এই দুর্বলতাটাকেই কাজে লাগিয়েছি। আমাদের নতুন কোনো পন্থা আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। তবে আমাদেরকে আরো একটি অভিযান শুরু করতে হবে। তাহলো, আইউবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টির অভিযান। যতোসব অবমাননাকর দুর্নাম আছে, তার নামে প্রচার করতে হবে। কিন্তু এ কাজটা তোমরা করবে না; মুসলমানদের দ্বারা করতে হবে। প্রতিপক্ষ এবং শত্রুপক্ষের দুর্নাম করতে হলে নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করা চলবে না। সবসময় নিজেদের স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তোমার শক্ত মর্যাদা ও খ্যাতির দিক থেকে যত উঁচু মানের, তার বিরুদ্ধে ততো নিচ ও হীন অপবাদ আরোপ করতে হবে। শতজনের মধ্য থেকে কমপক্ষে পাঁচজন তোমার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে।
এই ফাঁকে তোমাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি অব্যাহত রাখো- এক কমান্ডার বললো আমরা প্রচুর সময় পেয়ে গেছি। আপনি অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সাথে মুসলমানদের মাঝে ক্ষমতাপূজার ব্যাধি সৃষ্টি করে তাদেরকে পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত করিয়ে দিয়েছেন। আমরা যদি মুসলমানদের মাঝে আমাদের বন্ধু তৈরী না করতাম, তাহলে আজ সালাহুদ্দীন আইউবী ফিলিস্তিনে অবস্থান করতেন। আমরা তারই স্বজাতিকে তার পথে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি।
আমি বিস্মিত- রেমন্ড বললেন- যে, এই মুসলমানরাই আবার আইউবীর বাহিনীর সৈনিক। তারা এক একজন আমাদের দশজন সৈনিকের মোকাবেলায়ও শক্তিশালী। আবার এই মুসলমানরাই আইউবীর প্রতিপক্ষ বাহিনীতে যোগ দিয়ে এমন কাপুরুষে পরিণত হয়ে যায় যে, শোচনীয় পরাজয়বরণ করে তারা পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়। বিষয়টা আমার কাছে সত্যিই বিস্ময়কর।
এটা বিশ্বাস ও চেতনার কারসাজি, যাকে মুসলমানরা ঈমান বলে থাকে রেজিনান্ট বললেন- যে সৈনিক বা সেনাপতি নিজের ঈমান নিলাম করে দেয়, তার যুদ্ধ করার স্পৃহা নিঃশেষ হয়ে যায়। জীবন আর সম্পদই তার অধিকতর প্রিয় হয়ে থাকে। এ কারণেই আমরা মুসলমানদের চরিত্র ও নৈতিকতা ধ্বংস করাকে বেশী আবশ্যক মনে করি। তাদের মধ্যে যৌনতা ও নেশার অভ্যাস সৃষ্টি করে দাও। দেখবে, তোমাদের সব কেল্লা জয় হয়ে যাবে।
এই সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তিনটি মুসলিম বাহিনীকে হালবে একত্রিত করে একক কমান্ডে রাখা হবে। তবে কৌশলে তাদের মাঝে পরস্পর বিরোধও জিইয়ে রাখা হবে। তাদেরকে আবশ্যক পরিমাণ সাহায্য সরবরাহ করা হবে।
***
রাতের দ্বিতীয় প্রহর। হারিছের গ্রামের সবাই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তার ঘর থেকে তিনটি ছোঁড়া বের হয়। একটির আরোহী সাইফুদ্দীন, একটিতে হারিছ ও অপরটিকে দাউদ। হারিছ ও দাউদের হাতে বর্শা। তাদের বিদায় জানানোর জন্য হারিছের পিতা, বোন ও স্ত্রী ঘরের দরজায় দণ্ডায়মান। সাইফুদ্দীনের দৃষ্টি ফাওজিয়ার উপর নিবদ্ধ। কিন্তু ফাওজিয়ার দৃষ্টি দাউদের প্রতি। সাইফুদ্দীন ও নিজ ভাইয়ের উপস্থিতি উপেক্ষা করে দাউদের প্রতি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ফাওজিয়া। কিছুক্ষণের মধ্যে উভয় দিক থেকে আল্লাহ হাফেজ, আল্লাহ হাফেজ শব্দ ভেসে আসে। তিনটি ঘোড়া সম্মুখপানে চলতে শুরু করে।
ঘোড়াগুলো অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। ফাওজিয়া তাদের পায়ের শব্দ শুনতে থাকে। ধীরে অশ্বক্ষুরধ্বনি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে। পাশাপাশি ফাওজিয়ার কানে দাউদের কণ্ঠ উঁচু হতে শুরু করে- সত্য পথের পথিকদের বিবাহ আকাশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে…।
ফাওজিয়া দরজা বন্ধ করে নিজ কক্ষে গিয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু তার আশপাশে দাউদের কণ্ঠ গুঞ্জরিত হয়েই চলেছে। হঠাৎ তার মনে প্রশ্ন জাগে আচ্ছা, আমি কি সত্যিই দাউদকে বিয়ে করতে চাই? লজ্জায় মাথাটা নুয়ে পড়ে ফাওজিয়ার। নিজের প্রতি রাগ আসে তার। দাউদের বক্তব্য মনে পড়ে যায়- পথে রক্তের নদীও আছে, যার উপর কোনো সেতু নেই। ফাওজিয়ার হৃদয় সাগরে রক্তের ঢেউ শুরু হয়ে যায়। বিয়ে-কল্পনা একটা অর্থহীন ভাবনায় পরিণত হয়ে মাথা থেকে উবে যায়।
সাইফুদ্দীন ও তার দেহরক্ষীরা রাতটা সফরে অতিবাহিত করে। এখন ভোর। সাইফুদ্দীন আগে আগে চলছেন। দাউদ ও হারিছ এতোটুকু পেছনে যে, তাদের কথাবার্তা সাইফুদ্দীনের কানে পৌঁছছে না।
জানি না, তুমি আমাকে কেননা বারণ করছো?- হারিছ ঝাঝালো কণ্ঠে বললো- এখানে যদি আমরা তাকে খুন করে লাশটা কোথাও পুঁতে রাখি, কেউ টেরও পাবে না।
তাকে জীবিত রেখে আমরা তার গোটা বাহিনীকে হত্যা করতে পারবো দাউদ বললো- ইনি মারা গেলে এর বাহিনীর কমান্ড অন্য কেউ হাতে তুলে নেবে। আমাকে তথ্য জানতে হবে। তুমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখো।
বেলা দ্বি-প্রহর। হালবের মিনার দেখা যাচ্ছে। খানিক দূরে প্রাকৃতিক কূপসমৃদ্ধ আল-মাবারিকের সবুজ-শ্যামল এলাকা। কাফেলা সে স্থানে পৌঁছে যায়। সাইফুদ্দীন তার যে কমান্ডারকে আল-মালিকুস সালিহর নিকট প্রেরণ করেছিলেন, সে ছুটে এসে জানালো, আল-মালিকুস সালিহ আপনার অপেক্ষা করছেন। আল-মাবারিকের শ্যামলিমায় প্রবেশ করামাত্র সাইফুদ্দীনকে স্বাগত জানানোর জন্য পূর্ব থেকে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সালার এগিয়ে এসে তাকে অভিবাদন জানায়। সাইফুদ্দীন আশংকা ব্যক্ত করেন, আমার তাবুটা কূপের পাড়ে স্থাপন করা হোক। আমি এখানেই অবস্থান করবো। তিনি আল-মালিকুস সালিহর মহলে যেতে কেনো অনীহ ছিলেন, ইতিহাসে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। দাউদ ও হারিছকে তিনি নিজের সঙ্গে রাখেন। তার জন্য অত্যন্ত মনোরম ও প্রশস্ত তাঁবু স্থাপন করা হলো। চাকর-বাকরও এসে পড়েছে। প্রাসাদের চিত্র ফুটে ওঠে তার তাঁবুতে। আল-মালিকুস সালিহ তাকে নৈশভোজের জন্য কেল্লায় নিমন্ত্রণ জানান এবং সেখানেই দুজনের সাক্ষাৎ স্থির হয়।
